রবিবার , ৩০ আগস্ট ২০২৬
হোমস্পেশালআ. লীগের ডিসেম্বর কেন্দ্রীক তৎপরতা, গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ভয়ংকর তথ্য

আ. লীগের ডিসেম্বর কেন্দ্রীক তৎপরতা, গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ভয়ংকর তথ্য

favicon
উপচার ডেস্ক :-
আ. লীগের ডিসেম্বর কেন্দ্রীক তৎপরতা, গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ভয়ংকর তথ্য

ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা হারিয়ে দীর্ঘ সময় নীরব থাকার পর ডিসেম্বরকে ঘিরে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। দলটির নেতাকর্মীদের পুনরায় সংগঠিত করা, বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করা এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে সাংগঠনিক উপস্থিতি জানান দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, ডিসেম্বরকে সামনে রেখে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সক্রিয় রাখার পরিকল্পনার পাশাপাশি ভারতে অবস্থানরত দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সমর্থকদের সংঘবদ্ধ করার প্রচেষ্টা চলছে। এ সুযোগকে ঘিরে বিশৃঙ্খলা ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের আশঙ্কার তথ্যও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কাছে এসেছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

এ ছাড়া বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নেতাকর্মীদের নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রয়েছে বলেও গোয়েন্দাদের দাবি। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আধুনিক প্রযুক্তি এবং বিভিন্ন এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করে সাংগঠনিক নির্দেশনা ও সমন্বয় কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

নারায়ণগঞ্জের পলাতক নেতা শামীম ওসমানও ডিসেম্বরকে সামনে রেখে নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানা গেছে। এ-সংক্রান্ত একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এসব বিষয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে সরকারের উচ্চপর্যায়ে অবহিত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল
সাংগঠনিক শক্তির জানান দিতে গত দুই সপ্তাহে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা কয়েকটি ঝটিকা মিছিল করেছেন বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

বনানী, ময়মনসিংহ, শরীয়তপুর, সাভার ও সুনামগঞ্জের ঘটনাগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এরই মধ্যে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সব ইউনিটকে সতর্ক করে মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ময়মনসিংহের গাঙ্গিনাপাড় এলাকায় যুবলীগের নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিল প্রতিরোধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে কোতোয়ালি মডেল থানার ১ নম্বর পুলিশ ফাঁড়ির পুরো টিমকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ওই ফাঁড়ির ইনচার্জসহ টিমে মোট ২৭ জন সদস্য ছিলেন।

অর্থ যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে নজরদারি
গোয়েন্দা সূত্রের তথ্যমতে, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, গাজীপুর, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ নেতাদের যোগাযোগ তুলনামূলক বেশি। আধুনিক প্রযুক্তি ও এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ব্যবহার করে তারা নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন বলে সূত্রের দাবি।

সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য ব্যবসা-বাণিজ্যের আড়ালেও তহবিল গঠনের চেষ্টা চলছে বলে দাবি করেছে একটি গোয়েন্দা সূত্র।

এ ছাড়া রাজধানীর কয়েকটি আবাসিক এলাকাকে আত্মগোপনের জন্য নিরাপদ হিসেবে বেছে নিয়েছেন নিষিদ্ধ সংগঠনটির কিছু ক্যাডার—এমন তথ্যও গোয়েন্দাদের কাছে রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। এসব এলাকার মধ্যে ভাটারা, বনশ্রী, আফতাবনগর, মহানগর আবাসিক, খিলক্ষেত, নিকুঞ্জ, মোহাম্মদপুর, বসিলা, কামরাঙ্গীরচর, শনির আখড়া, যাত্রাবাড়ী ও উত্তরা রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে আত্মগোপনে থাকা অনেকে বিভিন্ন পেশা বেছে নিয়েছেন বলেও সূত্র জানিয়েছে। কেউ রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেল বা অটোরিকশা চালাচ্ছেন, কেউ বিউটি পার্লার বা মোটরসাইকেলের শোরুম পরিচালনা করছেন। কেউ কেউ আওয়ামী লীগপন্থি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরিও নিয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।

এ ছাড়া কয়েকজনের নিয়ন্ত্রণে থাকা অনলাইন পোর্টাল ও ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে এবং আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলেও সূত্রের দাবি।

