চাঁপাইনবাবগঞ্জে অসহনীয় লোডশেডিং,সাথে বাড়তি বিলের চাপ
চাঁপাইনবাবগঞ্জে আবারও তীব্র আকার ধারণ করেছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। প্রচণ্ড গরম, ভ্যাপসা আবহাওয়া ও মশার উপদ্রবের মধ্যে দিনের পর দিন দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে বিদ্যুতের ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রিপেইড মিটারে অতিরিক্ত অর্থ কেটে রাখার অভিযোগ যুক্ত হওয়ায় সাধারণ গ্রাহকদের ক্ষোভ দিন দিন বাড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত সপ্তাহেও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি তুলনামূলক স্বাভাবিক থাকলেও হঠাৎ করেই পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। এখন অনেক এলাকায় দিনে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা, কোথাও কোথাও তারও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। রাতে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে।
শুধু দৈনন্দিন জীবন নয়, ধর্মীয় কর্মকাণ্ডও ব্যাহত হচ্ছে। ফজর, যোহর, মাগরিবসহ বিভিন্ন নামাজের সময় বিদ্যুৎ না থাকায় মসজিদে মুসল্লিদেরও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। সকাল থেকে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা এবং ঘরোয়া কাজকর্মেও স্থবিরতা নেমে এসেছে।
সদর উপজেলার রামচন্দ্রপুরহাটের বাসিন্দা আরমান আলী বলেন, “এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ দিয়ে আবার তিন ঘণ্টা বন্ধ রাখা হচ্ছে। এতে কোনো কাজই ঠিকমতো করা যায় না। যদি বিদ্যুৎ না-ই থাকে, তাহলে অন্তত একটি নির্দিষ্ট সময়সূচি জানানো হোক।”
গৃহিণী সালমা খাতুন বলেন, “দিনে গরমে থাকা যায় না, রাতে মশার যন্ত্রণায় ঘুমানো যায় না। বিদ্যুৎ চলে গেলে ছোট শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি কষ্ট করতে হয়। লোডশেডিং এ ফ্রিজের খাবার নষ্ট হয়ে যাওয়াই চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছি”
স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কালাম বলেন, এমনিতেই গরমে টেকা যাচ্ছে না, তার ওপর বিদ্যুতের এই ভেলকিবাজি। রাতে ঠিকমতো ঘুমানো যাচ্ছে না, যার প্রভাব পড়ছে পরদিনের কর্মজীবনে। শিশুরা গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ছে।
তিনি আরোও বলেন, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে ফ্রিজে রাখা পচনশীল দ্রব্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তীব্র গরমে বেড়েছে হাতপাখা আর চার্জার ফ্যানের চাহিদা, তবে লোডশেডিংয়ের কারণে চার্জার ফ্যানও ঠিকমতো চার্জ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. রুবেল আলী বলেন, “লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক সময় বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা যায় না। এতে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।”
লোডশেডিংয়ের পাশাপাশি বিদ্যুতের ব্যয় বৃদ্ধি নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অনেক গ্রাহক। তাদের অভিযোগ, আগের তুলনায় প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের খরচ বেড়েছে। এছাড়া প্রিপেইড মিটারে রিচার্জের সময় বিভিন্ন খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ কেটে নেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করছেন অনেকে। গ্রাহকদের প্রশ্ন, নিয়মিত বিল পরিশোধের পরও কেন কাঙ্ক্ষিত সেবা মিলছে না।
এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থার দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (নেসকো) চাঁপাইনবাবগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আলিউল আজিম বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে গ্রাহক পর্যায়ে দুইটি বিভাগে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে নেসকো। যার মধ্যে বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-১ আমাদের চাহিদা হচ্ছে ৩২ মেগাওয়াট কিন্ত সরবরাহ পাচ্ছি মাত্র ২০ থেকে ২২ মেগাওয়াট। এছাড়া বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২ এ আমাদের চাহিদা ১৪ মেগাওয়াট কিন্ত এখানে সরবরাহ পাচ্ছি ৮ থেকে ৯ মেগাওয়াট। তাই এ কারণে এলাকাভেদে লোডশেডিং হচ্ছে।
অপরদিকে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ পল্লি বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) হাওলাদার মোঃ ফজলুর রহমান বলেন, বর্তমানে আমাদের চাহিদা ৭৮ মেগাওয়াট কিন্ত সরবরাহ পাচ্ছি ৫৫ মেগাওয়াট মতো। তাই যেসকল এলাকায় চাহিদা বেশি সেসকল এলাকায় লোডশেডিং হচ্ছে। আগামীতে লোডশেডিং বাড়বে কিনা তা আমাদের চাহিদা ও সরবরাহের উপর নির্ভর করবে।
এ বিষয়ে তিনি আরও বলেন, সমস্যার স্থায়ী সমাধানে নয়াগোলা থেকে যাদবপুর-গোয়ালবাড়ি-দামুসবিল পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার নতুন ৩৩ কেভি ডাবল সার্কিট লাইন নির্মাণের কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
তবে নয়াগোলা (সাতনইল) এলাকায় মাত্র সাত স্প্যান লাইনের কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় পুরো প্রকল্পটি চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। জেলা প্রশাসকের কথা হয়েছে খুব শীঘ্রই সমস্যার সমাধান হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
সচেতন নাগরিকদের মতে, বিদ্যুতের ঘাটতি বা কারিগরি সমস্যার বাস্তবতা থাকলেও গ্রাহকদের আগাম তথ্য দেওয়া, নির্ধারিত সময়সূচি প্রকাশ এবং দ্রুত পরিস্থিতির উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে প্রিপেইড মিটার ও বিদ্যুৎ বিল নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগগুলোও দ্রুত যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এদিকে দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিং ও বাড়তি ব্যয়ের চাপে অতিষ্ঠ চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাধারণ মানুষ দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে।