শুক্রবার , ২১ আগস্ট ২০২৬
হোমআজকের শীর্ষ সংবাদ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় সবাই খালাস

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় সবাই খালাস

প্রকৃত অপরাধীদের বিচার কী হবে?
favicon
মো: নুরে ইসলাম মিলন:
২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় সবাই খালাস

দুই দশকেরও বেশি সময় আগে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার বিচারিক ইতিহাস নতুন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে। নিম্ন আদালতে দণ্ডিত সব আসামি উচ্চ আদালতে খালাস পাওয়ার পর সেই সিদ্ধান্ত আপিল বিভাগেও বহাল রয়েছে। ফলে মামলার দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হলেও হামলার প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আনা হবে কি না, সেই প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তৎকালীন প্রধান বিরোধীদল আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। সমাবেশের মঞ্চে ছিলেন দলটির সভাপতি ও তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা। হামলায় আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আইভী রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন এবং শতাধিক নেতাকর্মী আহত হন। শেখ হাসিনা অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান।

এই ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা হয়। দীর্ঘ তদন্ত, পুনঃতদন্ত ও বিচার শেষে ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ রায় ঘোষণা করেন। ওই রায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। বিএনপির তৎকালীন জ্যেষ্ঠ নেতা তারেক রহমানসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং আরও কয়েকজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

হাইকোর্টে বদলে যায় মামলার গতিপথ:-

বিচারিক আদালতের রায়ের পর মামলাটি ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিল হিসেবে হাইকোর্টে আসে। ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর হাইকোর্ট বিচারিক আদালতের রায় বাতিল করে দণ্ডিতদের খালাস দেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে সম্পূরক অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে পরিচালিত বিচারপ্রক্রিয়ার আইনগত বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।

এরপর রাষ্ট্রপক্ষ হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। সেই আপিলের শুনানি শেষে আপিল বিভাগও হাইকোর্টের খালাসের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে  ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ‘২১st August Grenade Attack’ মামলার আপিল বিভাগের আদেশ আপলোড হওয়ার তথ্য রয়েছে।

ফলে ২১ আগস্ট হামলা মামলায় বিচারিক আদালতে দণ্ড পাওয়া আসামিদের বিরুদ্ধে ওই মামলার বিদ্যমান সাজা আর বহাল থাকছে না। তবে এখানেই শেষ নয়; কারণ আদালতের রায়ে আসামিদের খালাস পাওয়া এবং ২০০৪ সালের হামলার প্রকৃত অপরাধীদের দায় নির্ধারণ-দুটি বিষয়কে একই অর্থে দেখার সুযোগ নেই।

তদন্ত ও দ্বিতীয় অভিযোগপত্র নিয়ে বিতর্ক:-

মামলার তদন্ত নিয়ে শুরু থেকেই নানা বিতর্ক ছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সিআইডি তদন্ত করে ২০০৮ সালে প্রথম অভিযোগপত্র দাখিল করে। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর মামলাটি অধিকতর তদন্তে যায় এবং দ্বিতীয় দফার তদন্ত শেষে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। সেই অভিযোগপত্রে তারেক রহমান, লুৎফুজ্জামান বাবর, আবদুস সালাম পিন্টুসহ বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতাকে আসামি করা হয়।

আসামিপক্ষের আইনজীবীরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন, দ্বিতীয় দফার তদন্ত রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ছিল এবং ওই তদন্তের মাধ্যমে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের মামলায় যুক্ত করা হয়। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ায় সেই অভিযোগগুলো আইনগতভাবে প্রমাণিত হয়নি।

তবে এসব অভিযোগ মূলত আসামিপক্ষের আইনজীবীদের বক্তব্য। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তদন্তের অভিযোগ এবং প্রকৃত অপরাধীদের বিষয়ে নতুন তদন্তের প্রয়োজনীয়তা-দুটিই আলাদা প্রশ্ন। কোনো পক্ষের বক্তব্যকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা না করে আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায়, মামলার নথি এবং ভবিষ্যৎ আইনগত পদক্ষেপের আলোকে বিষয়টি মূল্যায়ন করাই গুরুত্বপূর্ণ।

বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে আইনজীবীদের প্রশ্ন:-

আসামিপক্ষের আইনজীবীদের একজন মোহাম্মদ আলী মামলার বিচারপ্রক্রিয়া ও তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর দাবি, দ্বিতীয় দফার তদন্ত এবং সম্পূরক অভিযোগপত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রভাবিত হয়েছিল। তাঁর মতে, আদালতে সেই অভিযোগ শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত না হওয়ায় আসামিরা খালাস পেয়েছেন।

আরেক আইনজীবী এস এম শাহজাহানও তদন্তের ত্রুটিকে খালাসের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথম অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে বিচারপ্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণের পর তদন্তের গতিপথ পরিবর্তিত হয়। তদন্ত ও বিচারকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

আইনজীবীদের এসব বক্তব্যের বিপরীতে রাষ্ট্রপক্ষের অবস্থান এবং আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ে বিষয়গুলোর বিস্তারিত আইনি ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ আদালতের সংক্ষিপ্ত আদেশের পাশাপাশি পূর্ণাঙ্গ রায়ে বিচার বাতিল ও খালাসের আইনি ভিত্তি, অভিযোগপত্রের বৈধতা এবং পরবর্তী আইনগত সুযোগ সম্পর্কে বিস্তারিত নির্দেশনা থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

২৪ প্রাণহানির ঘটনার বিচার কোথায়:-

২১ আগস্টের হামলায় ২৪ জনের প্রাণহানি এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের আহত হওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অধ্যায়। এ হামলার ঘটনায় বিচারিক আদালতে দীর্ঘ বিচার শেষে যে সাজা হয়েছিল, তা উচ্চ আদালতে বাতিল হয়েছে। ফলে এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে-যদি পূর্ববর্তী বিচারপ্রক্রিয়া আইনগতভাবে টেকসই না হয়ে থাকে, তাহলে হামলার প্রকৃত পরিকল্পনাকারী, নির্দেশদাতা ও হামলাকারীদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার সুযোগ রয়েছে কি না।

আইনগতভাবে কোনো আসামি খালাস পাওয়া মানেই ওই ঘটনায় কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়নি-এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। বরং আদালত নির্দিষ্ট মামলার অভিযোগ, প্রমাণ, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার আইনগত বৈধতা বিবেচনা করে রায় দেন। তাই ২১ আগস্টের ঘটনায় প্রকৃত অপরাধীদের দায় নির্ধারণের প্রশ্নটি আলাদা তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার বিষয় হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে মামলাটির ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এর আদেশ প্রকাশের তথ্য রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা স্পষ্ট হলে ভবিষ্যতে নতুন কোনো তদন্ত বা আইনগত পদক্ষেপের সুযোগ সম্পর্কে ধারণা আরও পরিষ্কার হবে।

ন্যায়বিচারের প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ:-

২১ আগস্টের মামলার দীর্ঘ বিচারিক যাত্রা শেষ হলেও নিহতদের পরিবার, আহত ব্যক্তিদের এবং বৃহত্তর সমাজের কাছে ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি এখনো গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে যদি কোনো ব্যক্তি যথাযথ প্রমাণ ছাড়া রাজনৈতিক বা অন্য কোনো কারণে মামলায় যুক্ত হয়ে থাকেন, তবে তাঁর ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে প্রকৃত অপরাধীরা যদি এখনো বিচারের বাইরে থেকে থাকেন, তাঁদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দায়িত্বও রাষ্ট্রের।

এ কারণে ভবিষ্যৎ পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি নিরপেক্ষ, পেশাদার ও প্রমাণনির্ভর তদন্ত। তদন্তে কোনো রাজনৈতিক দল, সরকার বা প্রশাসনিক শক্তির প্রভাব না থাকা এবং প্রত্যক্ষ ও পারিপার্শ্বিক সব প্রমাণ পুনর্মূল্যায়ন করা হলে ২১ আগস্টের ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলা এই মামলার বিচারিক পর্ব শেষ হলেও ২১ আগস্টের ঘটনার পূর্ণ সত্য উদঘাটনের প্রশ্নটি এখনো জনপরিসরে গুরুত্বপূর্ণ। আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ এবং আইনগতভাবে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে এই বহুল আলোচিত হামলার প্রকৃত দায়ীদের বিচারের সম্ভাবনা।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় সবাই খালাস
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
২১ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উপচার
 শুক্রবার , ২১ আগস্ট ২০২৬
হোমআজকের শীর্ষ সংবাদ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় সবাই খালাস

