উন্নয়নের আশ্বাসে দোকান ভেঙে সাত বছর পার
একটি ছোট দোকানঘরই ছিল তাঁদের পরিবার-পরিজনের অন্নসংস্থানের একমাত্র অবলম্বন। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত বহুতল মার্কেট উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল বহু বছরের সেই রুটিরুজির ঠিকানা। আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, এক বছরের মধ্যেই চকচকে নতুন ভবনে বুঝিয়ে দেওয়া হবে বরাদ্দ। তবে সেই কাঙ্ক্ষিত ‘এক বছর’ দেখতে দেখতে সাতটি বছর পেরিয়ে গেলেও আজও ফিরল না দোকান, উল্টো জীবিকা হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন প্রান্তিক ব্যবসায়ীরা। রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার ঐতিহ্যবাহী নন্দনগাছী হাটের দুইতলা আধুনিক কিচেন মার্কেট ঘিরে এখন কেবলই হতাশা, ক্ষোভ আর লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ। সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে এর সক্ষমতা নিয়ে; যেখানে উচ্ছেদ করা হয়েছিল ৮২ জন পুরোনো ব্যবসায়ীকে, সেখানে নির্মিত ভবনে দোকানের সংখ্যা রাখা হয়েছে মাত্র ২৬টি। ফলে সহজ সমীকরণেই অন্তত ৫৬ জন ব্যবসায়ী তাঁদের অস্তিত্ব হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন।
উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, গ্রামীণ অর্থনীতির গতি সঞ্চার ও আধুনিক বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রায় ২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে নন্দনগাছী হাটে দুইতলা আধুনিক কিচেন মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর প্রকল্পের নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় এবং চুক্তি অনুযায়ী ২০২১ সালের ১০ মার্চের মধ্যে কাজ শেষ করার বাধ্যবাধকতা ছিল। প্রায় ৪২ শতক সরকারি খাস জমি দখলমুক্ত ও ফাঁকা করতে দীর্ঘ চার-পাঁচ দশক ধরে ব্যবসা পরিচালনাকারী ৮২ জন ব্যবসায়ীর দোকান উচ্ছেদ করা হয়। পুরো কাজটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় মিম ডেভেলপার অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। নির্ধারিত মেয়াদের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি সময় পার করে সম্প্রতি ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হলেও জটিলতা কাটেনি একবিন্দু।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই পুরো উন্নয়ন প্রকল্পের গোড়াতেই ছিল মারাত্মক কাঠামোগত ত্রুটি ও পরিকল্পনাহীনতা। পুরোনো প্রতিষ্ঠিত ৮২ জন ব্যবসায়ীকে উচ্ছেদ করা হলেও নবনির্মিত ভবনে স্থান সংকুলান হয়েছে মাত্র ২৬টি দোকানের। এই বাস্তবতায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, শুরুতেই সিংহভাগ ব্যবসায়ীকে বাদ দেওয়ার এমন অবিবেচকমূলক নকশা কার স্বার্থে প্রণয়ন করা হয়েছিল? পুরোনো ব্যবসায়ীদের যথাযথ পুনর্বাসন পরিকল্পনা ছাড়া কীভাবে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলো, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো উত্তর মিলছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে। বাকি ৫৬ জন ব্যবসায়ী এখন পুরোপুরি পথে বসার উপক্রম। তাঁদের পূর্বের ভিটে নেই, নতুন মার্কেটেও স্থান পাওয়ার কোনো আইনি নিশ্চয়তা নেই।
এই চরম সংকটের আগুনে ঘি ঢেলেছে দোকান বরাদ্দের নামে চলা দফায় দফায় অর্থবাণিজ্যের অভিযোগ। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের ভাষ্যমতে, গত কয়েক বছরে ভালো ‘পজিশন’ ও নিশ্চিত বরাদ্দের লোভ দেখিয়ে বিভিন্ন ধাপে ৪০ থেকে ৪৫ জন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অন্তত দেড় কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। অতীতে বাজার পরিচালনা কমিটির প্রভাবশালী ব্যক্তিরা প্রতি পজিশন বাবদ ২০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত অগ্রিম নিয়েছিলেন। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর সেই কমিটির হোতারা এলাকা ছেড়ে গা ঢাকা দিলে সেই অর্থের কোনো হদিস মেলেনি। কোনো ব্যাংকিং চ্যানেল কিংবা দাপ্তরিক চালান ছাড়াই নগদ অর্থ নেওয়ায় ব্যবসায়ীদের হাতে নেই কোনো বৈধ জমার রসিদ।
