শুক্রবার , ১৪ আগস্ট ২০২৬
হোমরাজশাহীসীমান্তজুড়ে মুন্সী বাহিনীর মাদক ও অস্ত্রের নেটওয়ার্ক
চারঘাট রাওথা থেকে মীরগঞ্জ

সীমান্তজুড়ে মুন্সী বাহিনীর মাদক ও অস্ত্রের নেটওয়ার্ক

favicon
স্টাফ রিপোর্টার :
সীমান্তজুড়ে মুন্সী বাহিনীর মাদক ও অস্ত্রের নেটওয়ার্ক
ছবিতে তজলুল হক ও জয়নাল মুন্সী।

রাজশাহীর সীমান্তবর্তী চারঘাট উপজেলার রাওথা ও মীরগঞ্জ এলাকা একসময় মাদকের আখড়া হিসেবে পরিচিত ছিল। ২০১৯ সালে কঠোর আইনপ্রয়োগকারী অভিযানের পর এই অপরাধচক্রের তৎপরতা অনেকটাই থমকে গেলেও, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন পরিচয়ে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে পুরনো সিন্ডিকেট। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ব্যবসার আড়ালে গড়ে ওঠা এই অবৈধ নেটওয়ার্কটি বর্তমানে স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘মুন্সী বাহিনী’র নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, রাওথা গ্রামের মৃত আব্দুল ওহাবের তিন ছেলে-ফজলুল হক, তজলুল হক এবং জয়নাল মুন্সীর বিরুদ্ধে দীর্ঘকাল ধরে মাদক ও অস্ত্র ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ফজলুল হকের বিরুদ্ধে ১০টি, তজলুল হকের বিরুদ্ধে ১২টি এবং জয়নাল মুন্সীর বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা নথিভুক্ত রয়েছে।

২০১৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে ফজলুল হক নিহত হন। এরপর তজলুল হক গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘদিন কারাবাস করেন। সে সময় তিনি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ছিলেন। কারামুক্তির পর তিনি স্থানীয় এক নারী ইউপি সদস্য ও তৎকালীন রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে যুক্ত এক নেত্রীকে বিয়ে করেন এবং প্রভাবশালী মহলের সান্নিধ্যে এসে বিভিন্ন সুবিধা আদায় করেন। অন্যদিকে, ছোট ভাই জয়নাল মুন্সী দীর্ঘদিন ভারতে আত্মগোপনে থাকার পর গত এক বছরে দেশে ফিরে দুই ভাই মিলে পুরনো নেটওয়ার্ক সচল করেন।

সরেজমিন মীরগঞ্জ বাজারে গিয়ে দেখা যায়, তজলুল হক একটি ব্যক্তিগত কার্যালয় পরিচালনা করছেন। স্থানীয় একাধিক ব্যক্তির অভিযোগ, সেখানে গভীর রাত পর্যন্ত সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের সমাগম ঘটে এবং মাদক ব্যবসা ও বিভিন্ন বিরোধ মীমাংসার নামে অনৈতিক লেনদেন চলে। একসময়ে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ঘনিষ্ঠ পরিচয়ে পরিচিত তজলুল হক বর্তমানে রাজনৈতিক দল পরিবর্তন করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অপরদিকে, জয়নাল মুন্সী মীরগঞ্জ বাজারে চালের আড়ত ও মুদির ব্যবসার আড়ালে এই সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। চারঘাট ও বাঘা উপজেলার সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় মাদক সরবরাহ ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে রয়েছে তার গড়া ৪০ থেকে ৫০ জন কিশোর ও তরুণের সমন্বয়ে গঠিত ‘মুন্সী বাহিনী’।

অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, গত এক বছরে জয়নাল মুন্সীর সম্পত্তির পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, রাজশাহী শহরে একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটসহ প্রায় দেড় কোটি টাকার জমি ক্রয় করা হয়েছে। এর মধ্যে রাওথা এলাকার হাসেম আলীর নিকট থেকে প্রায় ২১ লাখ টাকায় দেড় বিঘা এবং মুনসুর রহমানের নিকট থেকে প্রায় ২৭ লাখ টাকায় দুই বিঘা জমি কেনা হয়। পাশাপাশি দুই স্ত্রীর নামে আলাদা দুটি বিলাসবহুল ভবন নির্মাণের কাজও সম্পন্ন হয়েছে।

এ বিষয়ে স্থানীয় এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দুই ভাই দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকায় জনমনে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছিল। কিন্তু তাদের এই পুনরুত্থানে সাধারণ মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। মীরগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা হেলাল উদ্দিন জানান, সীমান্তবর্তী রুট দিয়ে ভারত থেকে আসা হেরোইন, ফেনসিডিল এবং অস্ত্র প্রথমে এই বাহিনীর হাতে পৌঁছায় এবং পরবর্তীতে তা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। পুরো নেটওয়ার্কের অর্থ ও প্রশাসনিক দিকগুলো দুই ভাই সুকৌশলে নিয়ন্ত্রণ করছেন।

সব অভিযোগ অস্বীকার করে তজলুল হক বলেন, "জয়নাল আমার ভাই হলেও তার কোনো কর্মকাণ্ডের দায় আমি নেব না। সে আমার অবাধ্য এবং তার সঙ্গে আমার কোনো ব্যবসায়িক সম্পর্ক নেই। অতীতে সংশ্লিষ্টতা থাকলেও বর্তমানে আমি এসবের সঙ্গে জড়িত নই।"

জয়নাল মুন্সীও একই সুরে দাবি করেন, "অতীতে অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এখন তা পরিহার করেছি। সম্প্রতি যে সম্পত্তি কেনা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ আমার স্ত্রীর পারিবারিক সূত্রে প্রাপ্ত অর্থের মাধ্যমে অর্জিত।"

চারঘাট মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল মালেক জানান, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে ঘটনাস্থল থেকে কাউকে হাতেনাতে আটক করা সম্ভব হয়নি। অপরাধ দমনে পুলিশের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

সীমান্তবর্তী এই জনপদে অপরাধচক্রের তৎপরতা বৃদ্ধিতে স্থানীয় বাসিন্দারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সীমান্তবর্তী এই রুটগুলোতে কঠোর নজরদারি বৃদ্ধি এবং নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।

সীমান্তজুড়ে মুন্সী বাহিনীর মাদক ও অস্ত্রের নেটওয়ার্ক
চারঘাট রাওথা থেকে মীরগঞ্জ
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
১৩ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উপচার
 শুক্রবার , ১৪ আগস্ট ২০২৬
হোমরাজশাহীসীমান্তজুড়ে মুন্সী বাহিনীর মাদক ও অস্ত্রের নেটওয়ার্ক
চারঘাট রাওথা থেকে মীরগঞ্জ

সীমান্তজুড়ে মুন্সী বাহিনীর মাদক ও অস্ত্রের নেটওয়ার্ক

favicon
স্টাফ রিপোর্টার :
সীমান্তজুড়ে মুন্সী বাহিনীর মাদক ও অস্ত্রের নেটওয়ার্ক
ছবিতে তজলুল হক ও জয়নাল মুন্সী।

রাজশাহীর সীমান্তবর্তী চারঘাট উপজেলার রাওথা ও মীরগঞ্জ এলাকা একসময় মাদকের আখড়া হিসেবে পরিচিত ছিল। ২০১৯ সালে কঠোর আইনপ্রয়োগকারী অভিযানের পর এই অপরাধচক্রের তৎপরতা অনেকটাই থমকে গেলেও, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন পরিচয়ে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে পুরনো সিন্ডিকেট। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ব্যবসার আড়ালে গড়ে ওঠা এই অবৈধ নেটওয়ার্কটি বর্তমানে স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘মুন্সী বাহিনী’র নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, রাওথা গ্রামের মৃত আব্দুল ওহাবের তিন ছেলে-ফজলুল হক, তজলুল হক এবং জয়নাল মুন্সীর বিরুদ্ধে দীর্ঘকাল ধরে মাদক ও অস্ত্র ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ফজলুল হকের বিরুদ্ধে ১০টি, তজলুল হকের বিরুদ্ধে ১২টি এবং জয়নাল মুন্সীর বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা নথিভুক্ত রয়েছে।

২০১৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে ফজলুল হক নিহত হন। এরপর তজলুল হক গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘদিন কারাবাস করেন। সে সময় তিনি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ছিলেন। কারামুক্তির পর তিনি স্থানীয় এক নারী ইউপি সদস্য ও তৎকালীন রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে যুক্ত এক নেত্রীকে বিয়ে করেন এবং প্রভাবশালী মহলের সান্নিধ্যে এসে বিভিন্ন সুবিধা আদায় করেন। অন্যদিকে, ছোট ভাই জয়নাল মুন্সী দীর্ঘদিন ভারতে আত্মগোপনে থাকার পর গত এক বছরে দেশে ফিরে দুই ভাই মিলে পুরনো নেটওয়ার্ক সচল করেন।

সরেজমিন মীরগঞ্জ বাজারে গিয়ে দেখা যায়, তজলুল হক একটি ব্যক্তিগত কার্যালয় পরিচালনা করছেন। স্থানীয় একাধিক ব্যক্তির অভিযোগ, সেখানে গভীর রাত পর্যন্ত সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের সমাগম ঘটে এবং মাদক ব্যবসা ও বিভিন্ন বিরোধ মীমাংসার নামে অনৈতিক লেনদেন চলে। একসময়ে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ঘনিষ্ঠ পরিচয়ে পরিচিত তজলুল হক বর্তমানে রাজনৈতিক দল পরিবর্তন করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অপরদিকে, জয়নাল মুন্সী মীরগঞ্জ বাজারে চালের আড়ত ও মুদির ব্যবসার আড়ালে এই সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। চারঘাট ও বাঘা উপজেলার সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় মাদক সরবরাহ ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে রয়েছে তার গড়া ৪০ থেকে ৫০ জন কিশোর ও তরুণের সমন্বয়ে গঠিত ‘মুন্সী বাহিনী’।

অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, গত এক বছরে জয়নাল মুন্সীর সম্পত্তির পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, রাজশাহী শহরে একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটসহ প্রায় দেড় কোটি টাকার জমি ক্রয় করা হয়েছে। এর মধ্যে রাওথা এলাকার হাসেম আলীর নিকট থেকে প্রায় ২১ লাখ টাকায় দেড় বিঘা এবং মুনসুর রহমানের নিকট থেকে প্রায় ২৭ লাখ টাকায় দুই বিঘা জমি কেনা হয়। পাশাপাশি দুই স্ত্রীর নামে আলাদা দুটি বিলাসবহুল ভবন নির্মাণের কাজও সম্পন্ন হয়েছে।

এ বিষয়ে স্থানীয় এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দুই ভাই দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকায় জনমনে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছিল। কিন্তু তাদের এই পুনরুত্থানে সাধারণ মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। মীরগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা হেলাল উদ্দিন জানান, সীমান্তবর্তী রুট দিয়ে ভারত থেকে আসা হেরোইন, ফেনসিডিল এবং অস্ত্র প্রথমে এই বাহিনীর হাতে পৌঁছায় এবং পরবর্তীতে তা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। পুরো নেটওয়ার্কের অর্থ ও প্রশাসনিক দিকগুলো দুই ভাই সুকৌশলে নিয়ন্ত্রণ করছেন।

সব অভিযোগ অস্বীকার করে তজলুল হক বলেন, "জয়নাল আমার ভাই হলেও তার কোনো কর্মকাণ্ডের দায় আমি নেব না। সে আমার অবাধ্য এবং তার সঙ্গে আমার কোনো ব্যবসায়িক সম্পর্ক নেই। অতীতে সংশ্লিষ্টতা থাকলেও বর্তমানে আমি এসবের সঙ্গে জড়িত নই।"

জয়নাল মুন্সীও একই সুরে দাবি করেন, "অতীতে অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এখন তা পরিহার করেছি। সম্প্রতি যে সম্পত্তি কেনা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ আমার স্ত্রীর পারিবারিক সূত্রে প্রাপ্ত অর্থের মাধ্যমে অর্জিত।"

চারঘাট মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল মালেক জানান, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে ঘটনাস্থল থেকে কাউকে হাতেনাতে আটক করা সম্ভব হয়নি। অপরাধ দমনে পুলিশের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

সীমান্তবর্তী এই জনপদে অপরাধচক্রের তৎপরতা বৃদ্ধিতে স্থানীয় বাসিন্দারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সীমান্তবর্তী এই রুটগুলোতে কঠোর নজরদারি বৃদ্ধি এবং নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।

সীমান্তজুড়ে মুন্সী বাহিনীর মাদক ও অস্ত্রের নেটওয়ার্ক
চারঘাট রাওথা থেকে মীরগঞ্জ
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
১৩ আগস্ট ২০২৬