শুক্রবার , ১৫ মে ২০২৬
হোমআজকের শীর্ষ সংবাদবাগমারায় প্রকাশ্যে নির্যাতনের পর কারাগারে মৃত্যু
ভ্যানচালক ওমর ফারুক হত্যাকাণ্ডে ভয়াবহ প্রশ্নের মুখে সিএনজি সমিতি, ভ্রাম্যমাণ আদালত ও প্রশাসন

বাগমারায় প্রকাশ্যে নির্যাতনের পর কারাগারে মৃত্যু

favicon
স্টাফ রিপোর্টার :-
বাগমারায় প্রকাশ্যে নির্যাতনের পর কারাগারে মৃত্যু
কারাগারে মৃত্যুবরণ করা ভ্যানচালক ওমর ফারুক।

রাজশাহীর বাগমারায় প্রকাশ্যে নির্যাতনের শিকার হয়ে কারাগারে মৃত্যুবরণ করা ভ্যানচালক ওমর ফারুকের (৩৮) ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। চুরির অপবাদে স্থানীয় সিএনজি সমিতির নেতাদের নেতৃত্বে সংঘটিত এই ঘটনায় একদিকে যেমন মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে, তেমনি ভ্রাম্যমাণ আদালত, পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ঘটনাটি ঘটে গত ১৭ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় বাগমারা উপজেলার ভবানীগঞ্জ পৌর সদরের সিএনজি স্ট্যান্ড এলাকায়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়ি ফেরার পথে ওমর ফারুককে সিএনজি স্ট্যান্ডে আটক করে সিএনজি সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ একদল সদস্য। চুরির অভিযোগ তুলে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে শতাধিক মানুষের সামনে তাকে মারধর ও অমানবিক আচরণের শিকার করা হয়। স্থানীয়দের দাবি, ওই সময় ফারুক গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেও তাকে পানি ও চিকিৎসা দেওয়া হয়নি।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে পরে পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনকে খবর দেওয়া হয়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন বাগমারা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল ইসলাম ভুঞা। তিনি ওমর ফারুকের বিরুদ্ধে মাদক রাখার অভিযোগ এনে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাত দিনের কারাদণ্ড প্রদান করেন। তবে প্রত্যক্ষদর্শী ও পরিবারের অভিযোগ, ফারুক তখন গুরুতর আহত অবস্থায় ছিলেন এবং তার শরীরে নির্যাতনের স্পষ্ট চিহ্ন ছিল।

ভ্রাম্যমাণ আদালতের সাজা শেষে ওমর ফারুককে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়া হয় এবং সেখান থেকে রাতেই রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। কারাগারে নেওয়ার পর তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। পরদিন ১৮ ডিসেম্বর তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৪২ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০ ডিসেম্বর ভোরে পুলিশ ও কারারক্ষীদের হেফাজতেই তার মৃত্যু হয়।

রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার শাহ আলম খান জানিয়েছেন, ওমর ফারুককে আহত অবস্থায়ই কারাগারে গ্রহণ করা হয়েছিল এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সনদেও তার আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ ছিল। ময়নাতদন্ত শেষে যথাযথ প্রক্রিয়ায় মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

ঘটনাটি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে ব্যাপক অসঙ্গতি দেখা গেছে। সিএনজি সমিতির পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, চুরির ঘটনায় উত্তেজিত জনতা তাকে মারধর করেছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বলছেন, নির্যাতনের বিষয়টি তার চোখে পড়েনি এবং মাদক উদ্ধারের কারণেই সাজা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে কারা কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছে, ফারুককে আহত অবস্থায় গ্রহণ করা হয়েছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্যাতনের পর পরিস্থিতি সামাল দিতে পরিকল্পিতভাবে মাদকের অভিযোগ সাজানো হয়।

নিহত ফারুকের পরিবার দাবি করছে, এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। তার বাবা মসলেম সরদার ও মা পারুল বেগম বলেন, তাদের ছেলে দরিদ্র ভ্যানচালক ছিল। প্রকাশ্যে নির্যাতনের পর তাকে চিকিৎসা না দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাদের দাবি, এই নির্যাতনের বিচার না হলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আরও বাড়বে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে গুরুতর আহত একজন ব্যক্তিকে নির্যাতনকারীদের উপস্থিতিতেই ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা দেওয়া আইনসিদ্ধ কি না, কেন পুলিশ প্রথমে আহত ব্যক্তিকে গ্রহণ করেনি এবং কেন এখনো নির্যাতনের অভিযোগে কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।

এ বিষয়ে রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার ড. আ. ন. ম. বজলুর রশীদ ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুতর বলে উল্লেখ করে তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না থাকায় নিহতের পরিবার ও এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।

ওমর ফারুকের মৃত্যুর ঘটনায় বাগমারায় শোকের পাশাপাশি আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নিলে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

