প্রশিক্ষণ ঘাটতি ও তদারকির অভাবের ইঙ্গিত
রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে ৩৬ জনের প্রাণহানির ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে পাইলটের প্রশিক্ষণে ধারাবাহিকতার ঘাটতি এবং গ্রাউন্ড সুপারভিশনের দুর্বলতাকে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিবিসি বাংলা তদন্ত কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, বিমানটির কোনো বড় ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং সীমিত অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং উড্ডয়নের সময় যথাযথ তদারকির অভাব দুর্ঘটনার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
প্রথম একক উড্ডয়নেই দুর্ঘটনা:-
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের ২১ জুলাই ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলাম প্রথমবারের মতো এককভাবে (ফার্স্ট সলো) এফটি-৭ বিজিআই প্রশিক্ষণ বিমান পরিচালনা করছিলেন। উড্ডয়নের কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসে বিধ্বস্ত হয়।
এই দুর্ঘটনায় পাইলটসহ মোট ৩৬ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ২৮ জনই ছিল স্কুলটির শিক্ষার্থী। এছাড়া শিক্ষক, কর্মচারী ও কয়েকজন অভিভাবকও প্রাণ হারান।
তদন্তে কী পাওয়া গেছে
তদন্ত কমিশন জানায়, উড্ডয়নের আগে বিমানটি নির্ধারিত নিয়মে পরীক্ষা করা হয়েছিল এবং সেটি উড্ডয়নের উপযোগী ছিল। আবহাওয়াও অনুকূলে ছিল। ফ্লাইট ডাটা রেকর্ডার বিশ্লেষণে ইঞ্জিন, হাইড্রোলিক বা কন্ট্রোল সিস্টেমে কোনো ত্রুটির সতর্ক সংকেত পাওয়া যায়নি।
তবে অবতরণের প্রস্তুতির সময় বিমানটির ব্যাংক অ্যাঙ্গেল অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় এবং অ্যাঙ্গেল অব অ্যাটাক নিরাপদ সীমা অতিক্রম করায় বিমানটি স্টল অবস্থায় চলে যায়। এরপর পাইলট আর সেটিকে নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনতে পারেননি।
প্রশিক্ষণ ও তদারকির ঘাটতি:-
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিহত পাইলটের উড্ডয়ন প্রশিক্ষণে ধারাবাহিকতা ছিল না এবং সংকটপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবিলার পর্যাপ্ত দক্ষতা গড়ে ওঠেনি। একই সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত গ্রাউন্ড সুপারভাইজার বা অফিসার কমান্ডিংয়ের পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
এছাড়া উড্ডয়ন প্রশিক্ষণের নির্ধারিত মিশন প্রোফাইল এবং পাইলটকে দেওয়া কিছু নির্দেশনার মধ্যে অসামঞ্জস্যের বিষয়ও তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাখির আঘাতের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হয়নি:-
বিমান বাহিনীর অভ্যন্তরীণ তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজে বিমানের উইন্ডশিল্ডে একটি কালো দাগ দেখা যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তকারীদের ধারণা, এটি পাখি বা অন্য কোনো উড্ডয়নযোগ্য বস্তুর আঘাত হতে পারে। যদিও এটিকে দুর্ঘটনার নিশ্চিত কারণ হিসেবে নয়, বরং সম্ভাব্য সহায়ক কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
ভবনের নকশাও বাড়িয়েছে প্রাণহানির ঝুঁকি:-
তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যে ভবনে বিমানটি আঘাত করে সেখানে কার্যত একটি প্রধান সিঁড়িই ছিল এবং সেটির সামনেই বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। ফলে বহু শিক্ষার্থী ও শিক্ষক বের হতে না পেরে আটকা পড়েন।
ফায়ার সার্ভিসের মূল্যায়নে ভবনটির আয়তন অনুযায়ী আরও একাধিক জরুরি বহির্গমন পথ থাকা প্রয়োজন ছিল। পর্যাপ্ত সিঁড়ি থাকলে হতাহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কম হতে পারত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া স্কুল ক্যাম্পাসের কয়েকটি ভবনের অনুমোদন-সংক্রান্ত বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। যদিও স্কুল কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ক্ষতিপূরণ এখনো বাস্তবায়ন হয়নি:-
তদন্ত কমিশন নিহত ও আহতদের পরিবারের জন্য একটি নির্দিষ্ট ক্ষতিপূরণ প্যাকেজের সুপারিশ করেছিল। এতে ১৮ বছরের নিচে নিহত প্রতিটি শিশুর পরিবারের জন্য এক কোটি টাকা এবং প্রাপ্তবয়স্ক নিহতদের ক্ষেত্রে ৮০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব দেওয়া হয়। পাশাপাশি আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের বিষয়েও সুপারিশ করা হয়।
তবে দুর্ঘটনার এক বছর পেরিয়ে গেলেও এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিহত ও আহতদের স্বজনরা।
সরকার প্রকাশ করেনি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন:-
দুর্ঘটনার পর সাবেক সচিব এ কে এম জাফর উল্লা খানের নেতৃত্বে গঠিত নয় সদস্যের তদন্ত কমিশন দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে প্রতিবেদন জমা দিলেও সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা