মতিহারে হামলা ও ভাঙচুরের শিকার পরিবারই কারাগারে
রাজশাহী মহানগরীর মতিহার থানা এলাকায় পৈতৃক জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে বসতবাড়িতে প্রকাশ্য দিবালোকে সশস্ত্র হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিপক্ষের ধারালো অস্ত্র ও লোহার রডের আঘাতে নারীসহ একই পরিবারের চারজন রক্তাক্ত জখম হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেও ন্যায়বিচার পাওয়া তো দূরের কথা, উল্টো ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানোর মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় থানা পুলিশের বিরুদ্ধে। বর্তমানে ভুক্তভোগী পরিবারের এক সদস্য কারাগারে দিন কাটাচ্ছেন এবং জামিনে মুক্তি পাওয়া বাকি সদস্যরা অব্যাহত হুমকি ও নতুন করে হামলার ভয়ে নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।
ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নগরীর কাজলা ধরমপুর কেডি ক্লাব সংলগ্ন এলাকায় পৈতৃক জমি ভাগাভাগি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দুই সহোদর মো. আব্দুল সালাম (৬৫) ও মো. কালামের পরিবারের মধ্যে বিরোধ চলছিল। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১১ সেপ্টেম্বর বেলা আনুমানিক ৩টার দিকে উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে কালামের ছেলে কায়েস (৩২), নয়ন (২২), স্ত্রী নাসিমা বেগম (৫৫), পুত্রবধূ মিতু (৩০) এবং তাদের ভাড়াটে অন্তত ১০ থেকে ২০ জন বহিরাগত সন্ত্রাসী দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে আব্দুল সালামের বসতবাড়িতে আকস্মিক হামলা চালায়। হামলাকারীরা লোহার রড, জিআই পাইপ ও ধারালো হাসুয়া দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে ও পিটিয়ে আব্দুল সালাম, তাঁর স্ত্রী মোসা. মিরা বেগম (৫৫), ছেলে সাজিদ হোসেন মেরিল (৩৩) এবং পুত্রবধূ মোসা. বর্ষাকে (২৬) গুরুতর আহত করে। একই সঙ্গে তারা ঘরের আসবাবপত্র ভাঙচুর ও মূল্যবান সামগ্রী লুট করে নিয়ে যায়। ওই দিন রাতেই পরিবারের আরেক সদস্য শাওনের (২৬) ওপরও অতর্কিত চড়াও হয় হামলাকারীরা।
রক্তাক্ত অবস্থায় স্থানীয়দের সহায়তায় আহতদের উদ্ধার করে তাৎক্ষণিকভাবে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় আঘাতের তীব্রতায় মিরা বেগমের ঠোঁটে ৬টি এবং ছেলে সাজিদ হোসেন মেরিলের মাথায় ১২টি সেলাই দিতে হয়। উভয়ের শরীরে ধারালো অস্ত্রের কোপ ও রডের মারধরের স্পষ্ট ক্ষতচিহ্ন রয়েছে।
এদিকে ঘটনার পর চরম শারীরিক যন্ত্রণার মধ্যেও ভুক্তভোগী পরিবার মতিহার থানায় লিখিত অভিযোগ নিয়ে গেলে পুলিশ তাদের মামলা গ্রহণ করেনি বলে জোরালো অভিযোগ করেন তাঁরা। উল্টো প্রতিপক্ষের দায়ের করা মিথ্যা ও সাজানো মামলায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা সত্ত্বেও আহত বৃদ্ধ আব্দুল সালাম এবং তাঁর দুই সন্তান মেরিল ও মেরিকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায় পুলিশ। পরবর্তীতে গত ১৩ সেপ্টেম্বর আব্দুল সালাম জামিনে কারামুক্ত হয়ে বাড়ি ফিরলে সেদিন বিকেলেই প্রতিপক্ষ কালামের পরিবারের সদস্যরা বহিরাগত সন্ত্রাসীদের নিয়ে ফের বাড়িতে চড়াও হয়। নতুন করে ভাঙচুর চালিয়ে পরিবারটিকে হত্যার হুমকি দেওয়া হলে চরম নিরাপত্তাহীনতায় তাঁরা বসতবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আত্মগোপন করতে বাধ্য হন। মিথ্যা মামলায় সাজিদ হোসেন মেরিল এখনো কারাবন্দী রয়েছেন।
ন্যায়বিচার ও জীবনের নিরাপত্তার দাবিতে দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ানো ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা আক্ষেপ করে জানান, প্রভাবশালীদের যোগসাজশে পুলিশ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের বদলে আক্রমণকারীদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। রক্তাক্ত জখম হয়েও তাঁরা আইনি সুরক্ষা পাচ্ছেন না। অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মতিহার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আরজুনের সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ না করায় তাঁর কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
এদিকে জনবহুল একটি এলাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে বাড়িতে ঢুকে এমন বর্বর হামলা এবং পরবর্তী সময়ে ভুক্তভোগীদের হয়রানির ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। সচেতন মহলের মতে, পারিবারিক কিংবা জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের সুযোগে বহিরাগতদের জড়িয়ে সন্ত্রাসী তাণ্ডব চালানো চরম ফৌজদারি অপরাধ। দ্রুত নিরপেক্ষ উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করে অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে অসহায় পরিবারটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।