রবিবার , ১৮ অক্টোবর ২০২৬
হোম › আজকের শীর্ষ সংবাদ › পদ্মায় অবৈধ বালুর মহোৎসব
দুই মাসে লুট পাঁচ কোটি টাকার বালু

পদ্মায় অবৈধ বালুর মহোৎসব

favicon
বিশেষ প্রতিনিধি :
পদ্মায় অবৈধ বালুর মহোৎসব
রাজশাহীর বাঘায় পদ্মা নদীর বুকে অবৈধভাবে বসানো শক্তিশালী ড্রেজার দিয়ে চলছে বালু উত্তোলন; পাইপলাইনের মাধ্যমে বাঁধসংলগ্ন চরে স্তূপ করে রাখা হচ্ছে উত্তোলিত বালু।

রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় প্রমত্তা পদ্মার বুকে চলছে অবৈধ বালু উত্তোলনের এক ভয়াবহ মহোৎসব। সরকারি নীতিমালার তোয়াক্কা না করে ইজারাকৃত সীমানার বাইরে শক্তিশালী ড্রেজার বসিয়ে দিনরাত কাটা হচ্ছে বালু। অভিযোগ উঠেছে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে স্থানীয় একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গত দুই মাসে নদীগর্ভ থেকে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা মূল্যের ৫০ লাখ ঘনফুট (সেফটি) বালু উত্তোলন করে বিক্রি করে দিয়েছে। এতে নদীভাঙনের তীব্র ঝুঁকিতে পড়েছে নবনির্মিত তীররক্ষা বাঁধ, ফসলি জমি ও নদীপাড়ের জনপদ; অন্যদিকে সরকার বঞ্চিত হচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে।

রাজশাহী জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বাঘা উপজেলার লক্ষ্মীনগর বালুমহালের জন্য মাত্র ২৪ একর নদী এলাকা ইজারা দেওয়া হয়। সাত কোটি টাকার রাজস্ব দিয়ে এই মহালের বৈধ ইজারা নেয় নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান মেসার্স সিফাত এন্টারপ্রাইজ। তবে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইজারাকৃত সীমানা থেকে অন্তত পাঁচ কিলোমিটার দূরে পদ্মা নদীর তিনটি ভিন্ন পয়েন্টে অবাধে ড্রেজার বসিয়ে বালু কাটা হচ্ছে। কিশোরপুর মাদ্রাসা ঘাট, গোকুলপুরের তাহেরের ঘাট এবং খায়েরহাটের শিমুলতলা সংলগ্ন এলাকায় দিনরাত ড্রেজার চালিয়ে নদী ক্ষতবিক্ষত করা হচ্ছে। উত্তোলিত এসব বালু পাইপলাইনের মাধ্যমে নদীপাড়ে এনে পাহাড়সম স্তূপ তৈরি করা হচ্ছে। পরবর্তীতে সেখান থেকে রাজশাহী, নাটোর, পাবনা ও কুষ্টিয়ার অন্তত ১০টি অঞ্চলে ট্রাকে করে বালু সরবরাহ ও বিপণন চলছে।

সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, কিশোরপুর এলাকার মাদ্রাসা ঘাটে অবস্থান করছে একাধিক বাল্কহেড ও বড় নৌকা। নদী থেকে প্রায় এক কিলোমিটার লোহার পাইপ টেনে নবনির্মিত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ওপর ও সংলগ্ন এলাকায় বালুর বিশাল ডিপো তৈরি করা হয়েছে। নদী থেকে ড্রেজারের সাহায্যে পাইপের মাধ্যমে সরাসরি সেই স্তূপে বালু ফেলা হচ্ছে। গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে নদীগর্ভে থাকা কয়েকটি ড্রেজার ও বালুভর্তি নৌযান তাৎক্ষণিকভাবে নিরাপদ দূরত্বে সরে যায়।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের মূল ইজারাদারের নাম ও ভুয়া রশিদ ব্যবহার করে স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের কিছু নেতাকর্মী এবং ব্যবসায়ী একটি প্রভাবশালী বলয় গড়ে তুলেছেন। চরাঞ্চলের চিহ্নিত অভ্যন্তরীণ দলগুলোকে প্রভাব ও অর্থের বিনিময়ে পক্ষে রেখে পুরো নদী এলাকা এই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ইজারাদার আরফান মিয়ার দাবি, তিনি সরকারকে মোটা অঙ্কের রাজস্ব দিয়ে ইজারা নিয়ে এখন সর্বস্বান্ত হওয়ার পথে। তাঁর প্রতিষ্ঠানের সিল ও ভুয়া রশিদ ছাপিয়ে একটি কায়েমী স্বার্থান্বেষী চক্র এই বালু লুটের কারবার চালাচ্ছে, যার প্রতিকার চেয়ে তিনি জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কাছে একাধিকবার লিখিত অভিযোগও দায়ের করেছেন।

