রবিবার , ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হোম › রাজশাহী › বানেশ্বর-ঈশ্বরদী মহাসড়কের রোড শোল্ডার দখল
চাষাবাদ ও স-মিলে বাড়ছে দুর্ঘটনা ও ছিনতাইয়ের ঝুঁকি

বানেশ্বর-ঈশ্বরদী মহাসড়কের রোড শোল্ডার দখল

favicon
শাহিনুর সুজন, স্টাফ রিপোর্টার:
বানেশ্বর-ঈশ্বরদী মহাসড়কের রোড শোল্ডার দখল
বানেশ্বর-ঈশ্বরদী মহাসড়কের রোড শোল্ডার দখল করে রাখা হয়েছে স-মিলের ভারী কাঠের স্তূপ ও গড়ে তোলা হয়েছে ফসলের আবাদ; চরম ঝুঁকিতে যান চলাচল।

মহাসড়কের মূল অংশের দুই পাশে থাকা রোড শোল্ডার বা সড়কের ‘কাঁধ’ কেবল সৌন্দর্যবর্ধনের বিষয় নয়; এটি মূলত জরুরি প্রয়োজনে গাড়ি নিরাপদ স্থানে থামানো, দুর্ঘটনাকবলিত যানবাহন সরিয়ে রাখা এবং সার্বিক পথচলার নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি অংশ। সড়কের স্থায়িত্ব বজায় রাখতেও এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। অথচ রাজশাহীর গুরুত্বপূর্ণ বানেশ্বর-ঈশ্বরদী আঞ্চলিক মহাসড়কের সেই শোল্ডার দখল করে অবাধে চলছে অবৈধ স-মিল ব্যবসা ও বাণিজ্যিক ফসলের আবাদ। কোথাও হলুদ, আদা, কলা ও পেঁপে, আবার কোথাও মানুষের উচ্চতা ছাড়িয়ে যাওয়া নেপিয়ার ঘাসের চাষ করে তৈরি করা হয়েছে কৃত্রিম ঝোপঝাড়। পাশাপাশি দুই পাশে স্তূপ করে রাখা হচ্ছে ভারী কাঠের গুঁড়ি। এর ফলে জরুরি মুহূর্তে যানবাহন নিরাপদ দূরত্বে নেওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বাঁকগুলোতে চালকদের দৃষ্টিসীমা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা প্রতিনিয়ত ডেকে আনছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। এমনকি রাতের আঁধারে এসব ঝোপঝাড়কে নিরাপদ আড়াল বানিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে ছিনতাইকারী চক্র।

দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের পাশাপাশি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে রাজশাহীর যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই ৫৪ কিলোমিটার সড়কটিকে ২০২০ সালে আঞ্চলিক মহাসড়কে উন্নীত করার কাজ শুরু হয়। প্রায় ৫৫৪ কোটি টাকা মূল ব্যয় এবং পরবর্তীতে জমি অধিগ্রহণসহ অন্যান্য অবকাঠামো বাবদ আরও প্রায় ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়িয়ে ২০২৪ সালের শুরুতে এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা হয়। প্রতিদিন এ রুটে ভারী যানবাহনসহ হাজারো যান চলাচল করলেও সড়ক চালুর মাত্র দুই বছরের মাথায় সরকারি কোটি কোটি টাকার রোড শোল্ডার স্থানীয়দের দখলে চলে গেছে।

চারঘাট ও বাঘা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মহাসড়কটির চারঘাট ও বাঘা উপজেলার আওতাধীন প্রায় ৩৮ কিলোমিটার অংশে গত এক বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ৪ হাজার ২৪৯ জন। একই সময়ে এই দুই উপজেলায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২৮ জন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, শোল্ডারে জায়গা না থাকায় মূল সড়কের ওপর গাড়ি দাঁড় করিয়ে কাঠ বা পণ্য ওঠানো-নামানোর কারণে বিপরীতমুখী যানের সঙ্গে নিয়মিত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। গত ২৭ জুন রাত ৮টার দিকে বাঘা থেকে অটোরিকশায় বাড়ি ফেরার পথে রাওথা নুরুল বটতলা এলাকায় সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা কাঠবোঝাই ট্রলিতে ধাক্কা লেগে রাফিউল এহসান (১৫) নামের এক কিশোর ঘটনাস্থলেই মারা যায়। এর আগে গত ৭ নভেম্বর শিবপুর এলাকায় সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি পণ্যবাহী ট্রাক অতিক্রম করার সময় বিপরীতমুখী অ্যাম্বুলেন্সের মুখোমুখি সংঘর্ষে মোটরসাইকেল আরোহী তুহিন আলী (২৫), মারুফ আলী (১৮) ও শিমুল আলী (২৫) নামের তিন বন্ধু প্রাণ হারান।