বাগমারায় প্রকাশ্যে নির্যাতনের পর কারাগারে মৃত্যু
ভ্যানচালক ওমর ফারুক হত্যাকাণ্ডে ভয়াবহ প্রশ্নের মুখে সিএনজি সমিতি, ভ্রাম্যমাণ আদালত ও প্রশাসন
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
২৩ ডিসেম্বর ২০২৫
দৈনিক উপচার
 শুক্রবার , ১৫ মে ২০২৬
হোমআজকের শীর্ষ সংবাদবাগমারায় প্রকাশ্যে নির্যাতনের পর কারাগারে মৃত্যু
ভ্যানচালক ওমর ফারুক হত্যাকাণ্ডে ভয়াবহ প্রশ্নের মুখে সিএনজি সমিতি, ভ্রাম্যমাণ আদালত ও প্রশাসন

বাগমারায় প্রকাশ্যে নির্যাতনের পর কারাগারে মৃত্যু

favicon
স্টাফ রিপোর্টার :-
বাগমারায় প্রকাশ্যে নির্যাতনের পর কারাগারে মৃত্যু
কারাগারে মৃত্যুবরণ করা ভ্যানচালক ওমর ফারুক।

রাজশাহীর বাগমারায় প্রকাশ্যে নির্যাতনের শিকার হয়ে কারাগারে মৃত্যুবরণ করা ভ্যানচালক ওমর ফারুকের (৩৮) ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। চুরির অপবাদে স্থানীয় সিএনজি সমিতির নেতাদের নেতৃত্বে সংঘটিত এই ঘটনায় একদিকে যেমন মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে, তেমনি ভ্রাম্যমাণ আদালত, পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ঘটনাটি ঘটে গত ১৭ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় বাগমারা উপজেলার ভবানীগঞ্জ পৌর সদরের সিএনজি স্ট্যান্ড এলাকায়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়ি ফেরার পথে ওমর ফারুককে সিএনজি স্ট্যান্ডে আটক করে সিএনজি সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ একদল সদস্য। চুরির অভিযোগ তুলে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে শতাধিক মানুষের সামনে তাকে মারধর ও অমানবিক আচরণের শিকার করা হয়। স্থানীয়দের দাবি, ওই সময় ফারুক গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেও তাকে পানি ও চিকিৎসা দেওয়া হয়নি।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে পরে পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনকে খবর দেওয়া হয়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন বাগমারা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল ইসলাম ভুঞা। তিনি ওমর ফারুকের বিরুদ্ধে মাদক রাখার অভিযোগ এনে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাত দিনের কারাদণ্ড প্রদান করেন। তবে প্রত্যক্ষদর্শী ও পরিবারের অভিযোগ, ফারুক তখন গুরুতর আহত অবস্থায় ছিলেন এবং তার শরীরে নির্যাতনের স্পষ্ট চিহ্ন ছিল।

ভ্রাম্যমাণ আদালতের সাজা শেষে ওমর ফারুককে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়া হয় এবং সেখান থেকে রাতেই রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। কারাগারে নেওয়ার পর তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। পরদিন ১৮ ডিসেম্বর তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৪২ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০ ডিসেম্বর ভোরে পুলিশ ও কারারক্ষীদের হেফাজতেই তার মৃত্যু হয়।

রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার শাহ আলম খান জানিয়েছেন, ওমর ফারুককে আহত অবস্থায়ই কারাগারে গ্রহণ করা হয়েছিল এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সনদেও তার আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ ছিল। ময়নাতদন্ত শেষে যথাযথ প্রক্রিয়ায় মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

ঘটনাটি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে ব্যাপক অসঙ্গতি দেখা গেছে। সিএনজি সমিতির পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, চুরির ঘটনায় উত্তেজিত জনতা তাকে মারধর করেছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বলছেন, নির্যাতনের বিষয়টি তার চোখে পড়েনি এবং মাদক উদ্ধারের কারণেই সাজা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে কারা কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছে, ফারুককে আহত অবস্থায় গ্রহণ করা হয়েছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্যাতনের পর পরিস্থিতি সামাল দিতে পরিকল্পিতভাবে মাদকের অভিযোগ সাজানো হয়।

নিহত ফারুকের পরিবার দাবি করছে, এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। তার বাবা মসলেম সরদার ও মা পারুল বেগম বলেন, তাদের ছেলে দরিদ্র ভ্যানচালক ছিল। প্রকাশ্যে নির্যাতনের পর তাকে চিকিৎসা না দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাদের দাবি, এই নির্যাতনের বিচার না হলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আরও বাড়বে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে গুরুতর আহত একজন ব্যক্তিকে নির্যাতনকারীদের উপস্থিতিতেই ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা দেওয়া আইনসিদ্ধ কি না, কেন পুলিশ প্রথমে আহত ব্যক্তিকে গ্রহণ করেনি এবং কেন এখনো নির্যাতনের অভিযোগে কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।

এ বিষয়ে রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার ড. আ. ন. ম. বজলুর রশীদ ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুতর বলে উল্লেখ করে তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না থাকায় নিহতের পরিবার ও এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।

ওমর ফারুকের মৃত্যুর ঘটনায় বাগমারায় শোকের পাশাপাশি আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নিলে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

বাগমারায় প্রকাশ্যে নির্যাতনের পর কারাগারে মৃত্যু
ভ্যানচালক ওমর ফারুক হত্যাকাণ্ডে ভয়াবহ প্রশ্নের মুখে সিএনজি সমিতি, ভ্রাম্যমাণ আদালত ও প্রশাসন
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
২৩ ডিসেম্বর ২০২৫