কলকাতার হাসপাতালের মৃত্যুসনদ ও পুরোনো নথির ফাঁদে রাজশাহীতে কার মরদেহ দাফন
প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে চিরবিদায় নেওয়া এক ব্যক্তির সরকারি ও ব্যক্তিগত নথিপত্র ব্যবহার করে মধ্যরাতে রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী একটি গোরস্থানে অজ্ঞাত এক ব্যক্তির মরদেহ দাফনের পেছনে এক অন্ধকার রহস্যের জাল উন্মোচিত হয়েছে।
কাগজপত্রে মৃত ব্যক্তির নাম রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক সহকারী প্রকৌশলী হেফাজ উদ্দিন হিসেবে উল্লেখ থাকলেও স্থানীয় নথি, স্বজন ও সহকর্মীদের অভিন্ন তথ্য অনুযায়ী তিনি মারা গিয়েছিলেন ২০২৩ সালের ১৭ মার্চ।
অথচ সাড়ে তিন বছর পর, ২০২৬ সালের জুলাই মাসের গভীর রাতে ভারতের কলকাতার মনিপাল হাসপাতালের একটি মৃত্যুসনদ জুড়ে দিয়ে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে পুনরায় তাঁর নামেই দাফন সম্পন্ন করা হয়।
প্রশ্ন উঠেছে-তবে কি কোনো বড় ধরনের হত্যাকাণ্ড বা আন্তর্জাতিক অপরাধ ধামাচাপা দিতেই ২০২৩ সালে মৃত্যুবরণ করা একজন ব্যক্তির নথিপত্র ব্যবহার করে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে রাজশাহীর মাটিতে অজ্ঞাত কারো মরদেহ পুঁতে ফেলা হলো?
এই গা শিউরে ওঠা ঘটনা নিয়ে সরেজমিন অনুসন্ধানী সংবাদ প্রকাশের পরই সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককে সরাসরি প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতিতে রহস্যের জট খুলতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে কবর থেকে মরদেহ উত্তোলন, ফরেনসিক ময়নাতদন্ত এবং নিবিড় ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের দাবি এখন সর্বস্তরে।
অনুসন্ধানের গভীরে গিয়ে জানা যায়, গত ২৮ জুলাই দিবাগত গভীর রাতে অর্থাৎ রাত আনুমানিক ২টা ১০ মিনিটে রাজশাহী মহানগরীর টিকাপাড়া গোরস্থানের সামনে দুটি বিলাসবহুল ব্যক্তিগত কার ও একটি আধুনিক অ্যাম্বুলেন্স এসে থামে। গাড়িগুলো থেকে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে একটি বড় কাঠের কফিন নামিয়ে গোরস্থানের ভেতরে নেওয়া হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, কফিনটি দেখতে অনেকটা বাণিজ্যিক কার্গো বা চা পাতার বাক্সের মতো ছিল, যার ফাঁকফোকর দিয়ে ভেতরে থাকা মরদেহের সাদা কাফনের কাপড় স্পষ্ট দৃশ্যমান ছিল। অ্যাম্বুলেন্সসহ তিনটি গাড়িতে উপস্থিত চার ব্যক্তির রহস্যজনক আচরণ পুরো প্রক্রিয়াকে আরও সন্দেহজনক করে তোলে। মৃত ব্যক্তির আত্মীয় বা স্বজন পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিরা কফিনে কোনো স্পর্শ করেননি, কবরে নামানো বা মাটি দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেননি এবং কোনো ধর্মীয় দোয়া-মুনাজাত পরিচালনা না করেই তড়িঘড়ি করে গোরস্থান ত্যাগ করেন।
গোরস্থান কর্তৃপক্ষের দাফন রেজিস্ট্রারে জমাকৃত কাগজপত্র পর্যালোচনায় এক অবিশ্বাস্য জালিয়াতির স্পষ্ট প্রমাণ মেলে। সেখানে দাফনকৃত ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রত্যয়ন এবং ভারতের কলকাতার বেসরকারি মনিপাল হাসপাতালের একটি মৃত্যুসনদ দাখিল করা হয়। হাসপাতালটির ওই সনদে মৃত্যুর তারিখ দেখানো হয়েছে ২০২৬ সালের ১০ জুলাই। কিন্তু হেফাজ উদ্দিনের মূল পারিবারিক বাসভবনের নিরাপত্তাকর্মী, সাবেক প্রতিবেশী ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক সহকর্মীদের স্পষ্ট সাক্ষ্য অনুযায়ী, হেফাজ উদ্দিন পেটের জটিলতায় ভুগে ২০২৩ সালের মার্চেই ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এবং সে সময়ই তাঁর জানাজা সম্পন্ন হয়। ফলে ২০২৩ সালে পৃথিবী ছেড়ে যাওয়া একজন মানুষের নামে ২০২৬ সালে কীভাবে কলকাতার একটি স্বনামধন্য হাসপাতালের সিল-স্বাক্ষরযুক্ত মৃত্যুসনদ তৈরি হলো এবং সেই সনদের ওপর ভিত্তি করে আন্তর্জাতিক সীমান্ত পার হয়ে মধ্যরাতে কার মরদেহ রাজশাহী এসে পৌঁছাল-তা এক বিরাট ফৌজদারি ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এদিকে এই চাঞ্চল্যকর অনিয়মের নেপথ্য সত্য জনসমক্ষে এনে গত ৫ সেপ্টেম্বর ‘সাড়ে তিন বছর আগে মৃত হেফাজের নামে দাফন হলো কার’ শিরোনামে বিশদ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেন জাতীয় দৈনিক ‘দৈনিক সকালের সময়’-এর রাজশাহী ব্যুরো প্রধান মো. শাহিনুর রহমান সোনা। প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার পরপরই গত ৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে তাঁর ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে কল আসে। কলদাতা সাংবাদিক সোনাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে এবং নিজেকে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) শীর্ষ কর্মকর্তার নিকটাত্মীয় পরিচয় দিয়ে ক্ষমতার দম্ভ দেখায়। সংবাদ প্রকাশের অপরাধে তাঁকে হত্যা করাসহ যেকোনো উপায়ে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার সরাসরি হুমকি দেওয়া হয়। এ ঘটনায় পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে চরম নিরাপত্তাহীনতায় পড়ে সাংবাদিক শাহিনুর রহমান সোনা নগরীর বোয়ালিয়া মডেল থানায় জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নম্বর-৫৪২) দায়ের করেছেন।
বোয়ালিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাসুমা মুস্তারী ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে হুমকিদাতাকে শনাক্ত ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন।
পেশাদার অনুসন্ধানী সাংবাদিককে এমন প্রকাশ্য প্রাণনাশের হুমকির ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ।
রাজশাহী প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তাফা মামুন বলেন, সত্য আড়াল করতে সাংবাদিককে হত্যার হুমকি দেওয়া প্রমাণ করে এই রহস্যজনক দাফনের পেছনে কোনো রাঘববোয়ালের হাত রয়েছে। পুলিশ প্রশাসনকে কালক্ষেপণ না করে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় হুমকিদাতার মূল হোতাকে অবিলম্বে আইনের আওতায় আনতে হবে।
অন্যদিকে জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা রাজশাহী বিভাগীয় কমিটির নেতৃবৃন্দরা পুরো ঘটনার শিকড় উপড়ে ফেলার জোর দাবি জানিয়ে বলেন, সাড়ে তিন বছর আগের মৃত মানুষের নামে ভুয়া ভারতীয় মৃত্যুসনদ বানিয়ে মধ্যরাতে মরদেহ দাফন সাধারণ কোনো ঘটনা নয়। এর সঙ্গে কোনো বড় অপরাধী চক্রের সংশ্লিষ্টতা, সীমান্ত পেরিয়ে পরিচয় গোপন করা কিংবা কোনো চাঞ্চল্যকর খুনের লাশ গুম করার গভীর ষড়যন্ত্র থাকতে পারে। টিকাপাড়ার কবরে শায়িত ব্যক্তিটি আসলে কে-তা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে একজন প্রথম শ্রেণির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে কবর খুঁড়ে মরদেহ উত্তোলন করতে হবে।
তারা আরো বলেন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে ফরেনসিক ময়নাতদন্ত ও লাশের ডিএনএ সংগ্রহ করে নিখোঁজ ব্যক্তিদের ডেটাবেসের সঙ্গে মিলিয়ে প্রকৃত পরিচয় শনাক্ত করাই এখন সত্য উন্মোচনের একমাত্র পথ। একই সাথে ভুক্তভোগী সাংবাদিকের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করারও জোরালো দাবি জানান তিনি।
এদিকে এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে রাজশাহী জেলার বিভিন্ন উপজেলার সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে তীব্র প্রতিবাদ ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তানোর, গোদাগাড়ী, বাগমারা, চারঘাট, বাঘা, পুঠিয়া, দুর্গাপুর, পবা ও মোহনপুরসহ বিভিন্ন উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা একযোগে ক্ষোভে ফেটে পড়েন। সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ সামাজিক মাধ্যমে জোরালো বক্তব্য তুলে ধরে বলেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা সমাজ ও রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দর্পণ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। সেই দর্পণে দুর্নীতিবাজ ও অপরাধীদের আসল চেহারা ফুটে ওঠায় আজ একজন নিষ্ঠাবান সাংবাদিককে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে, যা একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক সমাজে আইনের শাসনের ওপর সরাসরি চরম আঘাত। হুমকিদাতারা যত বড় ক্ষমতাবান বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নাম ভাঙাক না কেন, দেশের প্রচলিত আইনের ঊর্ধ্বে ওঠার কোনো সুযোগ তাদের নেই।
নেতৃবৃন্দরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, অনতিবিলম্বে হুমকিদাতাকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি না করা হলে রাজশাহীর সমস্ত গণমাধ্যমকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করে রাজপথে নামা হবে এবং বৃহত্তর কঠোর আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে।
একই সাথে বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের দায়িত্বশীল নেতারা প্রশাসনকে এই আন্তর্জাতিক মৃত্যুসনদ জালিয়াতি ও রহস্যজনক দাফনকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্তে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) বা বিচার বিভাগীয় উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের জোর দাবি জানিয়েছেন।