সোমবার , ২০ জুলাই ২০২৬
হোমআজকের শীর্ষ সংবাদজুলাই আন্দোলনের নামে মিথ্যা হত্যা মামলার জাল, তদন্তে বাদীদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থার উদ্যোগ

জুলাই আন্দোলনের নামে মিথ্যা হত্যা মামলার জাল, তদন্তে বাদীদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থার উদ্যোগ

favicon
উপচার ডেস্ক :-
জুলাই আন্দোলনের নামে মিথ্যা হত্যা মামলার জাল, তদন্তে বাদীদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থার উদ্যোগ

জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া একাধিক হত্যা মামলার তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। পুলিশের তদন্তে দেখা গেছে, জীবিত ব্যক্তিকে নিহত দেখানো, আগেই মারা যাওয়া ব্যক্তিকে আন্দোলনে শহীদ দাবি করা, ভুয়া পরিচয়ে মামলা দায়ের এবং অর্থের বিনিময়ে আসামির নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা—এমন নানা অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে। এসব ঘটনায় জড়িত বাদীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যাত্রাবাড়ীর রোজভিউ হোটেলের ম্যানেজার রাহাত হাসান বিপু ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট বিকেলে যাত্রাবাড়ী মাছের আড়তের সামনে গণপিটুনিতে আহত হন। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। একই দিন ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়।

এরপর সেপ্টেম্বর মাসে রাহাতের স্ত্রী রুবিনা আক্তার তাঁকে জুলাই আন্দোলনের শহীদ দাবি করে যাত্রাবাড়ী থানায় একটি হত্যা মামলা (মামলা নং-২০/২০২৪) দায়ের করেন। ওই মামলায় দেড় শতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। পরে অর্থের বিনিময়ে কয়েকজনের নাম আসামির তালিকা থেকে বাদ দিতে আদালতে পৃথক আবেদন করা হলেও আদালত তা গ্রহণ করেননি।

তবে দীর্ঘ তদন্ত শেষে পুলিশ জানতে পারে, ১৪ আগস্ট সকালে সায়েদাবাদ এলাকায় এক নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনায় তিনজনকে গণপিটুনি দেওয়া হয়, যাদের একজন ছিলেন রাহাত হাসান বিপু। তদন্তে তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে জুলাই আন্দোলনের কোনো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি।

একই ধরনের ঘটনা পাওয়া গেছে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারেও। দুস্তারা ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি বাবুল মিয়া ২০২৩ সালেই মারা যান। কিন্তু তাঁকে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট আন্দোলনে নিহত দেখিয়ে আড়াইহাজার থানায় হত্যা মামলা (মামলা নং-০৮/২০২৪) দায়ের করা হয়। ওই মামলায় ১৩১ জনকে আসামি করা হয়েছিল। তদন্তে পুলিশ নিশ্চিত হয়, মামলাটি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানির উদ্দেশ্যে দায়ের করা হয়েছিল।

উত্তর-পূর্ব থানার আরেকটি ঘটনায় জীবিত জানে আলমকে জুলাই আন্দোলনের শহীদ দেখিয়ে আদালতে হত্যা মামলার আবেদন (সিআর মামলা নং-৩৫/২০২৪) করা হয়। এতে শতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছিল। তদন্তে জানা যায়, একটি প্রতারক চক্র মামলা দায়ের করে আসামিদের কাছে এজাহারের কপি পাঠিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করত। কেউ টাকা দিলে তাঁদের নাম মামলা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য আদালতে হলফনামাও জমা দেওয়া হতো। তবে আদালত এসব আবেদন গ্রহণ করেননি। পরে তদন্তে কথিত নিহত জানে আলমকে জীবিত পাওয়া যায় এবং লাশ গুমের দাবিও মিথ্যা প্রমাণিত হয়।

