খাদ্যপণ্যের আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
যেসব খাদ্য ও কৃষিপণ্য দেশে উৎপাদন করা সম্ভব, সেগুলোর ক্ষেত্রে আমদানির ওপর নির্ভরতা ধাপে ধাপে কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ জন্য আধুনিক কৃষি গবেষণা, উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন, প্রযুক্তি সম্প্রসারণ এবং মাঠপর্যায়ে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ দ্রুত প্রান্তিক কৃষকদের দ্বারে পৌঁছে দেওয়ার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের প্রতি তাগিদ দিয়েছেন তিনি।
সকালে বাংলাদেশ সচিবালয়ে নিজ দপ্তর থেকে হেঁটে ও সিঁড়ি ব্যবহার করে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তিনি মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা বৈঠকে যোগ দেন। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌলা (সুজন মাহমুদ) সাংবাদিকদের এ বিষয়ে ব্রিফ করেন।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেন, দেশের ১৬ কোটি মানুষের দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষিকে একটি অত্যন্ত উৎপাদনশীল এবং কৃষকের জন্য বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক পেশায় পরিণত করতে হবে। কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানো, সেচ ও যন্ত্রপাতির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা এবং উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিতে রাষ্ট্রকে কার্যকর অভিভাবকের ভূমিকা পালনের নির্দেশ দেন তিনি।
বৈঠকে কৃষিখাতের সাম্প্রতিক সার্বিক অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা তুলে ধরে জানানো হয়, ভোজ্য তেলের আমদানি নির্ভরতা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনতে দেশজুড়ে উন্নত জাতের সরিষা চাষ বাড়ানো হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে যেখানে সরিষার মোট ফলন ছিল ৮ লাখ ২৪ হাজার টন, তা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৫ লাখ ৩৪ হাজার টন এবং সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১৫ লাখ ৪১ হাজার টনে উন্নীত হয়েছে।
পাশাপাশি পেঁয়াজের বার্ষিক ঘাটতি ও সংরক্ষণ জটিলতা মোকাবিলায় কৃষক পর্যায়ে আধুনিক ‘এয়ার-ফ্লো’ প্রযুক্তি সম্প্রসারণ এবং গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের আবাদ বৃদ্ধির অগ্রগতি তুলে ধরা হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি সামাল দিতে উপকূলীয় এলাকার জন্য লবণাক্ততাসহিষ্ণু এবং অন্যান্য অঞ্চলের জন্য খরা ও জলাবদ্ধতাসহিষ্ণু জাতের উদ্ভাবন ও বীজ বিতরণের বিষয়ও আলোচনায় আসে।
কৃষি গবেষণা সংক্রান্ত তথ্যে জানানো হয়, দেশের কৃষি বিজ্ঞানীদের নিরলস গবেষণায় বিভিন্ন ফসলের মোট ১ হাজার ৯০টি উন্নত জাত উদ্ভাবন সম্পন্ন হয়েছে, যার মধ্যে শুধু উচ্চফলনশীল ধানের জাতই রয়েছে ১৫৫টি। এ ছাড়া এক হাজারের বেশি লাগসই প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে হস্তান্তরের উপযোগী করা হয়েছে।
বৈঠকে উৎপাদন খরচ হ্রাস ও গতিশীলতা আনতে দেশীয় কৃষিযন্ত্র তৈরিতে প্রণোদনা প্রদান এবং ভর্তুকিমূল্যে কম্বাইন হারভেস্টার, রিপার ও রাইস ট্রান্সপ্লান্টার সরবরাহে বিশেষ জোর দেওয়া হয়। জ্বালানি খরচ বাঁচাতে দেশে চলমান ২ হাজার ৬১৭টি সৌর সেচ প্রকল্প আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে, যা সনাতন ডিজেলভিত্তিক সেচের ব্যয় অনেকটাই নামিয়ে আনবে।
এদিকে সরকারি সহায়তা ও ভর্তুকি প্রকৃত কৃষকের কাছে সরাসরি পৌঁছে দিতে ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচি বাস্তবায়নের অগ্রগতি জানানো হয়। কৃষি মন্ত্রণালয় ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রায় ৪৩ লাখ কৃষককে এই কার্ডের নেটওয়ার্কে যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যার মধ্যে প্রাথমিক ধাপে ১ লাখ ১০ হাজার কৃষককে দ্রুত এই কার্ড হস্তান্তর করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সামগ্রিক আলোচনায় খালখনন, সামাজিক বনায়ন এবং স্থানীয় সংরক্ষণাগার নির্মাণে সর্বাত্মক গতি বাড়ানোর নির্দেশনা দেন সরকারপ্রধান।