অবাধ বালু উত্তোলনের ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন এবং সদ্য সমাপ্ত বাঁধ ধসে যাওয়ার আশঙ্কায় তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে। গত ৫ অক্টোবর এই বেপরোয়া বালু উত্তোলন বন্ধ এবং বাঁধ রক্ষার দাবিতে বাঘা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন গোকুলপুর এলাকার শিক্ষার্থী রাতুল হাসান। অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, নদী ও পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে লিখিত অভিযোগ দেওয়ায় এবং মানববন্ধনের উদ্যোগ নেওয়ায় ওই শিক্ষার্থীকে প্রাণনাশের হুমকিসহ নানা ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। ফলে চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন তিনি ও তাঁর পরিবার।

নদীতে পরিচালিত এই অপতৎপরতা সম্পর্কে বাঘা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তকী ফয়সাল তালুকদার জানিয়েছেন, নদী থেকে অবৈধভাবে বালু কাটার প্রমাণ প্রশাসনের হাতে এসেছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা করতে গেলে সংশ্লিষ্টরা সটকে পড়ে। তবে নদী ও বাঁধ রক্ষায় নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির পক্ষ থেকেও স্পষ্ট জানানো হয়েছে, অনুমোদিত সীমানার বাইরে বালু উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই এবং সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

পদ্মায় অবৈধ বালুর মহোৎসব
দুই মাসে লুট পাঁচ কোটি টাকার বালু
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
১৭ অক্টোবর ২০২৬
দৈনিক উপচার
 রবিবার , ১৮ অক্টোবর ২০২৬
হোম › আজকের শীর্ষ সংবাদ › পদ্মায় অবৈধ বালুর মহোৎসব
দুই মাসে লুট পাঁচ কোটি টাকার বালু

পদ্মায় অবৈধ বালুর মহোৎসব

favicon
বিশেষ প্রতিনিধি :
পদ্মায় অবৈধ বালুর মহোৎসব
রাজশাহীর বাঘায় পদ্মা নদীর বুকে অবৈধভাবে বসানো শক্তিশালী ড্রেজার দিয়ে চলছে বালু উত্তোলন; পাইপলাইনের মাধ্যমে বাঁধসংলগ্ন চরে স্তূপ করে রাখা হচ্ছে উত্তোলিত বালু।

রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় প্রমত্তা পদ্মার বুকে চলছে অবৈধ বালু উত্তোলনের এক ভয়াবহ মহোৎসব। সরকারি নীতিমালার তোয়াক্কা না করে ইজারাকৃত সীমানার বাইরে শক্তিশালী ড্রেজার বসিয়ে দিনরাত কাটা হচ্ছে বালু। অভিযোগ উঠেছে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে স্থানীয় একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গত দুই মাসে নদীগর্ভ থেকে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা মূল্যের ৫০ লাখ ঘনফুট (সেফটি) বালু উত্তোলন করে বিক্রি করে দিয়েছে। এতে নদীভাঙনের তীব্র ঝুঁকিতে পড়েছে নবনির্মিত তীররক্ষা বাঁধ, ফসলি জমি ও নদীপাড়ের জনপদ; অন্যদিকে সরকার বঞ্চিত হচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে।