আশুলিয়ায়ও একই ধরনের একটি ঘটনায় অজ্ঞাত ব্যক্তির ভুয়া নাম, ঠিকানা ও জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে একজনকে জুলাই আন্দোলনের শহীদ দেখিয়ে হত্যা মামলা (সিআর মামলা নং-১৬২৭/২০২৪) করা হয়। তদন্তে পুলিশ মামলার বাদীরও কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি। এ মামলাতেও অর্থের বিনিময়ে আসামিদের নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা এবং একাধিক হলফনামা জমা দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

তদন্তকারীরা আরও জানান, শুধু হত্যা মামলাই নয়, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত, ব্যক্তিগত মারামারিতে জখম কিংবা আগুনে পোড়ার মতো ঘটনাকেও জুলাই আন্দোলনে আহত হওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখিয়ে শত শত মামলা দায়ের করা হয়েছে। পরে এসব মামলার আসামিদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয় এবং অর্থ পাওয়ার পর মামলার কার্যক্রম থেকে সরে দাঁড়ানোর প্রবণতাও দেখা গেছে।

সম্প্রতি পুলিশের একাধিক বিশেষ ইউনিট জুলাই আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেছে। এসব প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা মামলা দায়ের করে নিরীহ মানুষকে হয়রানি ও অর্থ আদায়ের চেষ্টা করেছে।

পুলিশ সদর দপ্তর ও সিআইডির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তদন্তে এখন পর্যন্ত অন্তত ১১০টি মিথ্যা মামলা শনাক্ত হয়েছে। এসব মামলায় জীবিত ব্যক্তিকে শহীদ দেখানো, মৃত ব্যক্তিকে আসামি করা এবং ভুয়া তথ্য দিয়ে মামলা দায়েরের প্রমাণ মিলেছে। যেসব বাদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং বাকি তদন্ত-সংক্রান্ত তথ্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

জুলাই আন্দোলনের নামে মিথ্যা হত্যা মামলার জাল, তদন্তে বাদীদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থার উদ্যোগ
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
১৯ জুলাই ২০২৬
দৈনিক উপচার
 সোমবার , ২০ জুলাই ২০২৬
হোমআজকের শীর্ষ সংবাদজুলাই আন্দোলনের নামে মিথ্যা হত্যা মামলার জাল, তদন্তে বাদীদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থার উদ্যোগ

জুলাই আন্দোলনের নামে মিথ্যা হত্যা মামলার জাল, তদন্তে বাদীদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থার উদ্যোগ

favicon
উপচার ডেস্ক :-
জুলাই আন্দোলনের নামে মিথ্যা হত্যা মামলার জাল, তদন্তে বাদীদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থার উদ্যোগ

জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া একাধিক হত্যা মামলার তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। পুলিশের তদন্তে দেখা গেছে, জীবিত ব্যক্তিকে নিহত দেখানো, আগেই মারা যাওয়া ব্যক্তিকে আন্দোলনে শহীদ দাবি করা, ভুয়া পরিচয়ে মামলা দায়ের এবং অর্থের বিনিময়ে আসামির নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা—এমন নানা অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে। এসব ঘটনায় জড়িত বাদীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যাত্রাবাড়ীর রোজভিউ হোটেলের ম্যানেজার রাহাত হাসান বিপু ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট বিকেলে যাত্রাবাড়ী মাছের আড়তের সামনে গণপিটুনিতে আহত হন। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। একই দিন ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়।

এরপর সেপ্টেম্বর মাসে রাহাতের স্ত্রী রুবিনা আক্তার তাঁকে জুলাই আন্দোলনের শহীদ দাবি করে যাত্রাবাড়ী থানায় একটি হত্যা মামলা (মামলা নং-২০/২০২৪) দায়ের করেন। ওই মামলায় দেড় শতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। পরে অর্থের বিনিময়ে কয়েকজনের নাম আসামির তালিকা থেকে বাদ দিতে আদালতে পৃথক আবেদন করা হলেও আদালত তা গ্রহণ করেননি।

