জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকায় রূপ পাচ্ছে রাজশাহীর শিমলা পার্ক
রাজশাহী শহরের বুকজুড়ে সবুজের সমারোহ থাকলেও পদ্মা তীরবর্তী শিমলা পার্কের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য আলাদা এক পরিচয় বহন করে। ঘন সবুজ বৃক্ষরাজি, নীরব প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং বিপুল সংখ্যক পাখি ও বন্যপ্রাণীর উপস্থিতির কারণে দীর্ঘদিন ধরেই এলাকাটি প্রকৃতিপ্রেমী ও জীববৈচিত্র্য গবেষকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে পরিচিত। এবার সেই শিমলা পার্ককে বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা হিসেবে ঘোষণার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের বন্য প্রাণী উপদেষ্টা পরিষদের ৪১তম সভায় রাজশাহী জেলার পদ্মাচরের শিমলা পার্ককে বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা হিসেবে ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সভায় রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার আওতাধীন বাবুডাইং পর্যটন ও পিকনিক স্পট এবং বগুড়া জেলার শেরপুর উপজেলার বড়বিলা বিলকেও বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা ঘোষণার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, শিমলা পার্কের বিজিবি ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকা থেকে জেলা প্রশাসকের বাংলোসংলগ্ন শহর রক্ষা বাঁধ পর্যন্ত প্রায় ১৭ একর জায়গা এই সংরক্ষণ এলাকার অন্তর্ভুক্ত হবে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে পদ্মা তীরবর্তী এই প্রাকৃতিক অঞ্চলটি দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ, গবেষণা ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনার আওতায় আসবে।
শিমলা পার্কের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বার্ড ক্লাবের তথ্য অনুযায়ী, বছরের অধিকাংশ সময় এ এলাকায় ২০০টিরও বেশি প্রজাতির পাখির আনাগোনা দেখা যায়। চখাচখি, কবুতর, ঘুঘু, কুবো, আবাবিল, টিটি, বাটান, পানকৌড়ি, গাঙচিল, বক, কাঠঠোকরা, ফিঙে, টিয়া, মাছরাঙা, শালিক, দোয়েল, মৌটুসি, খঞ্জনা, বুলবুলি, বেনেবউ, জলমুরগি ও কোকিলসহ অসংখ্য দেশি-বিদেশি পাখি এখানে বিচরণ করে। বিশেষ করে বর্ষা ও শীত মৌসুমে পাখির উপস্থিতি বেড়ে যায়।
শুধু পাখির জন্য নয়, বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল শিমলা পার্ক। এখানে খরগোশ, কাঠবিড়ালি, ইঁদুর, খাটাশ, গন্ধগোকুল, মেছোবিড়াল, বেজি, শিয়াল ও বিভিন্ন প্রজাতির বাদুড়সহ প্রায় ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীর অস্তিত্ব রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে ২৪ প্রজাতির সরীসৃপ এবং ১৩ প্রজাতির উভচর প্রাণী। কচ্ছপ, গিরগিটি, টিকটিকি ও বিভিন্ন প্রজাতির সাপসহ নানা প্রাণী এই এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখছে।
পরিবেশবিদদের মতে, দ্রুত নগরায়ণের মধ্যে এমন একটি প্রাকৃতিক এলাকা সংরক্ষণ করা রাজশাহীর পরিবেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জীববৈচিত্র্য শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়ায় না, এটি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
গত ৮ জুলাই রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ড. আ ন ম বজলুর রশীদের সভাপতিত্বে জুম প্লাটফর্মে অনুষ্ঠিত সভায় বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা হিসেবে শিমলা পার্কের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। সভায় রাজশাহীর সাধারণ মানুষকে এই প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় দায়িত্বশীল আচরণ করার আহ্বান জানানো হয়।
পরিবেশ সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করা রাজশাহীর মো. আতিক রহমান বলেন, পদ্মা তীরবর্তী শিমলা পার্ককে সংরক্ষণ করা এখন সময়ের দাবি। এই এলাকায় থাকা প্রাণী ও পাখির নিরাপদ আবাসস্থল রক্ষায় সাধারণ মানুষের সচেতনতার পাশাপাশি সরকারি পর্যায়ে নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন।
তিনি বলেন, শিমলা পার্ক শুধু একটি সবুজ এলাকা নয়, এটি রাজশাহীর প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। পরিকল্পিত সংরক্ষণ ব্যবস্থা গ্রহণ করা গেলে এই স্থানটি ভবিষ্যতে গবেষণা, শিক্ষা ও পরিবেশবান্ধব পর্যটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকায় রূপান্তরের এই উদ্যোগকে রাজশাহীর পরিবেশ সুরক্ষায় একটি নতুন দিগন্ত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন কার্যকর ব্যবস্থাপনা, জনসচেতনতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে পদ্মার পাড়ের এই প্রাকৃতিক সম্পদকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ রাখাই হবে মূল চ্যালেঞ্জ।
এটি সংবাদপত্রের রিপোর্টিং কাঠামো অনুযায়ী সাজানো হয়েছে-হেডলাইন, লিড, মূল প্রতিবেদন ও সমাপ্তি অংশসহ। চাইলে এটিকে আরও প্রথম পাতার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বা অনলাইন নিউজ পোর্টালের ভাইরাল স্টাইল-এও রূপ দেওয়া যাবে।