সড়ক দুর্ঘটনা নাকি ঠান্ডা মাথার হত্যাকাণ্ড
প্রথম দেখায় এটি রাজশাহী-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়কের আর দশটি নিয়মিত সড়ক দুর্ঘটনার মতো মনে হলেও এর পরতে পরতে জড়িয়ে রয়েছে রক্তক্ষয়ী রহস্য আর গুরুতর অভিযোগের জাল। আপাতদৃষ্টিতে মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে আছড়ে পড়ার ঘটনা হিসেবে প্রচার করা হলেও নিহতের শরীরের জখমের প্রকৃতি, প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি এবং অভিযুক্তের পরবর্তী পদক্ষেপ এটিকে ঠান্ডা মাথার এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দিকেই নির্দেশ করছে। ঘটনার দুই মাস পেরিয়ে গেলেও মূল অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার কিংবা আলামত জব্দ করা হয়নি। উল্টো অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে-বাদী ও বিবাদী কোনো পক্ষই আর মামলা চালাতে আগ্রহী নয়; বরং থানা পুলিশের মধ্যস্থতায় উভয় পক্ষ বসে মোটা অঙ্কের বিনিময়ে আপস-মীমাংসার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়েছে। তবে মোহনপুর থানার পুলিশ আপস-মীমাংসার বিষয়ে অস্বীকার করেন।
জানা যায়, নওগাঁর সাপাহার ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী মোছা. খাদিজা খাতুন গত ২৫ জুলাই পরীক্ষার উদ্দেশ্যে বাবার বাড়ি থেকে বের হয়ে স্বামীর বাড়ি যাওয়ার কথা জানান। এরপর কীভাবে তিনি নিয়ামতপুরের সমাসপুর গ্রামের আলাউদ্দীন মণ্ডলের ছেলে মো. আ. মোত্তালেবের মোটরসাইকেলের সহযাত্রী হলেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
অনুসন্ধান বলছে, গত ২৬ জুলাই দুপুর আনুমানিক সাড়ে বারোটার দিকে রাজশাহী থেকে তীব্র গতিতে মোটরসাইকেল চালিয়ে নওগাঁর দিকে ফিরছিল মোত্তালেব। পথিমধ্যে মোহনপুরের খয়রা গ্রামস্থ ডন এন্টারপ্রাইজের সামনের ফাঁকা সড়কে পৌঁছালে মোটরসাইকেলটি রাস্তার পাশের একটি কড়াই গাছে সজোরে ধাক্কা খায়। এতে খাদিজা ছিটকে পাকা রাস্তার ওপর আছড়ে পড়েন।
রহস্যের গভীরতা তৈরি হয়েছে দুর্ঘটনার ঠিক পরবর্তী দৃশ্যপটে। স্থানীয় কোল্ডস্টোরেজের কর্মী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, গাছে ধাক্কা লেগে খাদিজা ছিটকে পড়ার পর মোত্তালেব তাঁকে বাঁচানোর কোনো চেষ্টাই করেনি। বরং নিথর অবস্থায় সড়কে পড়ে থাকা খাদিজার তলপেট ও শরীরের ওপর দিয়ে ভারী মোটরসাইকেলটি নির্মমভাবে চালিয়ে দিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে চম্পট দেয় সে। সহযাত্রীকে উদ্ধার না করে শরীরের ওপর চাকা তুলে দিয়ে পালিয়ে যাওয়া কোনো আকস্মিক ভয় নয়, বরং মৃত্যু নিশ্চিত করার এক পৈশাচিক অপপ্রয়াস বলেই প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণা। মাথায় ও পেটে ভয়াবহ অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ নিয়ে খাদিজা দীর্ঘক্ষণ সেখানে পড়েছিলেন। পরে স্থানীয়রা তাঁকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করান। সেখানে টানা চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ৫ আগস্ট রাতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি।
ঘটনার পর নিহতের পিতা মো. আনোয়ারুল হক বাদী হয়ে মোহনপুর থানায় ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইনের ১০৫ ধারায় একটি মামলা করেন। তবে নিহতের স্বজনদের প্রাথমিক অভিযোগ ছিল, সড়ক পরিবহন আইনের ধারায় মামলা রুজু করিয়ে এক পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড আড়াল করা হচ্ছে। ব্যক্তিগত কোনো বিরোধের জেরে খাদিজাকে কৌশলে ওই নির্জন এলাকায় নিয়ে ফেলে দেওয়া হয় এবং সুপরিকল্পিতভাবে মৃত্যু নিশ্চিত করতে তাঁর শরীরের ওপর মোটরসাইকেল তুলে দেওয়া হয়।
এদিকে ঘটনার দুই মাস পার হলেও মামলার প্রধান আসামি মোত্তালেবকে গ্রেপ্তার কিংবা তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি জব্দ করেনি মোহনপুর থানা পুলিশ। কিন্তু অনুসন্ধানে এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং চাঞ্চল্যকর মোড় বেরিয়ে এসেছে। মামলার তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে পুরো বিষয়টি আর্থিক রফাদফার মাধ্যমে ধামাচাপা দিতে একমত হয়েছে উভয় পক্ষ। বাদী ও বিবাদী উভয় পক্ষের আর কোনো ধরনের আইনি অভিযোগ বা আপত্তি নেই; দুই পক্ষই চায় না মামলাটি আর সামনে গড়াক বা কোনো বিচারিক প্রক্রিয়া চলুক।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ৬ সেপ্টেম্বর বেলা ১২টা ৩০ ঘটিকার সময় মোহনপুর থানায় এ সংক্রান্ত একটি আপস-মীমাংসার আনুষ্ঠানিক বৈঠক বসে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন অভিযুক্ত মোত্তালেবের পিতা আলহাজ আলাউদ্দিন ও ভগ্নিপতি মো. রিপন মাহমুদ। অন্যদিকে উপস্থিত ছিলেন বাদী আনোয়ারুল হক এবং তাঁর বড় ছেলে সারোয়ার হোসেন। মোহনপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মিজানুর রহমানের পরোক্ষ উপস্থিতিতে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) আ. রহিমের মধ্যস্থতায় এই সমঝোতা হয়। বৈঠকে আসামিকে গ্রেপ্তার বা মোটরসাইকেল জব্দ না করে পুরো ঘটনাটি ১০ লাখ টাকায় আপস-মীমাংসা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মধ্যে ৫ লাখ টাকা বাদীর পরিবার পাবে এবং অবশিষ্ট ৫ লাখ টাকা পুলিশ প্রশাসনের জন্য বরাদ্দ থাকবে বলে আলোচনা চূড়ান্ত হয় বলে জানা যায়।
বাদী ও বিবাদী উভয় পক্ষ সমঝোতায় পৌঁছানোর কারণে মামলার তদন্ত কার্যত থমকে গেছে। বাদীর বড় ছেলে সারোয়ার হোসেন থানায় বসার এবং ১০ লাখ টাকায় বিষয়টি আপস-মীমাংসা করার সত্যতা স্বীকার করেছেন। উভয় পরিবারই এখন মামলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার বা নিষ্পত্তি করে নিতে চাইছে।
তবে এমন সমঝোতা বৈঠকে বসার কথা পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই আ. রহিম।
তিনি দাবি করেন, থানায় বাদী বা বিবাদী কারও সঙ্গে এ ধরনের কোনো মধ্যস্থতা বা আপস-মীমাংসার বৈঠক হয়নি। অভিযোগটি সঠিক নয় দাবি করে তিনি জানান, আইন অনুযায়ী তদন্ত চলছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, ঘটনার দিন থানার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পরীক্ষা করলেই উভয় পক্ষের দীর্ঘ উপস্থিতি ও সমঝোতা বৈঠকের আনুষ্ঠানিক সত্যতা প্রমাণ মিলবে।
এ বিষয়ে মোহনপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মিজানুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোন কথা বলতে রাজি নন। তিনি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার সাথে কথা বলতে বলেন।
অন্যদিকে অভিযুক্ত মোত্তালেবের পিতা আলহাজ আলাউদ্দিন জানান, এটি একটি অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ছিল এবং উভয় পরিবারের সম্মতিতে সামাজিকভাবে বিষয়টি মীমাংসা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে দুই পক্ষের কাউকেই আর আইনি জটিলতায় ভোগান্তি পোহাতে না হয়।
একটি অস্বাভাবিক ও নৃশংস মৃত্যুর ঘটনাকে এভাবে নিছক দুর্ঘটনা সাজিয়ে, কোনো অভিযোগ না রাখার দোহাই দিয়ে এবং আইনের বাইরে গিয়ে থানা চত্বরেই লাখ টাকার বিনিময়ে সমঝোতা করে ফেলার প্রক্রিয়া নিয়ে সচেতন মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। ফৌজদারি অপরাধ ও মৃত্যুর মতো সংবেদনশীল ঘটনা এভাবে আপসে ধামাচাপা পড়ে যাওয়া ন্যায়বিচারের পরিপন্থী বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।