বিদেশে থাকা নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ
সূত্রের তথ্যমতে, দেশে অবস্থানরত নেতাকর্মীরা বিদেশে থাকা যেসব নেতার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, নসরুল হামিদ বিপু, এনামুল হক শামীম, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম, নিক্সন চৌধুরী, নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন, নজরুল ইসলাম বাবু এবং পিরোজপুরের মহিউদ্দিন মহারাজসহ আরও কয়েকজন।

পুলিশের একজন অতিরিক্ত আইজি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের তিন মেয়াদে বিপুলসংখ্যক কনস্টেবল, এসআই ও এএসপি নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শীর্ষ পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হলেও মাঠপর্যায়ে এখনো আওয়ামী লীগপন্থি অনেক কর্মকর্তা রয়েছেন বলে আলোচনা আছে। তাদের কারও কারও সঙ্গে বিদেশে অবস্থানরত সাবেক সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তা ও দলীয় নেতাদের যোগাযোগ রয়েছে বলেও তিনি জানান।

বোমা বিস্ফোরক উদ্ধারে উদ্বেগ
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিত্যক্ত অবস্থায় ককটেল ও বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক ও বোমা তৈরির সরঞ্জামও জব্দ করা হয়েছে।

গোয়েন্দারা এসব ঘটনাকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো এবং গোপনে নাশকতার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সম্ভাব্য পূর্বাভাস হিসেবে দেখছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) নাঈম আশফাক চৌধুরী বলেন, দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে জাতীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ৫ আগস্টের পর নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে যে অস্থিরতা ও নাজুক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, বর্তমানে তার অনেকটাই উন্নতি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতাও আগের তুলনায় বেড়েছে।

জনগণের সহযোগিতা থাকলে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা প্রতিহত করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। একই সঙ্গে আগাম তথ্য সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

রাজনৈতিক অস্তিত্ব ধরে রাখার কৌশল
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজি) আব্দুল কাইয়ুম বলেন, ক্ষমতায় থাকাকালে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক নেতা দুর্নীতি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তাদের হাতে বিপুল অর্থ রয়েছে এবং সেই অর্থ ব্যবহার করে দেশে অরাজক পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা হতে পারে।

তবে এ ধরনের প্রচেষ্টা সফল হবে বলে তিনি মনে করেন না। তার ভাষ্য, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাগুলোর স্মৃতি এখনো মানুষের মনে তাজা। নারী, শিশু ও সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের কারণে আওয়ামী লীগের প্রতি সাধারণ মানুষের মধ্যে সহানুভূতি বা সমর্থন নেই।

তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে সার্বক্ষণিক সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে আওয়ামী লীগের ফিরে আসার ঘোষণা মূলত রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙা রাখার কৌশল।

তার মতে, ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর রাতারাতি কিংবা নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বেঁধে দিয়ে রাজনৈতিকভাবে ফিরে আসা সহজ নয়। বিগত সরকারের কর্মকাণ্ডের দায়ভার এবং সাধারণ মানুষের ক্ষোভের মুখে আওয়ামী লীগ কীভাবে জনগণের সামনে দাঁড়াবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

তিনি বলেন, যে দল বা ব্যক্তিদের কারণে দেশে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ভীতির পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, তারা খুব সহজেই সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করে রাজনৈতিক অঙ্গনে ফিরে আসতে পারবে—এমনটা ভাবার সুযোগ নেই।

এদিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং নিয়মিত তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। কোনো বিশেষ মহল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনা হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সরকার পতনের পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে তৃণমূলের অনেক কর্মী আত্মগোপনে চলে গেলেও তাদের যোগাযোগব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়নি। টেলিগ্রাম, ফেসবুকসহ বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে শেখ হাসিনার বার্তা ছড়িয়ে নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখার চেষ্টা চলছে বলে সূত্রের দাবি।

তবে ডিসেম্বরকে ঘিরে আওয়ামী লীগের এই তৎপরতা শেষ পর্যন্ত কতটা সাংগঠনিক শক্তিতে রূপ নেয় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে এর কোনো প্রভাব পড়ে কি না, সেটিই এখন নজরদারিতে রাখছে প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।