এ বিষয়ে চলাচলকারী ট্রাকচালক মকসেদ আলী ও বাঘার মীরগঞ্জ এলাকার শিক্ষক ফজলুর রহমান জানান, চারঘাট-বাঘা অঞ্চলে প্রচুর আম ও কৃষিপণ্য উৎপাদন হওয়ায় শত শত ট্রাকে মালামাল ওঠানো-নামানো করতে হয়। শোল্ডার বেদখল থাকায় ট্রাকগুলো সরাসরি মূল সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, যার ফলে দুই লেনের এই ব্যস্ত সড়কে সার্বক্ষণিক বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনা লেগে রয়েছে।

ভয়াবহ দুর্ঘটনার পাশাপাশি সড়কের দুই পাশের ঘন ঝোপঝাড় এখন স্থানীয় যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের জন্য স্থায়ী এক আতঙ্কের নাম। রাতের বেলায় নেপিয়ার ঘাসের বন ও কলাবাগানের আড়াল থেকে হঠাৎ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ছিনতাইকারীরা বেরিয়ে এসে যানবাহন আটকে সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে। শলুয়া গ্রামের গার্মেন্টস ব্যবসায়ী মানিক ইসলাম জানান, রাত সাড়ে ১১টার দিকে পাবনা থেকে মালামাল নিয়ে বানেশ্বর যাওয়ার পথে চারঘাট ফায়ার সার্ভিস মোড়ে নেপিয়ার ঘাসের ভেতর থেকে তিন ছিনতাইকারী বের হয়ে তাঁর পথরোধ করে কয়েক লাখ টাকার মালামাল ছিনিয়ে নেয়। এছাড়া তালতলা এলাকায় প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার আব্দুল আওয়ালের মোটরসাইকেলে ধাক্কা দিয়ে সড়কের পাশের ঘাস ও কলাবাগানে ফেলে দিয়ে তাঁর সর্বস্ব লুট করা হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ী শামিম ইসলামও একাধিকবার এমন ছিনতাইয়ের চেষ্টার শিকার হয়েছেন বলে জানান।

সরেজমিনে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চারঘাট ও বাঘা উপজেলা অংশের মহাসড়ক ঘেঁষে গড়ে উঠেছে অন্তত ২১টি কাঠ চিরাইয়ের স-মিল বা করাতকল। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্রবিহীন এবং তারা সরকারি শোল্ডার ও মূল সড়কের কিনারা দখল করে ভারী কাঠ স্তূপ করে রাখছে। কাঠ ওঠানামার কাজে বড় ট্রাকগুলো সরাসরি মূল সড়কের ওপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখা হয়, যার ফলে দুই লেনের এই মহাসড়কে যান চলাচল দারুণভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। তবে এ বিষয়ে টুইস্টার ফার্নিচার অ্যান্ড স-মিলের মালিক তারিক হোসেন এবং জাকারিয়া স-মিলের মালিক জাকারিয়া জানান, মহাসড়কের শোল্ডারে কাঠ রাখা ঠিক হয়নি এবং বন বিভাগের নোটিশের বিষয়ে অবগত না থাকলেও তারা দ্রুত নিজ দায়িত্বে কাঠ সরিয়ে নেবেন।

চারঘাট উপজেলা শিক্ষক কমিটির সভাপতি ও হলিদাগাছি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, দুই লেনের ব্যস্ত মহাসড়কে শোল্ডার দখল সড়ক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি; এতে চালকের দৃষ্টিসীমা কমে যায় এবং জরুরি মুহূর্তে পাশ কাটানোর কোনো বিকল্প জায়গা থাকে না। চারঘাট উপজেলা বন কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান জানান, স-মিল মালিকদের একাধিকবার নোটিশ ও অভিযান চালিয়ে উচ্ছেদ করা হলেও পরবর্তীতে তারা আবারও শোল্ডার দখল করেন; শিগগিরই তাদের বিরুদ্ধে সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নাওদাড়া এলাকার চাষি আব্দুল হান্নানের মতো অনেকে দাবি করেন, রাস্তার পাশে ফাঁকা জায়গা থাকায় এবং গবাদিপশুর উপদ্রব না থাকায় তারা পেঁপে ও ঘাস চাষ করেছেন, তবে প্রশাসন কখনও নিষেধ করেনি। নিরাপদ সড়ক আন্দোলন চারঘাট উপজেলা শাখার সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত মহাসড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে আবাদ বা ব্যবসার সুযোগ দেওয়া জনজীবনের জন্য চরম হুমকি।

আইনশৃঙ্খলা ও সড়ক রক্ষাকারী প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাও সমস্যাটির ভয়াবহতা স্বীকার করছেন। চারঘাট মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহাবুবুর রহমান জানিয়েছেন, সড়কের দুই পাশ উন্মুক্ত থাকলে পুলিশের পক্ষে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও টহল পরিচালনা সহজ হয়, তবে ঝোপঝাড়ের কারণে অপরাধীদের অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিষয়টি সড়ক বিভাগকে অবগত করা হয়েছে। অন্যদিকে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) রাজশাহীর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আব্দুল মান্নাফ আকন্দ জানান, বানেশ্বর-ঈশ্বরদী সড়কের রোড শোল্ডার দখল করে চাষাবাদ ও ঝোপঝাড় তৈরির কারণে দুর্ঘটনা বাড়ার বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। দখলকারীদের অনতিবিলম্বে নিজ দায়িত্বে এসব সরিয়ে নেওয়ার চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হচ্ছে; নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রতিবন্ধকতা অপসারণ না করা হলে সরকারি আইন অনুযায়ী কঠোর উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে পুরো রোড শোল্ডার পরিষ্কার করা হবে।


বানেশ্বর-ঈশ্বরদী মহাসড়কের রোড শোল্ডার দখল
চাষাবাদ ও স-মিলে বাড়ছে দুর্ঘটনা ও ছিনতাইয়ের ঝুঁকি
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দৈনিক উপচার
 রবিবার , ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হোম › রাজশাহী › বানেশ্বর-ঈশ্বরদী মহাসড়কের রোড শোল্ডার দখল
চাষাবাদ ও স-মিলে বাড়ছে দুর্ঘটনা ও ছিনতাইয়ের ঝুঁকি

বানেশ্বর-ঈশ্বরদী মহাসড়কের রোড শোল্ডার দখল

favicon
শাহিনুর সুজন, স্টাফ রিপোর্টার:
বানেশ্বর-ঈশ্বরদী মহাসড়কের রোড শোল্ডার দখল
বানেশ্বর-ঈশ্বরদী মহাসড়কের রোড শোল্ডার দখল করে রাখা হয়েছে স-মিলের ভারী কাঠের স্তূপ ও গড়ে তোলা হয়েছে ফসলের আবাদ; চরম ঝুঁকিতে যান চলাচল।

মহাসড়কের মূল অংশের দুই পাশে থাকা রোড শোল্ডার বা সড়কের ‘কাঁধ’ কেবল সৌন্দর্যবর্ধনের বিষয় নয়; এটি মূলত জরুরি প্রয়োজনে গাড়ি নিরাপদ স্থানে থামানো, দুর্ঘটনাকবলিত যানবাহন সরিয়ে রাখা এবং সার্বিক পথচলার নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি অংশ। সড়কের স্থায়িত্ব বজায় রাখতেও এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। অথচ রাজশাহীর গুরুত্বপূর্ণ বানেশ্বর-ঈশ্বরদী আঞ্চলিক মহাসড়কের সেই শোল্ডার দখল করে অবাধে চলছে অবৈধ স-মিল ব্যবসা ও বাণিজ্যিক ফসলের আবাদ। কোথাও হলুদ, আদা, কলা ও পেঁপে, আবার কোথাও মানুষের উচ্চতা ছাড়িয়ে যাওয়া নেপিয়ার ঘাসের চাষ করে তৈরি করা হয়েছে কৃত্রিম ঝোপঝাড়। পাশাপাশি দুই পাশে স্তূপ করে রাখা হচ্ছে ভারী কাঠের গুঁড়ি। এর ফলে জরুরি মুহূর্তে যানবাহন নিরাপদ দূরত্বে নেওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বাঁকগুলোতে চালকদের দৃষ্টিসীমা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা প্রতিনিয়ত ডেকে আনছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। এমনকি রাতের আঁধারে এসব ঝোপঝাড়কে নিরাপদ আড়াল বানিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে ছিনতাইকারী চক্র।

দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের পাশাপাশি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে রাজশাহীর যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই ৫৪ কিলোমিটার সড়কটিকে ২০২০ সালে আঞ্চলিক মহাসড়কে উন্নীত করার কাজ শুরু হয়। প্রায় ৫৫৪ কোটি টাকা মূল ব্যয় এবং পরবর্তীতে জমি অধিগ্রহণসহ অন্যান্য অবকাঠামো বাবদ আরও প্রায় ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়িয়ে ২০২৪ সালের শুরুতে এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা হয়। প্রতিদিন এ রুটে ভারী যানবাহনসহ হাজারো যান চলাচল করলেও সড়ক চালুর মাত্র দুই বছরের মাথায় সরকারি কোটি কোটি টাকার রোড শোল্ডার স্থানীয়দের দখলে চলে গেছে।

চারঘাট ও বাঘা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মহাসড়কটির চারঘাট ও বাঘা উপজেলার আওতাধীন প্রায় ৩৮ কিলোমিটার অংশে গত এক বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ৪ হাজার ২৪৯ জন। একই সময়ে এই দুই উপজেলায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২৮ জন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, শোল্ডারে জায়গা না থাকায় মূল সড়কের ওপর গাড়ি দাঁড় করিয়ে কাঠ বা পণ্য ওঠানো-নামানোর কারণে বিপরীতমুখী যানের সঙ্গে নিয়মিত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। গত ২৭ জুন রাত ৮টার দিকে বাঘা থেকে অটোরিকশায় বাড়ি ফেরার পথে রাওথা নুরুল বটতলা এলাকায় সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা কাঠবোঝাই ট্রলিতে ধাক্কা লেগে রাফিউল এহসান (১৫) নামের এক কিশোর ঘটনাস্থলেই মারা যায়। এর আগে গত ৭ নভেম্বর শিবপুর এলাকায় সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি পণ্যবাহী ট্রাক অতিক্রম করার সময় বিপরীতমুখী অ্যাম্বুলেন্সের মুখোমুখি সংঘর্ষে মোটরসাইকেল আরোহী তুহিন আলী (২৫), মারুফ আলী (১৮) ও শিমুল আলী (২৫) নামের তিন বন্ধু প্রাণ হারান।

এ বিষয়ে চলাচলকারী ট্রাকচালক মকসেদ আলী ও বাঘার মীরগঞ্জ এলাকার শিক্ষক ফজলুর রহমান জানান, চারঘাট-বাঘা অঞ্চলে প্রচুর আম ও কৃষিপণ্য উৎপাদন হওয়ায় শত শত ট্রাকে মালামাল ওঠানো-নামানো করতে হয়। শোল্ডার বেদখল থাকায় ট্রাকগুলো সরাসরি মূল সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, যার ফলে দুই লেনের এই ব্যস্ত সড়কে সার্বক্ষণিক বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনা লেগে রয়েছে।

ভয়াবহ দুর্ঘটনার পাশাপাশি সড়কের দুই পাশের ঘন ঝোপঝাড় এখন স্থানীয় যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের জন্য স্থায়ী এক আতঙ্কের নাম। রাতের বেলায় নেপিয়ার ঘাসের বন ও কলাবাগানের আড়াল থেকে হঠাৎ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ছিনতাইকারীরা বেরিয়ে এসে যানবাহন আটকে সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে। শলুয়া গ্রামের গার্মেন্টস ব্যবসায়ী মানিক ইসলাম জানান, রাত সাড়ে ১১টার দিকে পাবনা থেকে মালামাল নিয়ে বানেশ্বর যাওয়ার পথে চারঘাট ফায়ার সার্ভিস মোড়ে নেপিয়ার ঘাসের ভেতর থেকে তিন ছিনতাইকারী বের হয়ে তাঁর পথরোধ করে কয়েক লাখ টাকার মালামাল ছিনিয়ে নেয়। এছাড়া তালতলা এলাকায় প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার আব্দুল আওয়ালের মোটরসাইকেলে ধাক্কা দিয়ে সড়কের পাশের ঘাস ও কলাবাগানে ফেলে দিয়ে তাঁর সর্বস্ব লুট করা হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ী শামিম ইসলামও একাধিকবার এমন ছিনতাইয়ের চেষ্টার শিকার হয়েছেন বলে জানান।