বর্তমানে সেই ধারাবাহিকতায় নতুন করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে বর্তমান বাজার পরিচালনা কমিটির সভাপতি আব্দুল খালেকের বিরুদ্ধে। একাধিক ব্যবসায়ী সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন, নতুন করে বরাদ্দ নিশ্চিতের কথা বলে একেকজনের কাছ থেকে ৩ লাখ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে। নন্দনগাছী হাটে প্রায় তিন দশক ধরে লবণের পাইকারি ব্যবসা করা জামিরুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, কাজ শুরুর সময় তৎকালীন সভাপতির হাতে ৫০ হাজার টাকা তুলে দিয়েছিলেন। বছরের পর বছর অপেক্ষার পর সম্প্রতি বর্তমান সভাপতি আব্দুল খালেকের আশ্বাসে আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধারদেনা করে আরও ৩ লাখ টাকা তুলে দেন। একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান আঁখি বস্ত্রালয়ের স্বত্বাধিকারী সাইফুল ইসলাম এবং লক্ষ্মী মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের মালিক বৈদ্যনাথ কুমার সরকার। নিচতলায় দোকান পাওয়ার আশায় সঞ্চয় ভেঙে ও ঋণ নিয়ে ৩ লাখ টাকা করে দিয়েও তাঁরা এখনও নিশ্চিত বরাদ্দের কাগজ পাননি।
তবে সব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন বর্তমান বাজার কমিটির সভাপতি আব্দুল খালেক। তিনি দাবি করেন, পূর্ববর্তী কমিটির নেতৃবৃন্দ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করে আত্মগোপনে চলে গেছেন। বর্তমান কমিটি কোনো অবৈধ লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত নয় এবং সরকার নির্ধারিত সরকারি ফি ছাড়া এক পয়সাও নেওয়া হচ্ছে না। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও বানোয়াট দাবি করে তিনি বলেন, সরকারি নিয়ম ও নীতিমালা অনুসরণ করেই প্রকৃত ব্যবসায়ীদের মধ্যে দোকান বণ্টন সম্পন্ন করা হবে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি সরওয়ারুল ইসলাম জানান, প্রকল্পের মূল অবকাঠামোগত নির্মাণকাজ প্রায় বছরখানেক আগেই শেষ হয়েছে। চারঘাট উপজেলা প্রকৌশলী ফারুক হোসেন এ প্রসঙ্গে জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর ভবনের কিছু ছোটখাটো নির্মাণত্রুটি নজরে এসেছিল, যা ঠিকাদারকে দিয়ে সংস্কার করানো হয়েছে। খুব দ্রুতই ভবনটি আনুষ্ঠানিকভাবে বুঝে নেওয়া হবে।
চারঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জান্নাতুল ফেরদৌস পুরো বিষয়ে সতর্ক অবস্থান ব্যক্ত করে জানান, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ভবনটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে উপজেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। যথাযথ গুণগত মান যাচাই শেষে ভবন বুঝে নেওয়ার পর সরকারি নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের দোকান বরাদ্দ দেওয়া হবে। অর্থ লেনদেনের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক লিখিত অভিযোগ পাননি উল্লেখ করে তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এলে তদন্তসাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নন্দনগাছী হাটের সাধারণ ব্যবসায়ীদের দাবি, ভবন হস্তান্তর ও উদ্বোধনের আগেই একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। ৮২ জন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীর ভবিষ্যৎ কী হবে, বাদ পড়াদের বিকল্প পুনর্বাসনের রূপরেখা কী এবং বিগত সাত বছর ধরে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে-তা জনসমক্ষে স্পষ্ট করতে হবে। কারণ দীর্ঘ সাত বছর ধরে অপেক্ষায় থাকা এসব প্রান্তিক মানুষের কাছে নতুন মার্কেট কেবল ইট-পাথরের কোনো স্থাপনা নয়, বরং পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়স্থল।