আ. লীগের ডিসেম্বর কেন্দ্রীক তৎপরতা, গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ভয়ংকর তথ্য
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উপচার
 রবিবার , ৩০ আগস্ট ২০২৬
হোমস্পেশালআ. লীগের ডিসেম্বর কেন্দ্রীক তৎপরতা, গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ভয়ংকর তথ্য

আ. লীগের ডিসেম্বর কেন্দ্রীক তৎপরতা, গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ভয়ংকর তথ্য

favicon
উপচার ডেস্ক :-
আ. লীগের ডিসেম্বর কেন্দ্রীক তৎপরতা, গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ভয়ংকর তথ্য

ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা হারিয়ে দীর্ঘ সময় নীরব থাকার পর ডিসেম্বরকে ঘিরে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। দলটির নেতাকর্মীদের পুনরায় সংগঠিত করা, বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করা এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে সাংগঠনিক উপস্থিতি জানান দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, ডিসেম্বরকে সামনে রেখে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সক্রিয় রাখার পরিকল্পনার পাশাপাশি ভারতে অবস্থানরত দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সমর্থকদের সংঘবদ্ধ করার প্রচেষ্টা চলছে। এ সুযোগকে ঘিরে বিশৃঙ্খলা ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের আশঙ্কার তথ্যও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কাছে এসেছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

এ ছাড়া বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নেতাকর্মীদের নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রয়েছে বলেও গোয়েন্দাদের দাবি। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আধুনিক প্রযুক্তি এবং বিভিন্ন এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করে সাংগঠনিক নির্দেশনা ও সমন্বয় কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

নারায়ণগঞ্জের পলাতক নেতা শামীম ওসমানও ডিসেম্বরকে সামনে রেখে নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানা গেছে। এ-সংক্রান্ত একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এসব বিষয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে সরকারের উচ্চপর্যায়ে অবহিত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল
সাংগঠনিক শক্তির জানান দিতে গত দুই সপ্তাহে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা কয়েকটি ঝটিকা মিছিল করেছেন বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

বনানী, ময়মনসিংহ, শরীয়তপুর, সাভার ও সুনামগঞ্জের ঘটনাগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এরই মধ্যে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সব ইউনিটকে সতর্ক করে মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ময়মনসিংহের গাঙ্গিনাপাড় এলাকায় যুবলীগের নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিল প্রতিরোধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে কোতোয়ালি মডেল থানার ১ নম্বর পুলিশ ফাঁড়ির পুরো টিমকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ওই ফাঁড়ির ইনচার্জসহ টিমে মোট ২৭ জন সদস্য ছিলেন।

অর্থ যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে নজরদারি
গোয়েন্দা সূত্রের তথ্যমতে, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, গাজীপুর, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ নেতাদের যোগাযোগ তুলনামূলক বেশি। আধুনিক প্রযুক্তি ও এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ব্যবহার করে তারা নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন বলে সূত্রের দাবি।

সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য ব্যবসা-বাণিজ্যের আড়ালেও তহবিল গঠনের চেষ্টা চলছে বলে দাবি করেছে একটি গোয়েন্দা সূত্র।

এ ছাড়া রাজধানীর কয়েকটি আবাসিক এলাকাকে আত্মগোপনের জন্য নিরাপদ হিসেবে বেছে নিয়েছেন নিষিদ্ধ সংগঠনটির কিছু ক্যাডার—এমন তথ্যও গোয়েন্দাদের কাছে রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। এসব এলাকার মধ্যে ভাটারা, বনশ্রী, আফতাবনগর, মহানগর আবাসিক, খিলক্ষেত, নিকুঞ্জ, মোহাম্মদপুর, বসিলা, কামরাঙ্গীরচর, শনির আখড়া, যাত্রাবাড়ী ও উত্তরা রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে আত্মগোপনে থাকা অনেকে বিভিন্ন পেশা বেছে নিয়েছেন বলেও সূত্র জানিয়েছে। কেউ রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেল বা অটোরিকশা চালাচ্ছেন, কেউ বিউটি পার্লার বা মোটরসাইকেলের শোরুম পরিচালনা করছেন। কেউ কেউ আওয়ামী লীগপন্থি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরিও নিয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।

এ ছাড়া কয়েকজনের নিয়ন্ত্রণে থাকা অনলাইন পোর্টাল ও ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে এবং আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলেও সূত্রের দাবি।

