ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপে নারাজ ট্রাম্প
ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলের কৌশলগত এলাকাগুলোর দিকে তীব্র গতিতে অগ্রসর হতে থাকা ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটন এই মুহূর্তে কোনো সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেবে না বলে স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি দাবি করেছেন, হুথিরা কূটনৈতিক ও গোপন চ্যানেলের মাধ্যমে মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং তাদের সামরিক তৎপরতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেন কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ বা অভিযান না চালায়, সে অনুরোধ জানিয়েছে। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ আরবের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও হুথিদের অভিযান নিয়ে কথা বলেন। এ সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প খোলামেলাভাবে বলেন, হুথিরা ইতিমধ্যে আমাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেছে। তারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে তারা মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে কোনো সম্মুখ যুদ্ধে বা সংঘাতে জড়াতে চায় না। তাদের একমাত্র চাওয়া, আমরা যেন তাদের চলমান সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ বা অভিযান পরিচালনা না করি। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন বক্তব্যে বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে একটি বিস্তৃত আঞ্চলিক সংঘাত এড়াতে আপাতত হুথিদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অবস্থান থেকে বিরত থাকতে পারে হোয়াইট হাউস।
এদিকে ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলে হুথিদের ব্যাপক অভিযানের মধ্যেই সৌদি আরবের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ প্রধান তেল পাইপলাইনে সিরিজ ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। ড্রোন হামলার পরপরই সৌদি কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা ও ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কায় পাইপলাইনটি দিয়ে তেল সরবরাহ সাময়িকভাবে সম্পূর্ণ স্থগিত ঘোষণা করেছে। এই পাইপলাইনটি সৌদি আরবের জ্বালানি রফতানির অন্যতম প্রধান প্রাণকেন্দ্র; যা ঝুঁকিপূর্ণ হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে লোহিত সাগরের বন্দর দিয়ে তেল বিশ্ববাজারে পৌঁছানোর একমাত্র বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। ফলে এই পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা ও ভূরাজনৈতিক উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
হামলার উৎস নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের গোয়েন্দা মহলে চলছে নানা জল্পনা। সৌদি আরবের একটি উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা সূত্রের দাবি, এই ড্রোন হামলাটি সরাসরি ইয়েমেন থেকে চালানো হয়নি, বরং তা ইরাকের অভ্যন্তরীণ ভূখণ্ড থেকে ছোঁড়া হয়েছে। এই ঘটনার পরপরই বাগদাদের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধি পায়। আঞ্চলিক সামরিক উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে ইরাক সরকার তাদের এক শীর্ষ সামরিক কমান্ডারকে বরখাস্ত করেছে এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দৃঢ় আশ্বাস দিয়েছে। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আরও নিশ্চিত করা হয়েছে যে, ইরান সীমান্তসংলগ্ন ইরাকের একটি প্রত্যন্ত প্রদেশে ড্রোন উৎক্ষেপণ ও নিয়ন্ত্রণের বেশ কিছু উন্নত সামরিক সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে নিরাপত্তা বাহিনী।
অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে দ্রুত সফল হচ্ছে হুথি বিদ্রোহীরা। লোহিত সাগরের কৌশলগত মোখা বন্দর ও এর আশপাশের অঞ্চল দখলের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে গত সপ্তাহে এক সাঁড়াশি অভিযান শুরু করে তারা। শুক্রবার হুথিদের অগ্রবর্তী সেনাদল মোখা শহরের প্রবেশদ্বারে পৌঁছে গেলে সম্ভাব্য রক্তক্ষয় এড়াতে শহরটিতে আগে থেকে অবস্থানরত সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর সদস্যরা নিজেদের অবস্থান ত্যাগ করে পিছু হটতে বাধ্য হয়। সব মিলিয়ে লোহিত সাগর উপকূল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে এক অভূতপূর্ব সামরিক উত্তেজনা ও ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠছে।