তেহরানকে সহায়তাকারী দেশগুলোর বিরুদ্ধে ‘ভয়াবহ পরিণতি’র কড়া হুশিয়ারি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অভিযান পরিচালনার ঘোষণা দিয়েছেন। ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক কিংবা বাণিজ্যিক সুসম্পর্ক বজায় রেখে তেহরানকে যেকোনো ধরনের সহায়তা প্রদান করলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বিরুদ্ধে মারাত্মক ও ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হবে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তিনি।
বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়। এর আগে ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া একটি পোস্টে জানান যে, কোনো দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক কোম্পানি, বিমানবন্দর কিংবা সরকারি সংস্থা যদি তেহরানকে কোনো রকম সহায়তা করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি এটিকে আজ পর্যন্ত কোনো দেশের বিরুদ্ধে ঘোষিত সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক অভিযান হিসেবে উল্লেখ করে বলেন যে, এই পদক্ষেপটি বৈশ্বিক অঙ্গনে নজিরবিহীন মাত্রার অর্থনৈতিক যুদ্ধ এবং বিচ্ছিন্নতা তৈরি করবে।
তবে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা কিংবা অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়া দেশগুলোর বিরুদ্ধে মার্কিন প্রশাসন ঠিক কী ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করেননি। এমনকি তার ওই পোস্টে নির্দিষ্ট কোনো দেশের নামও উল্লেখ করা হয়নি। ট্রাম্প তার বক্তব্যে ইরানকে সহায়তার সাথে জড়িত বিভিন্ন খাত যেমন—তেল পাচার, অর্থ বিনিময় ব্যবস্থা, নগদ অর্থ স্থানান্তর, এক্সচেঞ্জ হাউস, জাহাজ নিবন্ধন এবং বিভিন্ন আড়াল করা বা ভুয়া কোম্পানির কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ করার কঠোর আহ্বান জানান। তিনি একে একটি অর্থনৈতিক ডি-ডে হিসেবে অভিহিত করে বলেন যে, ইরানের সম্ভাব্য হুমকিকে প্রতিহত ও পরাজিত করতে বিশ্বের সকল মিত্র দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে হবে।
বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প দাবি করেন যে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা ইতোমধ্যে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার ভাষ্যমতে, দেশটির নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী অনেকটাই ধ্বংস হয়ে গেছে, সামরিক উৎপাদন কারখানাগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং তাদের জাতীয় মুদ্রার মান তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় ইরান কোনো অবস্থাতেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সুযোগ পাবে না। ট্রাম্পের এই সাম্প্রতিক ঘোষণা এমন এক সময়ে এল যখন তেহরানের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের দীর্ঘ চলমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতি প্রায় ছয় মাসে গড়িয়েছে এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে।
এর আগে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও ইরানকে বৈশ্বিক অর্থনীতি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টা আরও বেগবান করার কথা জানিয়েছিলেন। তিনি স্পষ্ট করেছিলেন যে, ওয়াশিংটন এমন এক সর্বাত্মক অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করতে চায় যার কোনো ঐতিহাসিক নজির নেই। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় বর্তমানে 'অপারেশন ইকোনমিক ফিউরি' নামক একটি বিশেষ নিষেধাজ্ঞা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে, যার মূল লক্ষ্য বহুমুখী নিষেধাজ্ঞা ও কঠোর আর্থিক পদক্ষেপের মাধ্যমে ইরানের আয়ের সমস্ত উৎস চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, বেশ কয়েকটি দেশ নানাভাবে ইরানের সঙ্গে তাদের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। বিশ্বমঞ্চের বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়া ইরানকে সামরিক সরঞ্জাম ও ড্রোন প্রযুক্তির মতো সংবেদনশীল সহায়তা প্রদান করেছে। অন্যদিকে চীন তেহরানের কাছ থেকে নিয়মিত তেল কেনা অব্যাহত রেখেছে এবং কূটনৈতিক অংশীদারত্ব বজায় রেখেছে। পাশাপাশি পাকিস্তান কূটনৈতিক উপায়ে ইরানকে সমর্থন জুগিয়ে এই অঞ্চলের সংকট নিরসনে আলোচনা চালিয়ে গেলেও তাদের পক্ষ থেকে কোনো সামরিক সহায়তার তথ্য পাওয়া যায়নি। এছাড়া ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠী এবং বিভিন্ন ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়া বাহিনীও তেহরানের পক্ষ থেকে ভূরাজনৈতিক সমর্থন পেয়ে থাকে।
এদিকে হরমুজ প্রণালির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেছেন যে, প্রণালিটি বর্তমানে উন্মুক্ত রয়েছে এবং এর ভেতর দিয়ে বহু বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদেই চলাচল করছে। তবে তিনি এও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তেহরানের আচরণের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটলে ভবিষ্যতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পথ উন্মুক্ত হতে পারে। তবে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত রয়েছে। ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, ইরানকে কোনো অবস্থাতেই পারমাণবিক অস্ত্র সংরক্ষণের অনুমতি দেওয়া হবে না, কারণ তারা এর বিপজ্জনক ব্যবহার করতে পারে।
অন্যদিকে তেহরানও তাদের নিজেদের দাবিতে অনড় রয়েছে। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ জানিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যতদিন না একতরফা অবরোধ প্রত্যাহার করছে, ইরানের জব্দকৃত বৈদেশিক সম্পদ অবমুক্ত করছে এবং তেল বিক্রির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করছে, ততদিন পর্যন্ত তেহরান হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণরূপে উন্মুক্ত করবে না।