মার্কো রুবিওর ভারত সফর ঘিরে তুঙ্গে রাজনৈতিক বিতর্ক
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর আসন্ন ভারত সফর ঘিরে দেশটির কূটনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। রাজধানী নয়াদিল্লিতে কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি না রেখে ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাইয়ে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক এবং গুজরাটের জামনগরে বেসরকারি তেল শোধনাগার পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত ঘিরেই এই অসন্তোষ দানা বেঁধেছে। ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরের এক মন্তব্যের পর পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নেয়, যেখানে তিনি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেন যে রুবিওর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের মুম্বাইয়ে উপস্থিত থাকার প্রত্যাশা করছে ওয়াশিংটন।
মার্কিন রাষ্ট্রদূতের এমন মন্তব্যকে ভারতের সার্বভৌত্ব ও কূটনৈতিক মর্যাদার চরম অবমাননা হিসেবে আখ্যায়িত করে মোদী সরকারকে তীব্র আক্রমণ করেছে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস। লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী তীব্র কটাক্ষ করে মন্তব্য করেন, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী যেন ভারতের শীর্ষ কূটনীতিককে নিজের অধীনস্থ কোনো কর্মীর মতো তলব করেছেন। কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ এই পুরো প্রক্রিয়াকে চরম অস্বাভাবিক বলে অভিহিত করেছেন। দলটির জ্যেষ্ঠ মুখপাত্র পবন খেরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ভারতের নিজ মাটিতেই একটি বিদেশি পরাশক্তির আহ্বানে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে রাজধানী ছেড়ে গিয়ে হাজিরা দিতে বাধ্য করার মাধ্যমে বর্তমান সরকার এক নজিরবিহীন ও অমর্যাদাকর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উজবেকিস্তানের সমরকন্দে মধ্য এশিয়ার পাঁচটি দেশের জোট ‘সি৫+১’ শীর্ষ সম্মেলন সম্পন্ন করে রোববার (১৮ অক্টোবর) ভারতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালের তথ্য অনুযায়ী, এই সফরে বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং গুরুত্বপূর্ণ ও উদীয়মান প্রযুক্তি নিয়ে বিশদ আলোচনার কথা রয়েছে। তবে গত মে মাসে কোয়াড পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে নয়াদিল্লি সফর করলেও এবার কেন তিনি রাজধানীতে যাচ্ছেন না, সে বিষয়ে ভারত কিংবা যুক্তরাষ্ট্র কোনো পক্ষই স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।
কূটনীতিকদের বড় একটি অংশের ধারণা, রুবিওর এবারের সফরের মূল কেন্দ্রবিন্দু জ্বালানি রাজনীতি। নয়াদিল্লির রাষ্ট্রীয় প্রটোকল এড়িয়ে গুজরাটের জামনগরে শীর্ষ ধনী মুকেশ আম্বানির রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ পরিচালিত বিশ্বের বৃহত্তম একক তেল শোধনাগার পরিদর্শনে যাচ্ছেন তিনি। সেখানে আম্বানি পরিবারের এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেও তার অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। রাশিয়া থেকে ভারতের বিপুল পরিমাণ তেল আমদানি নিয়ে ওয়াশিংটনের অসন্তোষ দীর্ঘদিনের। সেই চাপ প্রশমনে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি ক্রয়ে উৎসাহিত করছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে কেন্দ্র করে দেশটির তেল খাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব সুসংহত হওয়ার পর আম্বানির রিলায়েন্স ভেনেজুয়েলান তেলের অন্যতম প্রধান ক্রেতায় পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া টেক্সাসে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য নতুন শোধনাগার প্রকল্পে রিলায়েন্সের অংশীদারিত্ব মার্কিন নীতি-নির্ধারকদের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
এই সফরের নেপথ্যে বাণিজ্য ও শুল্ক সংক্রান্ত দীর্ঘস্থায়ী টানাপোড়েনও বিশেষ প্রভাব ফেলছে। বাণিজ্য আলোচনার অচলাবস্থার জেরে ট্রাম্প প্রশাসন ভারতীয় পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের পর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে কাঠামোগত বোঝাপড়ায় তা ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনা হলেও চূড়ান্ত চুক্তি এখনও থমকে আছে। ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন আলোচনা স্থবির হওয়ার কথা জানিয়েছেন, অন্যদিকে বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গয়াল পরিষ্কার করে বলেছেন, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর চেয়ে বাড়তি সুবিধা না পেলে ভারত চুক্তিতে স্বাক্ষর করবে না। পাশাপাশি রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য পরিচালনাকারী দেশগুলোর ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর শুল্ক আরোপের হুমকি এবং মার্কিন নির্বাচনে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে শেষ মুহূর্তে শুল্ক মওকুফের নির্বাহী আদেশ দুই দেশের টানাপোড়েনকে আরও দৃশ্যমান করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম বিভাগের সাম্প্রতিক এক পদক্ষেপ, যার আওতায় ইনফোসিস, টিসিএস ও উইপ্রোর মতো শীর্ষ ভারতীয় আইটি প্রতিষ্ঠানের গ্রিনকার্ড সংক্রান্ত সনদ কার্যক্রম সাময়িক স্থগিত করায় তৈরি হয়েছে নতুন অস্বস্তি। সার্বিকভাবে এই পুঞ্জীভূত সংকট ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই শুরু হচ্ছে মার্কো রুবিওর বহুচর্চিত ভারত সফর।