রাজশাহী জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বাঘা উপজেলার লক্ষ্মীনগর বালুমহালের জন্য মাত্র ২৪ একর নদী এলাকা ইজারা দেওয়া হয়। সাত কোটি টাকার রাজস্ব দিয়ে এই মহালের বৈধ ইজারা নেয় নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান মেসার্স সিফাত এন্টারপ্রাইজ। তবে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইজারাকৃত সীমানা থেকে অন্তত পাঁচ কিলোমিটার দূরে পদ্মা নদীর তিনটি ভিন্ন পয়েন্টে অবাধে ড্রেজার বসিয়ে বালু কাটা হচ্ছে। কিশোরপুর মাদ্রাসা ঘাট, গোকুলপুরের তাহেরের ঘাট এবং খায়েরহাটের শিমুলতলা সংলগ্ন এলাকায় দিনরাত ড্রেজার চালিয়ে নদী ক্ষতবিক্ষত করা হচ্ছে। উত্তোলিত এসব বালু পাইপলাইনের মাধ্যমে নদীপাড়ে এনে পাহাড়সম স্তূপ তৈরি করা হচ্ছে। পরবর্তীতে সেখান থেকে রাজশাহী, নাটোর, পাবনা ও কুষ্টিয়ার অন্তত ১০টি অঞ্চলে ট্রাকে করে বালু সরবরাহ ও বিপণন চলছে।

সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, কিশোরপুর এলাকার মাদ্রাসা ঘাটে অবস্থান করছে একাধিক বাল্কহেড ও বড় নৌকা। নদী থেকে প্রায় এক কিলোমিটার লোহার পাইপ টেনে নবনির্মিত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ওপর ও সংলগ্ন এলাকায় বালুর বিশাল ডিপো তৈরি করা হয়েছে। নদী থেকে ড্রেজারের সাহায্যে পাইপের মাধ্যমে সরাসরি সেই স্তূপে বালু ফেলা হচ্ছে। গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে নদীগর্ভে থাকা কয়েকটি ড্রেজার ও বালুভর্তি নৌযান তাৎক্ষণিকভাবে নিরাপদ দূরত্বে সরে যায়।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের মূল ইজারাদারের নাম ও ভুয়া রশিদ ব্যবহার করে স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের কিছু নেতাকর্মী এবং ব্যবসায়ী একটি প্রভাবশালী বলয় গড়ে তুলেছেন। চরাঞ্চলের চিহ্নিত অভ্যন্তরীণ দলগুলোকে প্রভাব ও অর্থের বিনিময়ে পক্ষে রেখে পুরো নদী এলাকা এই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ইজারাদার আরফান মিয়ার দাবি, তিনি সরকারকে মোটা অঙ্কের রাজস্ব দিয়ে ইজারা নিয়ে এখন সর্বস্বান্ত হওয়ার পথে। তাঁর প্রতিষ্ঠানের সিল ও ভুয়া রশিদ ছাপিয়ে একটি কায়েমী স্বার্থান্বেষী চক্র এই বালু লুটের কারবার চালাচ্ছে, যার প্রতিকার চেয়ে তিনি জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কাছে একাধিকবার লিখিত অভিযোগও দায়ের করেছেন।

অবাধ বালু উত্তোলনের ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন এবং সদ্য সমাপ্ত বাঁধ ধসে যাওয়ার আশঙ্কায় তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে। গত ৫ অক্টোবর এই বেপরোয়া বালু উত্তোলন বন্ধ এবং বাঁধ রক্ষার দাবিতে বাঘা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন গোকুলপুর এলাকার শিক্ষার্থী রাতুল হাসান। অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, নদী ও পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে লিখিত অভিযোগ দেওয়ায় এবং মানববন্ধনের উদ্যোগ নেওয়ায় ওই শিক্ষার্থীকে প্রাণনাশের হুমকিসহ নানা ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। ফলে চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন তিনি ও তাঁর পরিবার।

নদীতে পরিচালিত এই অপতৎপরতা সম্পর্কে বাঘা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তকী ফয়সাল তালুকদার জানিয়েছেন, নদী থেকে অবৈধভাবে বালু কাটার প্রমাণ প্রশাসনের হাতে এসেছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা করতে গেলে সংশ্লিষ্টরা সটকে পড়ে। তবে নদী ও বাঁধ রক্ষায় নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির পক্ষ থেকেও স্পষ্ট জানানো হয়েছে, অনুমোদিত সীমানার বাইরে বালু উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই এবং সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

পদ্মায় অবৈধ বালুর মহোৎসব
দুই মাসে লুট পাঁচ কোটি টাকার বালু
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
১৭ অক্টোবর ২০২৬