রাজশাহীতে কনস্টেবল সিনহার ‘অপরাধ সাম্রাজ্য’ ফাঁস
রাজশাহীতে পুলিশের পোশাকের আড়ালে গড়ে ওঠা এক ভয়ংকর ‘অপরাধ সাম্রাজ্য’ এখন নগরবাসীর মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে। রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশে (আরএমপি) কর্মরত এয়ারপোর্ট থানার ওয়্যারলেস অপারেটর কনস্টেবল আশরাফুল ইসলাম সিনহা (কং নং–৮২৮)-এর বিরুদ্ধে উঠেছে চাঞ্চল্যকর সব অভিযোগ। অভিযোগ অনুযায়ী, কখনো তিনি নিজেকে সাব-ইন্সপেক্টর, কখনো তদন্ত কর্মকর্তা, আবার কখনো সাইবার ক্রাইম ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে সাধারণ মানুষকে মামলা ও গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে ফোন ও টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। এই পুরো কার্যক্রমের নেপথ্যে চন্দ্রিমা থানার এসআই শাহিন আক্তার টুম্পার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতা রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে ভুক্তভোগীদের।
এমন অভিযোগের অনুসন্ধান করে জানা যায়, এই সিন্ডিকেটে সক্রিয় সদস্য সংখ্যা আট থেকে বারোজন। তাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র চোরাই মোবাইল ব্যবসায়ী শান্ত কুমার সাহা। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে তিনি ‘আন-অফিসিয়াল’ বা সন্দেহজনক ফোন ব্যবহারকারীদের খোঁজ নেন এবং কৌশলে তাদের ব্যবহৃত মোবাইলের আইএমইআই নম্বর সংগ্রহ করেন। এই তথ্য পৌঁছে যায় কনস্টেবল আশরাফুলের হাতে। পরে সাইবার ইউনিটের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সহায়তায় ফোনের তথ্য যাচাই-বাছাই করে নিজেকে বড় কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে ফোন ব্যবহারকারীদের কল করা হয়। ছিনতাই বা ডাকাতি মামলায় জড়ানোর ভয় দেখিয়ে একপর্যায়ে তাদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন ও নগদ অর্থ আদায় করা হয়। হাতিয়ে নেওয়া ফোনগুলো আবার শান্ত কুমার সাহার মাধ্যমেই বাজারে বিক্রি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই কথিত অপরাধ সাম্রাজ্যের নির্মমতার একটি উদাহরণ দিয়েছেন কাশিয়াডাঙ্গা থানাধীন মোল্লাপাড়া গ্রামের ওয়াদুদ হোসেন রাব্বি।
তিনি জানান, গত ৫ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে তাকে ফোন করে নিজেকে চন্দ্রিমা থানার ‘এসআই আশরাফুল’ পরিচয় দেওয়া হয়। কলার দাবি করেন, রাব্বির ব্যবহৃত ফোনটি ছিনতাই হওয়া একটি ফোন এবং তিনি ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।
ওসিকে ‘ম্যানেজ’ করার কথা বলে থানায় এসে ৫ হাজার টাকা ও ফোন জমা দিতে বলা হয়। পরে ৭ নভেম্বর রাতে চন্দ্রিমা থানার সামনে গিয়ে রাব্বি মামলার নথিপত্র দেখতে চাইলে তা দেখাতে ব্যর্থ হন আশরাফুল। একপর্যায়ে ফোনটি নিজের স্ত্রীর দাবি করা হলেও যে জিডির কপি দেখানো হয়, তা ঘটনার আগের নয়, বরং পরের দিনের।
অভিযোগ রয়েছে, সেই সময় এসআই শাহিন আক্তার টুম্পা ও কনস্টেবল আশরাফুল একসঙ্গে ভয়ভীতি দেখিয়ে রাব্বির কাছ থেকে ফোনটি কেড়ে নেন। ভুক্তভোগীর দাবি, পুরো ঘটনার অডিও ও ভিডিও প্রমাণ তার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
রাব্বির অভিযোগ আরও গুরুতর মোড় নেয় যখন তিনি জানান, ঘটনার প্রায় এক মাস আগে তিনি ফোনটি কিনেছিলেন বন্ধুর ভাইয়ের কাছ থেকে। সেই সময় পরিচিত শান্ত কুমার সাহা ফোনটি দেখার অজুহাতে আইএমইআই নম্বর সংগ্রহ করেন। এর কিছুদিনের মধ্যেই শুরু হয় আশরাফুলের ফোনকল ও হয়রানি। রাব্বির ভাষ্যমতে, শান্তই মূলত তার ফোনের তথ্য সিন্ডিকেটে পাচার করেছিলেন।
এ বিষয়ে এয়ারপোর্ট থানার অফিসার ইনচার্জ বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন। তবে কেউ অপরাধ করলে তার শাস্তি হওয়া উচিত এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। চন্দ্রিমা থানার অফিসার ইনচার্জও জানান, এখনো এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাননি, তবে কেউ ব্যক্তিগতভাবে অপরাধে জড়িত থাকলে তার বিচার হওয়া উচিত।
রাজশাহীর সচেতন মহল মনে করছে, পুলিশের পোশাক ব্যবহার করে যদি সত্যিই এমন চাঁদাবাজি ও ফোন ছিনতাইয়ের সিন্ডিকেট পরিচালিত হয়ে থাকে, তবে তা শুধু আইনশৃঙ্খলা নয়, পুরো পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তির জন্য ভয়ংকর হুমকি। তাদের দাবি, কনস্টেবল আশরাফুল ইসলাম সিনহা ও এসআই শাহিন আক্তার টুম্পার বিরুদ্ধে দ্রুত নিরপেক্ষ বিভাগীয় তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক, যাতে সত্য উদঘাটিত হয় এবং সাধারণ মানুষ পুলিশের প্রতি আস্থা ফিরে পায়।