সরেজমিনে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চারঘাট ও বাঘা উপজেলা অংশের মহাসড়ক ঘেঁষে গড়ে উঠেছে অন্তত ২১টি কাঠ চিরাইয়ের স-মিল বা করাতকল। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্রবিহীন এবং তারা সরকারি শোল্ডার ও মূল সড়কের কিনারা দখল করে ভারী কাঠ স্তূপ করে রাখছে। কাঠ ওঠানামার কাজে বড় ট্রাকগুলো সরাসরি মূল সড়কের ওপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখা হয়, যার ফলে দুই লেনের এই মহাসড়কে যান চলাচল দারুণভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। তবে এ বিষয়ে টুইস্টার ফার্নিচার অ্যান্ড স-মিলের মালিক তারিক হোসেন এবং জাকারিয়া স-মিলের মালিক জাকারিয়া জানান, মহাসড়কের শোল্ডারে কাঠ রাখা ঠিক হয়নি এবং বন বিভাগের নোটিশের বিষয়ে অবগত না থাকলেও তারা দ্রুত নিজ দায়িত্বে কাঠ সরিয়ে নেবেন।

চারঘাট উপজেলা শিক্ষক কমিটির সভাপতি ও হলিদাগাছি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, দুই লেনের ব্যস্ত মহাসড়কে শোল্ডার দখল সড়ক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি; এতে চালকের দৃষ্টিসীমা কমে যায় এবং জরুরি মুহূর্তে পাশ কাটানোর কোনো বিকল্প জায়গা থাকে না। চারঘাট উপজেলা বন কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান জানান, স-মিল মালিকদের একাধিকবার নোটিশ ও অভিযান চালিয়ে উচ্ছেদ করা হলেও পরবর্তীতে তারা আবারও শোল্ডার দখল করেন; শিগগিরই তাদের বিরুদ্ধে সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নাওদাড়া এলাকার চাষি আব্দুল হান্নানের মতো অনেকে দাবি করেন, রাস্তার পাশে ফাঁকা জায়গা থাকায় এবং গবাদিপশুর উপদ্রব না থাকায় তারা পেঁপে ও ঘাস চাষ করেছেন, তবে প্রশাসন কখনও নিষেধ করেনি। নিরাপদ সড়ক আন্দোলন চারঘাট উপজেলা শাখার সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত মহাসড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে আবাদ বা ব্যবসার সুযোগ দেওয়া জনজীবনের জন্য চরম হুমকি।

আইনশৃঙ্খলা ও সড়ক রক্ষাকারী প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাও সমস্যাটির ভয়াবহতা স্বীকার করছেন। চারঘাট মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহাবুবুর রহমান জানিয়েছেন, সড়কের দুই পাশ উন্মুক্ত থাকলে পুলিশের পক্ষে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও টহল পরিচালনা সহজ হয়, তবে ঝোপঝাড়ের কারণে অপরাধীদের অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিষয়টি সড়ক বিভাগকে অবগত করা হয়েছে। অন্যদিকে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) রাজশাহীর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আব্দুল মান্নাফ আকন্দ জানান, বানেশ্বর-ঈশ্বরদী সড়কের রোড শোল্ডার দখল করে চাষাবাদ ও ঝোপঝাড় তৈরির কারণে দুর্ঘটনা বাড়ার বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। দখলকারীদের অনতিবিলম্বে নিজ দায়িত্বে এসব সরিয়ে নেওয়ার চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হচ্ছে; নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রতিবন্ধকতা অপসারণ না করা হলে সরকারি আইন অনুযায়ী কঠোর উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে পুরো রোড শোল্ডার পরিষ্কার করা হবে।


বানেশ্বর-ঈশ্বরদী মহাসড়কের রোড শোল্ডার দখল
চাষাবাদ ও স-মিলে বাড়ছে দুর্ঘটনা ও ছিনতাইয়ের ঝুঁকি
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