ফ্লাইওভারের নিচে চার এতিম ভাইয়ের আর্তনাদ
জীবন কখন যে মানুষের পায়ের নিচের মাটি সরিয়ে নেয়, তা বোঝার আগেই সব শেষ হয়ে যায়। মা নেই, বাবা নেই-সেই শূন্যতাই যদি শেষ হতো, হয়তো তবু বেঁচে থাকার শক্তিটুকু থাকত। কিন্তু বাস্তবতা আরও নিষ্ঠুর। পৈত্রিক ভিটেমাটিও নেই, নেই মাথা গোঁজার এক চিলতে ঠাঁই। গাইবান্ধা থেকে রাজশাহীর রাজপথে ছিটকে পড়া চার এতিম ভাইয়ের জীবন এখন থমকে আছে এক ফ্লাইওভারের নিচে, পলিথিনের ছাউনিতে।
মানিক চান, সুমন, রাজ ও জুবাইর-গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ইসলামপুর গ্রামের এই চার সহোদরের জীবনের গল্প যেন দুঃখের এক দীর্ঘ উপাখ্যান। এক সময় ছিল সংসার, ছিল বাবা কাজল মিয়া, ছিলেন মা লাভলী বেগম। কিন্তু বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে বাবার আকস্মিক মৃত্যু সবকিছু এলোমেলো করে দেয়। সেই শোক সামলাতে না সামলাতেই ব্রেন স্ট্রোকে মারা যান মা। চোখের সামনে ভেঙে পড়ে পৃথিবীটা।
এতিম চার সন্তান ভেবেছিল, অন্তত আপনজনেরা পাশে দাঁড়াবেন। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, উল্টো তাঁদের সর্বনাশের পথ সুগম করেছেন রক্তের সম্পর্কের মানুষরাই। বাবার মৃত্যুর পর পৈত্রিক সম্পত্তি দখল করে নিয়ে আপন চাচা-চাচি চার ভাইকে ঘরছাড়া করেন। প্রতিবাদ করার শক্তি, আইনি লড়াইয়ের সামর্থ্য-কিছুই ছিল না তাঁদের। এক কাপড়ে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয় তারা।
সেই থেকে শুরু হয় যাযাবর জীবন। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গা, কখনো আশ্রয়, কখনো রাস্তাই ঠিকানা। অবশেষে রাজশাহীতে এসে ঠাঁই হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদ সংলগ্ন ফ্লাইওভারের নিচে। গত ১০ দিন ধরে এখানেই কাটছে তাঁদের রাত-দিন। একটি ছেঁড়া পলিথিনই শীত নিবারণের শেষ ভরসা।
সরেজমিনে দেখা যায়, ফ্লাইওভারের নিচে নোংরা পরিবেশে মাটিতে শুয়ে আছে চার ভাই। বড় ভাই মানিক চান চোখ নামিয়ে বলেন, “আমরা তো আর বাঁচতে চাই না ভাই, শুধু একটু মানুষের মতো মরতে চাই।” তাঁর কণ্ঠে ক্লান্তি, চোখে অসহায়ত্ব। মেজ ভাই সুমনের অবস্থা আরও করুণ। দুর্ঘটনায় পায়ে গুরুতর আঘাত পেয়ে তিনি এখন পঙ্গুপ্রায়। দাঁড়াতে পারছেন না ঠিকমতো। অর্থের অভাবে জোটেনি ব্যান্ডেজ, নেই প্রয়োজনীয় ওষুধ। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে থাকলেও চিকিৎসার কথা বলার শক্তিটুকুও নেই তাঁর।
রাজ ও জুবাইর-বয়সে তুলনামূলক ছোট-শীতের হাওয়ায় কাঁপতে কাঁপতে ভাইদের পাশে বসে থাকে। কারো গায়ে নেই শীতবস্ত্র। রাতে ক্ষুধা পেলে চোখ বুজে থাকার চেষ্টা করে। দিনের বেলা রাস্তার মানুষ কেউ যদি একটু খাবার দেয়, সেটাই তাঁদের একমাত্র ভরসা। কখনো একবেলা, কখনো আধবেলা-এভাবেই টিকে আছে জীবন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় যাতায়াতকারী শিক্ষার্থীরা জানান, কয়েক দিন ধরে তাঁরা এই চার ভাইকে খোলা আকাশের নিচে থাকতে দেখছেন। কেউ কেউ খাবার দিয়েছেন, কেউ পুরোনো কাপড়। কিন্তু সেটুকুতে কি মানুষের জীবন চলে? শিক্ষার্থীরা বলেন, “ওদের চোখের দিকে তাকালে বুক ভেঙে যায়। সেখানে কোনো স্বপ্ন নেই, নেই ভবিষ্যতের কথা-শুধু বেঁচে থাকার আকুতি।”
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ থেকে রাজশাহীর এই দীর্ঘ পথ-শুধু শারীরিক দূরত্ব নয়, এটি বঞ্চনা, অবহেলা আর নিষ্ঠুরতার পথ। সমাজের বিত্তবান, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন-সবার নীরবতা এই চার তরুণের জীবনের অনিশ্চয়তাকে আরও গভীর করে তুলেছে। একটি অস্থায়ী আশ্রয়, সুমনের সুচিকিৎসা আর চার ভাইয়ের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিলেই হয়তো তাঁদের জীবন নতুন করে শুরু হতে পারত।
মানিক চান বলেন, “আমরা ভিক্ষা চাই না, কাজ চাই। একটু সুযোগ পেলে নিজেরাই দাঁড়াতে পারব।” এই কথার ভেতর লুকিয়ে আছে আত্মসম্মানের শেষ চিহ্নটুকু।
এই চার এতিম ভাই কোনো পরিসংখ্যান নয়, কোনো খবরের শিরোনাম মাত্র নয়-তারা আমাদেরই সমাজের অংশ। আজ তারা ফ্লাইওভারের নিচে, কাল হয়তো আরও গভীর অন্ধকারে হারিয়ে যাবে। এখনই যদি মানবিক হাত না বাড়ে, তাহলে ইতিহাসের দায় থেকে কেউ রেহাই পাবে না।
এই প্রতিবেদন শুধু সংবাদ নয়-এটি এক আর্তনাদ। প্রশ্ন রেখে যায় আমাদের বিবেকের কাছে: আমরা কি এখনো মানুষ?