লোডশেডিংয়ের মধ্যেও আলোকসজ্জা-চাঁদাবাজি
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনের চত্বরে আয়োজিত মাসব্যাপী জাতীয় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প মেলা ঘিরে নানা অনিয়ম, চাঁদাবাজি, বিদ্যুৎ অপচয় ও নিম্নমানের পণ্য বিক্রির মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। মেলায় স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের কোনো সুযোগ না দিয়ে বাইরের ব্যবসায়ীদের প্রাধান্য দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিদিন টিকিটের নামে টাকা তোলা ও ফুটপাত থেকে অবৈধ চাঁদা আদায়ের ঘটনায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জেলার ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও সচেতন নাগরিকেরা।
গত ১৫ জুলাই জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনের মাঠে আনুষ্ঠানিকভাবে এই মেলার যাত্রা শুরু হয়। মেলায় ৪৩টিরও বেশি স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, প্রতিটি স্টল থেকে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা করে নেওয়া হলেও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি। মেলা চালুর প্রথম সপ্তাহে বিনামূল্যে প্রবেশের সুযোগ থাকলেও পরবর্তীতে ১০ টাকা মূল্যের টিকিট বাধ্যতামূলক করা হয়। দৈনিক বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীর থেকে আদায়কৃত এই অর্থের কোনো প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বা সঠিক হিসাব নেই বলে দাবি সচেতন মহলের।
শুধু তা-ই নয়, মেলা প্রাঙ্গণের আশপাশে ও কালেক্টরেট চত্বরের রাস্তায় গড়ে ওঠা চটপটি, ফুচকা ও বাদামের দোকানসহ জেলা প্রশাসনের জায়গায় সাময়িক গড়ে তোলা গ্যারেজ থেকেও প্রতিদিন আয়োজকদের নাম ভাঙিয়ে অর্থ বা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ তুলেছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। স্থানীয় প্রভাবশালী মহল ও প্রশাসনের একশ্রেণীর ছায়ায় এসব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বর্তমান সময়ে জেলাজুড়ে তীব্র লোডশেডিংয়ের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অতিরিক্ত আলোকসজ্জা নিয়েও বইছে সমালোচনার ঝড়। একদিকে সাধারণ মানুষ বিদ্যুৎ সংকটে অতিষ্ঠ, অন্যদিকে মেলা প্রাঙ্গণে গভীর রাত পর্যন্ত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার ও উচ্চশব্দে ডিজে গান বাজিয়ে সংলগ্ন আবাসিক ও প্রশাসনিক এলাকার স্বাভাবিক পরিবেশ বিনষ্ট করা হচ্ছে। এছাড়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয় এবং জজ কোর্টের মতো স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এমন মেলা আয়োজনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন নাগরিকরা।
মেলায় কেনাকাটা করতে আসা একাধিক ক্রেতা জানান, আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে মেলায় এসে তারা প্রতারিত হচ্ছেন। বেশিরভাগ স্টলেই সাধারণ মানের জিনিসপত্র চড়া দামে বিক্রি করা হচ্ছে এবং খাদ্যসামগ্রীর মান অত্যন্ত নিম্নমানের।
অভিযোগের বিষয়ে মেলার আয়োজক কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র মেহেদী হাসান জানান, জেলা প্রশাসনের সার্বিক অনুমতি নিয়েই নিয়ম মেনে মেলা পরিচালনা করা হচ্ছে। চাঁদাবাজি, নিম্নমানের পণ্য বা অন্যান্য অনিয়মের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে তিনি দাবি করেন।
এদিকে সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মুসা জঙ্গী জানান, নিয়ম-কানুন ও সুনির্দিষ্ট শর্ত মেনেই মেলা আয়োজনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে চাঁদা আদায় ও অনিয়মের সুনির্দিষ্ট বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য না করেই মুঠোফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মেলা ঘিরে ওঠা সকল অনিয়ম ও চাঁদাবাজির বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের জোর দাবি জানিয়েছেন জেলার উদ্যোক্তা ও সাধারণ ক্রেতারা। তাদের মতে, দেশীয় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের বিকাশ এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দেওয়ার নাম করে এই ধরনের মেলাকে ব্যক্তিস্বার্থ ও প্রবঞ্চনার আখড়ায় পরিণত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।