তবে দীর্ঘ তদন্ত শেষে পুলিশ জানতে পারে, ১৪ আগস্ট সকালে সায়েদাবাদ এলাকায় এক নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনায় তিনজনকে গণপিটুনি দেওয়া হয়, যাদের একজন ছিলেন রাহাত হাসান বিপু। তদন্তে তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে জুলাই আন্দোলনের কোনো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি।

একই ধরনের ঘটনা পাওয়া গেছে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারেও। দুস্তারা ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি বাবুল মিয়া ২০২৩ সালেই মারা যান। কিন্তু তাঁকে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট আন্দোলনে নিহত দেখিয়ে আড়াইহাজার থানায় হত্যা মামলা (মামলা নং-০৮/২০২৪) দায়ের করা হয়। ওই মামলায় ১৩১ জনকে আসামি করা হয়েছিল। তদন্তে পুলিশ নিশ্চিত হয়, মামলাটি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানির উদ্দেশ্যে দায়ের করা হয়েছিল।

উত্তর-পূর্ব থানার আরেকটি ঘটনায় জীবিত জানে আলমকে জুলাই আন্দোলনের শহীদ দেখিয়ে আদালতে হত্যা মামলার আবেদন (সিআর মামলা নং-৩৫/২০২৪) করা হয়। এতে শতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছিল। তদন্তে জানা যায়, একটি প্রতারক চক্র মামলা দায়ের করে আসামিদের কাছে এজাহারের কপি পাঠিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করত। কেউ টাকা দিলে তাঁদের নাম মামলা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য আদালতে হলফনামাও জমা দেওয়া হতো। তবে আদালত এসব আবেদন গ্রহণ করেননি। পরে তদন্তে কথিত নিহত জানে আলমকে জীবিত পাওয়া যায় এবং লাশ গুমের দাবিও মিথ্যা প্রমাণিত হয়।

আশুলিয়ায়ও একই ধরনের একটি ঘটনায় অজ্ঞাত ব্যক্তির ভুয়া নাম, ঠিকানা ও জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে একজনকে জুলাই আন্দোলনের শহীদ দেখিয়ে হত্যা মামলা (সিআর মামলা নং-১৬২৭/২০২৪) করা হয়। তদন্তে পুলিশ মামলার বাদীরও কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি। এ মামলাতেও অর্থের বিনিময়ে আসামিদের নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা এবং একাধিক হলফনামা জমা দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

তদন্তকারীরা আরও জানান, শুধু হত্যা মামলাই নয়, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত, ব্যক্তিগত মারামারিতে জখম কিংবা আগুনে পোড়ার মতো ঘটনাকেও জুলাই আন্দোলনে আহত হওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখিয়ে শত শত মামলা দায়ের করা হয়েছে। পরে এসব মামলার আসামিদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয় এবং অর্থ পাওয়ার পর মামলার কার্যক্রম থেকে সরে দাঁড়ানোর প্রবণতাও দেখা গেছে।

সম্প্রতি পুলিশের একাধিক বিশেষ ইউনিট জুলাই আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেছে। এসব প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা মামলা দায়ের করে নিরীহ মানুষকে হয়রানি ও অর্থ আদায়ের চেষ্টা করেছে।

পুলিশ সদর দপ্তর ও সিআইডির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তদন্তে এখন পর্যন্ত অন্তত ১১০টি মিথ্যা মামলা শনাক্ত হয়েছে। এসব মামলায় জীবিত ব্যক্তিকে শহীদ দেখানো, মৃত ব্যক্তিকে আসামি করা এবং ভুয়া তথ্য দিয়ে মামলা দায়েরের প্রমাণ মিলেছে। যেসব বাদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং বাকি তদন্ত-সংক্রান্ত তথ্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

জুলাই আন্দোলনের নামে মিথ্যা হত্যা মামলার জাল, তদন্তে বাদীদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থার উদ্যোগ
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
১৯ জুলাই ২০২৬