শনিবার , ১৬ মে ২০২৬
হোমআজকের শীর্ষ সংবাদনির্বাচনের ব্যস্ততায় মাদকবিরোধী অভিযানে ঢিল

নির্বাচনের ব্যস্ততায় মাদকবিরোধী অভিযানে ঢিল

রাজশাহী বিভাগে ফের সক্রিয় কারবারি চক্র
favicon
মো: নুরে ইসলাম মিলন:-
নির্বাচনের ব্যস্ততায় মাদকবিরোধী অভিযানে ঢিল

আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রায় সব শক্তি যখন নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত, তখন সেই শূন্যতাকে সুযোগ হিসেবে নিচ্ছে মাদক কারবারিরা। দেশজুড়ে যেমন মাদকবিরোধী অভিযানে দৃশ্যমান ভাটা পড়েছে, তেমনি রাজশাহী বিভাগেও নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে মাদক পাচার ও বিপণন চক্র। সীমান্তবর্তী এই বিভাগে ভারত থেকে ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন ও গাঁজার প্রবেশ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি), বিজিবি ও পুলিশ সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজশাহী বিভাগের চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ ও নাটোর জেলার সীমান্ত অঞ্চলগুলো মাদকের প্রধান ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ, গোমস্তাপুর ও ভোলাহাট এলাকা দিয়ে ফেনসিডিল ও হেরোইনের প্রবেশ আগের তুলনায় বেড়েছে। স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, নির্বাচনি ডিউটির চাপের কারণে নিয়মিত টহল ও বিশেষ অভিযান আগের মতো জোরালো রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রবেশ করা মোট মাদকের মাত্র ১০ শতাংশ জব্দ করা সম্ভব হচ্ছে। বাকি অংশ নির্বিঘ্নে ছড়িয়ে পড়ছে শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত। রাজশাহী মহানগর, নওগাঁ ও নাটোরের বিভিন্ন উপজেলায় ইয়াবা ও হেরোইনের খুচরা বিক্রি আবারও দৃশ্যমান হচ্ছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি কমে যাওয়ায় পুরোনো সিন্ডিকেটের পাশাপাশি নতুন বাহকও যুক্ত হচ্ছে এই কারবারে।

বেসরকারি সংস্থা মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা (মানস)-এর হিসাবে, দেশে বর্তমানে প্রায় দেড় কোটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে মাদকের সঙ্গে জড়িত। বছরে মাদকের পেছনে ব্যয় হচ্ছে আনুমানিক ৬০ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল অর্থের একটি বড় অংশ সীমান্তবর্তী রাজশাহী বিভাগের হাত ঘুরে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে বলে মনে করছেন গবেষকরা। শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, মাদকের কারণে রাজশাহী বিভাগের তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ পড়াশোনা ও কর্মজীবন থেকে ছিটকে পড়ছে।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের তথ্য বলছে, মাদকাসক্তজনিত শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা গত কয়েক মাসে বেড়েছে। পুরুষের পাশাপাশি নারী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যেও মাদকের প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, বেকারত্ব, হতাশা, পারিবারিক অস্থিরতা ও সীমান্ত অঞ্চলের সহজলভ্যতার কারণে রাজশাহী বিভাগ মাদকের জন্য তুলনামূলকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিজিবির সাম্প্রতিক অভিযানের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরু থেকে সীমান্ত এলাকায় বিপুল পরিমাণ ইয়াবা, ফেনসিডিল ও ক্রিস্টাল মেথ জব্দ করা হলেও মাঠপর্যায়ে কারবারিদের গতিবিধি কমেনি। বরং নির্বাচন ঘিরে প্রশাসনিক ব্যস্ততাকে কাজে লাগিয়ে তারা নতুন রুট ও কৌশল ব্যবহার করছে। স্থানীয়ভাবে অভিযোগ রয়েছে, কিছু প্রভাবশালী মহলের নীরব প্রশ্রয় ছাড়া এই ব্যবসা এত সহজে বিস্তার লাভ করা সম্ভব নয়।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ দাবি করেছেন, নির্বাচন সামনে রেখে মাদকবিরোধী অভিযান শিথিল হয়নি; বরং সমন্বিতভাবে কাজ করা হচ্ছে। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে। রাজশাহী বিভাগের একাধিক থানার কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, নির্বাচনি দায়িত্ব শেষ না হওয়া পর্যন্ত বড় ধরনের অভিযান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

মানসের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. অরূপ রতন চৌধুরী মনে করেন, “নির্বাচনের মতো বড় রাষ্ট্রীয় আয়োজনে মাদক প্রায় অদৃশ্য ইস্যুতে পরিণত হয়। আর তখনই মাদক মাফিয়ারা সবচেয়ে বেশি সক্রিয় হয়।” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হকও একই মত পোষণ করে বলেন, প্রশাসনিক মনোযোগ অন্যদিকে থাকলেই অপরাধ চক্র সুযোগ নেয়—মাদক তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজশাহী বিভাগে মাদকের লাগাম টানতে হলে নির্বাচনের মধ্যেও বিশেষায়িত টাস্কফোর্স সক্রিয় রাখতে হবে। শুধু জব্দ বা গ্রেপ্তার নয়, বরং অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ও পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় নির্বাচন শেষে হয়তো একটি সরকার পাওয়া যাবে, কিন্তু ততদিনে রাজশাহীসহ পুরো দেশের একটি প্রজন্ম আরও গভীরভাবে মাদকের করালগ্রাসে হারিয়ে যাবে—যার ক্ষতি কোনো পরিসংখ্যানেই পুরোপুরি ধরা পড়বে না।