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় সবাই খালাস

প্রকৃত অপরাধীদের বিচার কী হবে?
favicon
মো: নুরে ইসলাম মিলন:
২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় সবাই খালাস

দুই দশকেরও বেশি সময় আগে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার বিচারিক ইতিহাস নতুন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে। নিম্ন আদালতে দণ্ডিত সব আসামি উচ্চ আদালতে খালাস পাওয়ার পর সেই সিদ্ধান্ত আপিল বিভাগেও বহাল রয়েছে। ফলে মামলার দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হলেও হামলার প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আনা হবে কি না, সেই প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তৎকালীন প্রধান বিরোধীদল আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। সমাবেশের মঞ্চে ছিলেন দলটির সভাপতি ও তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা। হামলায় আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আইভী রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন এবং শতাধিক নেতাকর্মী আহত হন। শেখ হাসিনা অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান।

এই ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা হয়। দীর্ঘ তদন্ত, পুনঃতদন্ত ও বিচার শেষে ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ রায় ঘোষণা করেন। ওই রায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। বিএনপির তৎকালীন জ্যেষ্ঠ নেতা তারেক রহমানসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং আরও কয়েকজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

হাইকোর্টে বদলে যায় মামলার গতিপথ:-

বিচারিক আদালতের রায়ের পর মামলাটি ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিল হিসেবে হাইকোর্টে আসে। ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর হাইকোর্ট বিচারিক আদালতের রায় বাতিল করে দণ্ডিতদের খালাস দেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে সম্পূরক অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে পরিচালিত বিচারপ্রক্রিয়ার আইনগত বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।

এরপর রাষ্ট্রপক্ষ হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। সেই আপিলের শুনানি শেষে আপিল বিভাগও হাইকোর্টের খালাসের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে  ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ‘২১st August Grenade Attack’ মামলার আপিল বিভাগের আদেশ আপলোড হওয়ার তথ্য রয়েছে।

ফলে ২১ আগস্ট হামলা মামলায় বিচারিক আদালতে দণ্ড পাওয়া আসামিদের বিরুদ্ধে ওই মামলার বিদ্যমান সাজা আর বহাল থাকছে না। তবে এখানেই শেষ নয়; কারণ আদালতের রায়ে আসামিদের খালাস পাওয়া এবং ২০০৪ সালের হামলার প্রকৃত অপরাধীদের দায় নির্ধারণ-দুটি বিষয়কে একই অর্থে দেখার সুযোগ নেই।

তদন্ত ও দ্বিতীয় অভিযোগপত্র নিয়ে বিতর্ক:-

মামলার তদন্ত নিয়ে শুরু থেকেই নানা বিতর্ক ছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সিআইডি তদন্ত করে ২০০৮ সালে প্রথম অভিযোগপত্র দাখিল করে। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর মামলাটি অধিকতর তদন্তে যায় এবং দ্বিতীয় দফার তদন্ত শেষে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। সেই অভিযোগপত্রে তারেক রহমান, লুৎফুজ্জামান বাবর, আবদুস সালাম পিন্টুসহ বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতাকে আসামি করা হয়।

আসামিপক্ষের আইনজীবীরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন, দ্বিতীয় দফার তদন্ত রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ছিল এবং ওই তদন্তের মাধ্যমে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের মামলায় যুক্ত করা হয়। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ায় সেই অভিযোগগুলো আইনগতভাবে প্রমাণিত হয়নি।

তবে এসব অভিযোগ মূলত আসামিপক্ষের আইনজীবীদের বক্তব্য। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তদন্তের অভিযোগ এবং প্রকৃত অপরাধীদের বিষয়ে নতুন তদন্তের প্রয়োজনীয়তা-দুটিই আলাদা প্রশ্ন। কোনো পক্ষের বক্তব্যকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা না করে আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায়, মামলার নথি এবং ভবিষ্যৎ আইনগত পদক্ষেপের আলোকে বিষয়টি মূল্যায়ন করাই গুরুত্বপূর্ণ।

বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে আইনজীবীদের প্রশ্ন:-

আসামিপক্ষের আইনজীবীদের একজন মোহাম্মদ আলী মামলার বিচারপ্রক্রিয়া ও তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর দাবি, দ্বিতীয় দফার তদন্ত এবং সম্পূরক অভিযোগপত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রভাবিত হয়েছিল। তাঁর মতে, আদালতে সেই অভিযোগ শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত না হওয়ায় আসামিরা খালাস পেয়েছেন।

আরেক আইনজীবী এস এম শাহজাহানও তদন্তের ত্রুটিকে খালাসের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথম অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে বিচারপ্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণের পর তদন্তের গতিপথ পরিবর্তিত হয়। তদন্ত ও বিচারকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

আইনজীবীদের এসব বক্তব্যের বিপরীতে রাষ্ট্রপক্ষের অবস্থান এবং আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ে বিষয়গুলোর বিস্তারিত আইনি ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ আদালতের সংক্ষিপ্ত আদেশের পাশাপাশি পূর্ণাঙ্গ রায়ে বিচার বাতিল ও খালাসের আইনি ভিত্তি, অভিযোগপত্রের বৈধতা এবং পরবর্তী আইনগত সুযোগ সম্পর্কে বিস্তারিত নির্দেশনা থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

২৪ প্রাণহানির ঘটনার বিচার কোথায়:-

২১ আগস্টের হামলায় ২৪ জনের প্রাণহানি এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের আহত হওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অধ্যায়। এ হামলার ঘটনায় বিচারিক আদালতে দীর্ঘ বিচার শেষে যে সাজা হয়েছিল, তা উচ্চ আদালতে বাতিল হয়েছে। ফলে এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে-যদি পূর্ববর্তী বিচারপ্রক্রিয়া আইনগতভাবে টেকসই না হয়ে থাকে, তাহলে হামলার প্রকৃত পরিকল্পনাকারী, নির্দেশদাতা ও হামলাকারীদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার সুযোগ রয়েছে কি না।

আইনগতভাবে কোনো আসামি খালাস পাওয়া মানেই ওই ঘটনায় কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়নি-এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। বরং আদালত নির্দিষ্ট মামলার অভিযোগ, প্রমাণ, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার আইনগত বৈধতা বিবেচনা করে রায় দেন। তাই ২১ আগস্টের ঘটনায় প্রকৃত অপরাধীদের দায় নির্ধারণের প্রশ্নটি আলাদা তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার বিষয় হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে মামলাটির ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এর আদেশ প্রকাশের তথ্য রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা স্পষ্ট হলে ভবিষ্যতে নতুন কোনো তদন্ত বা আইনগত পদক্ষেপের সুযোগ সম্পর্কে ধারণা আরও পরিষ্কার হবে।

ন্যায়বিচারের প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ:-

২১ আগস্টের মামলার দীর্ঘ বিচারিক যাত্রা শেষ হলেও নিহতদের পরিবার, আহত ব্যক্তিদের এবং বৃহত্তর সমাজের কাছে ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি এখনো গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে যদি কোনো ব্যক্তি যথাযথ প্রমাণ ছাড়া রাজনৈতিক বা অন্য কোনো কারণে মামলায় যুক্ত হয়ে থাকেন, তবে তাঁর ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে প্রকৃত অপরাধীরা যদি এখনো বিচারের বাইরে থেকে থাকেন, তাঁদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দায়িত্বও রাষ্ট্রের।

এ কারণে ভবিষ্যৎ পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি নিরপেক্ষ, পেশাদার ও প্রমাণনির্ভর তদন্ত। তদন্তে কোনো রাজনৈতিক দল, সরকার বা প্রশাসনিক শক্তির প্রভাব না থাকা এবং প্রত্যক্ষ ও পারিপার্শ্বিক সব প্রমাণ পুনর্মূল্যায়ন করা হলে ২১ আগস্টের ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলা এই মামলার বিচারিক পর্ব শেষ হলেও ২১ আগস্টের ঘটনার পূর্ণ সত্য উদঘাটনের প্রশ্নটি এখনো জনপরিসরে গুরুত্বপূর্ণ। আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ এবং আইনগতভাবে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে এই বহুল আলোচিত হামলার প্রকৃত দায়ীদের বিচারের সম্ভাবনা।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় সবাই খালাস
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
২১ আগস্ট ২০২৬