২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বর্ণাঢ্য অভিযাত্রা
দীর্ঘ সাড়ে তিন দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৫৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ও সাবেক মন্ত্রী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। মোট ১৬৭ ভোটের ব্যবধানে তিনি দেশের শীর্ষ সাংবিধানিক পদে অভিষিক্ত হতে যাচ্ছেন। ১৯৯১ সালের পর এই প্রথম একাধিক প্রার্থীর অংশগ্রহণে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো।
নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের গুরুদায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ থেকে দলটির পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। এর আগে ২০১১ সালের ২০ মার্চ থেকে টানা পাঁচ বছর তিনি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব সামলান। এর পূর্বে ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত দলের পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তিনি সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে মনোনীত হন। সংসদীয় রাজনীতিতে তিনি ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তৎকালীন সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয় এবং পরবর্তীতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দক্ষতার সাথে পালন করেন। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি একই আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ ঘটে ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায়। অর্থনীতি বিভাগে অধ্যয়নকালে তিনি তৎকালীন প্রভাবশালী ছাত্রসংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে (ইপিএসইউ) যোগ দেন। সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে তিনি দ্রুতই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হল ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ধাপে ধাপে সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বে উঠে এসে ১৯৬৯ সালে আইয়ুব খানবিরোধী ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় রাজনৈতিক আন্দোলনের অগ্রভাগে থাকার কারণে তাঁকে কারাবরণও করতে হয়।
শিক্ষাজীবন শেষে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের শিক্ষা ক্যাডারে প্রভাষক হিসেবে ঢাকা কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন। পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন সরকারি কলেজে অধ্যাপনার পাশাপাশি সরকারি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বাংলাদেশ সরকারের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক এবং ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনে অত্যন্ত সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৭৯ সালের শেষভাগে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৮২ সালে এস এ বারীর পদত্যাগ পর্যন্ত তিনি ওই পদে কর্মরত ছিলেন।
পরবর্তীতে ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইস্তফা দিয়ে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে পদার্পণ করেন। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে জনপ্রতিনিধি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে দেশব্যাপী স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনের পটভূমিতে তিনি বিএনপিতে যোগদান করেন এবং ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি মনোনীত হন।
ব্যক্তিগত জীবনে ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ের এক সম্ভ্রান্ত ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মির্জা ফখরুল। তাঁর পিতা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন একজন প্রথিতযশা আইনজীবী, প্রবীণ রাজনীতিবিদ, একাধিকবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও সাবেক কৃষিমন্ত্রী। তাঁর চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন প্রখ্যাত আইনজ্ঞ ও রাজনীতিবিদ; যিনি দ্বিতীয় জাতীয় সংসদের স্পিকার, ভূমিমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর আরেক চাচা উইং কমান্ডার এস আর মির্জা ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত মুজিবনগর সরকারের যুব শিবির অধিদপ্তরের প্রধান হিসেবে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ শিবির তদারকির ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
পারিবারিক জীবনে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক রাহাত আরা বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ। তাঁদের দুই কন্যা সন্তানের মধ্যে বড় মেয়ে মির্জা শামারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক এবং বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো হিসেবে কর্মরত। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে রাজধানীর একটি স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন। এছাড়া নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির ছোট ভাই মির্জা ফয়সল আমীন ঠাকুরগাঁও পৌরসভার সাবেক মেয়র ও বর্তমানে জেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।