নির্বাচনের ব্যস্ততায় মাদকবিরোধী অভিযানে ঢিল
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
২৯ জানুয়ারি ২০২৬
দৈনিক উপচার
 শনিবার , ১৬ মে ২০২৬
হোমআজকের শীর্ষ সংবাদনির্বাচনের ব্যস্ততায় মাদকবিরোধী অভিযানে ঢিল

নির্বাচনের ব্যস্ততায় মাদকবিরোধী অভিযানে ঢিল

রাজশাহী বিভাগে ফের সক্রিয় কারবারি চক্র
favicon
মো: নুরে ইসলাম মিলন:-
নির্বাচনের ব্যস্ততায় মাদকবিরোধী অভিযানে ঢিল

আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রায় সব শক্তি যখন নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত, তখন সেই শূন্যতাকে সুযোগ হিসেবে নিচ্ছে মাদক কারবারিরা। দেশজুড়ে যেমন মাদকবিরোধী অভিযানে দৃশ্যমান ভাটা পড়েছে, তেমনি রাজশাহী বিভাগেও নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে মাদক পাচার ও বিপণন চক্র। সীমান্তবর্তী এই বিভাগে ভারত থেকে ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন ও গাঁজার প্রবেশ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি), বিজিবি ও পুলিশ সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজশাহী বিভাগের চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ ও নাটোর জেলার সীমান্ত অঞ্চলগুলো মাদকের প্রধান ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ, গোমস্তাপুর ও ভোলাহাট এলাকা দিয়ে ফেনসিডিল ও হেরোইনের প্রবেশ আগের তুলনায় বেড়েছে। স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, নির্বাচনি ডিউটির চাপের কারণে নিয়মিত টহল ও বিশেষ অভিযান আগের মতো জোরালো রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রবেশ করা মোট মাদকের মাত্র ১০ শতাংশ জব্দ করা সম্ভব হচ্ছে। বাকি অংশ নির্বিঘ্নে ছড়িয়ে পড়ছে শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত। রাজশাহী মহানগর, নওগাঁ ও নাটোরের বিভিন্ন উপজেলায় ইয়াবা ও হেরোইনের খুচরা বিক্রি আবারও দৃশ্যমান হচ্ছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি কমে যাওয়ায় পুরোনো সিন্ডিকেটের পাশাপাশি নতুন বাহকও যুক্ত হচ্ছে এই কারবারে।

বেসরকারি সংস্থা মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা (মানস)-এর হিসাবে, দেশে বর্তমানে প্রায় দেড় কোটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে মাদকের সঙ্গে জড়িত। বছরে মাদকের পেছনে ব্যয় হচ্ছে আনুমানিক ৬০ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল অর্থের একটি বড় অংশ সীমান্তবর্তী রাজশাহী বিভাগের হাত ঘুরে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে বলে মনে করছেন গবেষকরা। শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, মাদকের কারণে রাজশাহী বিভাগের তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ পড়াশোনা ও কর্মজীবন থেকে ছিটকে পড়ছে।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের তথ্য বলছে, মাদকাসক্তজনিত শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা গত কয়েক মাসে বেড়েছে। পুরুষের পাশাপাশি নারী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যেও মাদকের প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, বেকারত্ব, হতাশা, পারিবারিক অস্থিরতা ও সীমান্ত অঞ্চলের সহজলভ্যতার কারণে রাজশাহী বিভাগ মাদকের জন্য তুলনামূলকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিজিবির সাম্প্রতিক অভিযানের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরু থেকে সীমান্ত এলাকায় বিপুল পরিমাণ ইয়াবা, ফেনসিডিল ও ক্রিস্টাল মেথ জব্দ করা হলেও মাঠপর্যায়ে কারবারিদের গতিবিধি কমেনি। বরং নির্বাচন ঘিরে প্রশাসনিক ব্যস্ততাকে কাজে লাগিয়ে তারা নতুন রুট ও কৌশল ব্যবহার করছে। স্থানীয়ভাবে অভিযোগ রয়েছে, কিছু প্রভাবশালী মহলের নীরব প্রশ্রয় ছাড়া এই ব্যবসা এত সহজে বিস্তার লাভ করা সম্ভব নয়।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ দাবি করেছেন, নির্বাচন সামনে রেখে মাদকবিরোধী অভিযান শিথিল হয়নি; বরং সমন্বিতভাবে কাজ করা হচ্ছে। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে। রাজশাহী বিভাগের একাধিক থানার কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, নির্বাচনি দায়িত্ব শেষ না হওয়া পর্যন্ত বড় ধরনের অভিযান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

মানসের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. অরূপ রতন চৌধুরী মনে করেন, “নির্বাচনের মতো বড় রাষ্ট্রীয় আয়োজনে মাদক প্রায় অদৃশ্য ইস্যুতে পরিণত হয়। আর তখনই মাদক মাফিয়ারা সবচেয়ে বেশি সক্রিয় হয়।” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হকও একই মত পোষণ করে বলেন, প্রশাসনিক মনোযোগ অন্যদিকে থাকলেই অপরাধ চক্র সুযোগ নেয়—মাদক তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজশাহী বিভাগে মাদকের লাগাম টানতে হলে নির্বাচনের মধ্যেও বিশেষায়িত টাস্কফোর্স সক্রিয় রাখতে হবে। শুধু জব্দ বা গ্রেপ্তার নয়, বরং অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ও পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় নির্বাচন শেষে হয়তো একটি সরকার পাওয়া যাবে, কিন্তু ততদিনে রাজশাহীসহ পুরো দেশের একটি প্রজন্ম আরও গভীরভাবে মাদকের করালগ্রাসে হারিয়ে যাবে—যার ক্ষতি কোনো পরিসংখ্যানেই পুরোপুরি ধরা পড়বে না।

নির্বাচনের ব্যস্ততায় মাদকবিরোধী অভিযানে ঢিল
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
২৯ জানুয়ারি ২০২৬