বিদেশে থাকা নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ
সূত্রের তথ্যমতে, দেশে অবস্থানরত নেতাকর্মীরা বিদেশে থাকা যেসব নেতার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, নসরুল হামিদ বিপু, এনামুল হক শামীম, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম, নিক্সন চৌধুরী, নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন, নজরুল ইসলাম বাবু এবং পিরোজপুরের মহিউদ্দিন মহারাজসহ আরও কয়েকজন।

পুলিশের একজন অতিরিক্ত আইজি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের তিন মেয়াদে বিপুলসংখ্যক কনস্টেবল, এসআই ও এএসপি নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শীর্ষ পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হলেও মাঠপর্যায়ে এখনো আওয়ামী লীগপন্থি অনেক কর্মকর্তা রয়েছেন বলে আলোচনা আছে। তাদের কারও কারও সঙ্গে বিদেশে অবস্থানরত সাবেক সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তা ও দলীয় নেতাদের যোগাযোগ রয়েছে বলেও তিনি জানান।

বোমা বিস্ফোরক উদ্ধারে উদ্বেগ
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিত্যক্ত অবস্থায় ককটেল ও বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক ও বোমা তৈরির সরঞ্জামও জব্দ করা হয়েছে।

গোয়েন্দারা এসব ঘটনাকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো এবং গোপনে নাশকতার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সম্ভাব্য পূর্বাভাস হিসেবে দেখছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) নাঈম আশফাক চৌধুরী বলেন, দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে জাতীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ৫ আগস্টের পর নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে যে অস্থিরতা ও নাজুক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, বর্তমানে তার অনেকটাই উন্নতি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতাও আগের তুলনায় বেড়েছে।

জনগণের সহযোগিতা থাকলে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা প্রতিহত করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। একই সঙ্গে আগাম তথ্য সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

রাজনৈতিক অস্তিত্ব ধরে রাখার কৌশল
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজি) আব্দুল কাইয়ুম বলেন, ক্ষমতায় থাকাকালে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক নেতা দুর্নীতি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তাদের হাতে বিপুল অর্থ রয়েছে এবং সেই অর্থ ব্যবহার করে দেশে অরাজক পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা হতে পারে।

তবে এ ধরনের প্রচেষ্টা সফল হবে বলে তিনি মনে করেন না। তার ভাষ্য, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাগুলোর স্মৃতি এখনো মানুষের মনে তাজা। নারী, শিশু ও সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের কারণে আওয়ামী লীগের প্রতি সাধারণ মানুষের মধ্যে সহানুভূতি বা সমর্থন নেই।

তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে সার্বক্ষণিক সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে আওয়ামী লীগের ফিরে আসার ঘোষণা মূলত রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙা রাখার কৌশল।

তার মতে, ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর রাতারাতি কিংবা নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বেঁধে দিয়ে রাজনৈতিকভাবে ফিরে আসা সহজ নয়। বিগত সরকারের কর্মকাণ্ডের দায়ভার এবং সাধারণ মানুষের ক্ষোভের মুখে আওয়ামী লীগ কীভাবে জনগণের সামনে দাঁড়াবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

তিনি বলেন, যে দল বা ব্যক্তিদের কারণে দেশে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ভীতির পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, তারা খুব সহজেই সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করে রাজনৈতিক অঙ্গনে ফিরে আসতে পারবে—এমনটা ভাবার সুযোগ নেই।

এদিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং নিয়মিত তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। কোনো বিশেষ মহল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনা হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সরকার পতনের পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে তৃণমূলের অনেক কর্মী আত্মগোপনে চলে গেলেও তাদের যোগাযোগব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়নি। টেলিগ্রাম, ফেসবুকসহ বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে শেখ হাসিনার বার্তা ছড়িয়ে নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখার চেষ্টা চলছে বলে সূত্রের দাবি।

তবে ডিসেম্বরকে ঘিরে আওয়ামী লীগের এই তৎপরতা শেষ পর্যন্ত কতটা সাংগঠনিক শক্তিতে রূপ নেয় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে এর কোনো প্রভাব পড়ে কি না, সেটিই এখন নজরদারিতে রাখছে প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।

আ. লীগের ডিসেম্বর কেন্দ্রীক তৎপরতা, গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ভয়ংকর তথ্য
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
২৯ আগস্ট ২০২৬