চাঁপাইনবাবগঞ্জে বোমা বিস্ফোরণ: বিএনপি-জামায়াতের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
চাঁপাইনবাবগঞ্জে হাত-বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণে দুজন নিহত ও তিনজন আহত হয়েছেন। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) ভোর ৫টার দিকে সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নে এ ঘটনা ঘটে। তবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সাংবাদিকদের কাছে একে অপরের উপর দোষ চাপিয়েছেন বিএনপি ও জামায়াতের নেতারা।
প্রথমে ঘটনাস্থলে আসেন বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ও সাবেক সংসদ সদস্য হারুনুর রশিদ। এই সময় তার সঙ্গে ছিলেন, বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম, চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ওমর আলী, সদর উপজেলা তাঁতী লীগের সভাপতি ও ইউপি সদস্য নুরুল ইসলাম প্রমুখ।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, গতকাল রাতে চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও ইউপি সদস্য নাসির মেম্বারের বাড়িতে উত্তেজনা ও গণ্ডগোল হয়েছিল। পরে আমি পুলিশকে জানালে তার ব্যাবস্থা গ্রহণ করেছিল। আজকে তাদের পরিকল্পনা ছিল এই ইউনিয়নে ব্যাপক গোলযোগ ও গোলমাল তৈরি করা। সে উদ্দেশ্য নিয়ে বাইরে অবস্থানকারী টিপু চেয়ারম্যান, সাবেক চেয়ারম্যান বুলবুলসহ আরও বেশ কিছু সন্ত্রাসী বিএনপির নেতাকর্মীদের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আল্লাহর রহমতে তারা নিজেরাই বোমা তৈরি করতে গিয়ে নিজেরাই বিস্ফোরিত হয়েছে। এখানে দুইজন মারা গেছে এবং তিনজন আহত হয়েছে। তাই আমি মনে করি, এই ঘটনার সাথে যারা জড়িত যত দ্রুত সম্ভব তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনে যারা ধানের শীষের পক্ষে কাজ করেছে, তাদেরকে আক্রমণ করার জন্য বা তাদের বাড়ি-ঘরে আক্রমণ করার জন্যই তারা এই প্রস্ততিটি নিচ্ছিল, প্রতিহিংসার বশীভূত হয়ে।
অপরদিকে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লতিফুর রহমানের নেতৃত্বে জেলা জামায়াতের আমির আবু জার গিফারী, সেক্রেটারি আবু বক্কর, নায়েবে আমির মুখলেসুর রহমান, সদর উপজেলা আমির হাফেজ আব্দুল আলীম ও পৌর আমির হাফেজ গোলাম রাব্বানী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সংবাদিকদের সাবেক এমপি লতিফুর রহমান, হারুনের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, সাবেক এমপি হারুনুর রশিদ সাহেব যে বক্তব্যটা দিয়েছেন, এটা তিনি না দিলেই পারতেন। তিনি জামায়াত ইসলামীকে ডাইরেক্ট ইনভলব করেছেন, তদন্ত হওয়ার আগেই। তিনি একজন দায়িত্বশীল, তাকে বুঝে শুনে কথা বলা উচিত। এজন্য তার এই বক্তব্যের প্রতিবাদ জানাচ্ছি। তার এই বক্তব্য উইথডো করা উচিত।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং এর ফলাফল আমরা মেনে নিয়েছি। এরপর এই ধরনের ঘটনা এটা দুঃখজনক। এই ধরনের ঘটনা আমরা পছন্দ করি না। এটাই হচ্ছে মূল কথা। এটা কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ঘটেনি এবং এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। আমরা পুলিশ প্রশাসনকে জানিয়ে দিয়েছি, সঠিকভাবে তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। কোন নির্দোষ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা যাবে না এবং মামলা দেওয়া যাবে না। যারা আসল দোষী, তাদেরকে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।
এলাকাবাসী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের ফাটাপাড়ার মৃত মকবুল হোসেনের ছেলে কালামের বাড়িতে চলছিল হাত-বোমা তৈরির কাজ। এই হাত-বোমা তৈরি করার জন্য এলাকার বাইরে থেকে কারিগর নিয়ে এসেছিল কালামের ছোট ভাই দুলাল (৪০)। দুলাল মূলত কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তার বংশের লোকজনও আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে। এছাড়াও দুলাল সীমান্ত এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী এবং একাধিক মামলার আসামি।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, সীমান্তবর্তী চরবাগডাঙ্গা এলাকায় দলীয় রাজনীতির চেয়ে ভিলেজ পলিটিক্স এবং গ্রুপিং রাজনীতি বেশি চাঙ্গা থাকে। আধিপত্য বিস্তার, মাদক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণসহ নানা কারণে চরবাগডাঙ্গায় দলীয় রাজনীতির বাইরে মোটা দাগে দুই ভাগে গ্রুপিং রাজনীতি বিভক্ত। এক গ্রুপের নেতৃত্ব দেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ওমর আলী এবং অপর গ্রুপের নেতৃত্ব দেন চরবাগডাঙ্গার বহিষ্কৃত চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা শহীদ রানা টিপু।
আর দুলাল মূলত টিপু চেয়ারম্যানের গ্রুপের লোক। দুলালের বিপরীতে আওয়ামী লীগের গ্রুপটি বিএনপির প্রার্থী হারুনুর রশিদের নির্বাচনে সক্রিয় কাজ শুরু করলে নিজের আধিপত্য বিস্তার ও মাদক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য দুলালও নির্বাচনের কয়েকদিন আগে থেকে জামায়াতের প্রার্থী নুরুল ইসলাম বুলবুলের পক্ষে তোড়জোড় কাজ শুরু করেন। এরপর নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী নুরুল ইসলাম বুলবুল বিপুল ভোটে জয় লাভ করেন। নির্বাচনে জয়লাভের পর দুলাল এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের জন্যই বাইরে থেকে কারিগর নিয়ে এসে হাত-বোমা তৈরি করছিল বলে জানা গেছে।
প্রসঙ্গত, ভোর আনুমানিক ৫টার দিকে ফাঁটাপাড়া গ্রামের মৃত মকবুল হোসেনের ছেলে মো. কালামের বসতবাড়িতে একদল দুষ্কৃতকারী হাত-বোমা তৈরির সরঞ্জামসহ অবস্থান করছিল। সেখানে তারা হাত-বোমা তৈরি করার সময় হঠাৎ বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে, ঘটনাস্থলেই অজ্ঞাত পরিচয় দুইজন প্রাণ হারান।
এছাড়াও বিস্ফোরণে গুরুতর জখম হওয়া তিনজনকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে দ্রুত চাঁপাইনবাবগঞ্জ আধুনিক সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তাদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
পরে নিহতদের সনাক্ত করে পরিচয় জানান পুলিশ। নিহতরা হলেন, সদর উপজেলার রাণিহাটি ইউনিয়নের ওপর ধুমিহায়াতপুর এলাকার মোয়াজ্জেমের ছেলে আলামিন (২০) এবং শিবগঞ্জ উপজেলার ঘোড়াপাখিয়া ইউনিয়নের মনিরুল ইসলামের ছেলে জিহাদ (১৭)। এছাড়া আহত তিনজন হলেন, সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের ফাঁটাপাড়া গ্রামের মো. বজলুর রহমান (২০), মো. মিনহাজ (২২) এবং একই উপজেলার রাণিহাটি ইউনিয়নের উপরধুমি এলাকার মো. শুভ (২০)। আহত বজলুর রহমান ও মিনহাজ হলো হাত-বোমা তৈরির মূলহোতা দুলালের চাচা ও ভাতিজা ।