শ্বেতপত্রের অনিয়ম নিয়ে আইনি পদক্ষেপের প্রস্তুতি
বিগত সরকারের আমলে বাস্তবায়িত বড় বড় উন্নয়ন ও মেগা প্রকল্পে সংঘটিত আর্থিক অনিয়ম, মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় বৃদ্ধি এবং দুর্নীতির অভিযোগগুলোর আনুষ্ঠানিক তদন্ত ও আইনি জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রণীত অর্থনৈতিক শ্বেতপত্রে উঠে আসা তথ্যের ভিত্তিতে বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পের অনিয়মের অনুসন্ধান এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে। তবে শ্বেতপত্রে উল্লেখিত সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির বিশদ পরিসংখ্যানকে সুনির্দিষ্ট আইনি প্রমাণে রূপ দিয়ে প্রকৃত অপরাধীদের আদালতের মুখোমুখি করা এক ধরনের বড় প্রশাসনিক ও আইনি চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও আইন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, একটি অর্থনৈতিক সমীক্ষা বা শ্বেতপত্রে কোনো প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে অতিরিক্ত খরচ কিংবা দীর্ঘসূত্রতার কারণে আর্থিক ক্ষতি নির্দেশ করা হলেও, ফৌজদারি আদালতে দুর্নীতির দায় প্রমাণ করতে প্রয়োজন হয় নিশ্ছিদ্র তথ্যপ্রমাণ। এর জন্য প্রকল্প অনুমোদনের প্রাথমিক নথি, সরকারি কেনাকাটার আন্তর্জাতিক ও জাতীয় দরপত্র প্রক্রিয়া, দফায় দফায় ব্যয় বৃদ্ধি ও নকশা সংশোধনের যৌক্তিকতা, জমি অধিগ্রহণে বাড়তি অর্থ বরাদ্দ, ঠিকাদার নিয়োগের নেপথ্য কারণ এবং অর্থ ছাড়ের গতিপ্রকৃতি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা অপরিহার্য। এই জটিল অনুসন্ধান প্রক্রিয়া রাজনৈতিক প্রভাব এবং আমলাতান্ত্রিক হস্তক্ষেপমুক্ত না হলে দায়ীদের চিহ্নিত করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে।
এর আগে অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটির শ্বেতপত্রে বিগত দেড় দশকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ব্যয়ের ক্ষেত্রে ব্যাপক অস্বচ্ছতার চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল। সেখানে উল্লেখ করা হয়, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে মাত্রাতিরিক্ত বরাদ্দ, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং অপ্রয়োজনীয় ক্রয়ের মাধ্যমে প্রায় পৌনে তিন লাখ কোটি টাকা পর্যন্ত আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, পদ্মা রেল সংযোগ, দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ, পায়রা বন্দর ও মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো শীর্ষ সাতটি মেগা প্রকল্পে দফায় দফায় সংশোধনের মাধ্যমে প্রাথমিক প্রাক্কলনের তুলনায় প্রায় ৮০ হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো হয়েছিল। তবে গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি বা যৌক্তিক ব্যয়বৃদ্ধির কারণগুলোকে চিহ্নিত করে প্রকৃত যোগসাজশ ও আত্মসাতের ঘটনা আলাদা করাই এখন তদন্তকারীদের মূল দায়িত্ব।
উন্নয়ন অর্থনীতি বিষয়ক গবেষকদের মতে, মেগা প্রকল্পের অনিয়ম অনুসন্ধানে কেবল অতীতের দায় নির্ধারণ করাই যথেষ্ট নয়, বরং ভবিষ্যতের প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ফেরাতে উন্মুক্ত দরপত্র, নিরপেক্ষ নিরীক্ষা এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সক্রিয় নজরদারি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তদন্ত প্রক্রিয়া আমলাতন্ত্রের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হলে তা কার্যকারিতা হারাতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। কারণ অতীতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন ও অনুমোদনের প্রতিটি ধাপে উচ্চপর্যায়ের আমলাদের ভূমিকা ছিল মুখ্য। ফলে কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা আমলাতান্ত্রিক বলয় নিজেদের রক্ষা করতে যাতে তদন্তের গতিপথ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে না পারে, সেজন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) একক এখতিয়ার দিয়ে তদন্তে নামানো উচিত। দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের ২৩ ধারা অনুযায়ী দক্ষ বিশেষজ্ঞ দল গঠন এবং আন্তঃসংস্থার তথ্য সমন্বয়ের মাধ্যমে মানি লন্ডারিং ও আর্থিক দুর্নীতির জটিল দিকগুলো উন্মোচন করে শ্বেতপত্রের পর্যবেক্ষণকে সফল বিচারিক পরিণতিতে রূপ দেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।