রোগমুক্তির আশ্রয়স্থলে রোগ ছড়ানোর শঙ্কা
উত্তরবঙ্গের কোটি মানুষের চিকিৎসাসেবার প্রধান ভরসাস্থল রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (রামেক)। জটিল ও সংকটাপন্ন রোগের আধুনিক চিকিৎসার আশায় প্রতিদিন শুধু রাজশাহী নয়, আশপাশের প্রায় আটটি জেলা থেকে হাজারো রোগী এখানে ছুটে আসেন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, সেবাগ্রহীতাদের সেই নির্ভরতার প্রতীক রামেক হাসপাতাল এখন নিজেই যেন এক গভীর ব্যাধিতে আক্রান্ত। নিয়মিত পরিচ্ছন্নতার তীব্র সংকট, চিকিৎসা বর্জ্যের অব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনীয় জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জামের ঘাটতিতে হাসপাতাল প্রাঙ্গণ রোগমুক্তির আশ্বাসের চেয়ে নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকির বড় উৎসে পরিণত হয়েছে।
হাসপাতালটির সার্বিক পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করলে যে চিত্রটি সবচেয়ে প্রকট হয়ে ওঠে, তা হলো সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি ও পরিচ্ছন্নতার চরম ঘাটতি। নির্ধারিত শয্যার তুলনায় রোগীর চাপ দ্বিগুণেরও বেশি হওয়ায় বারান্দা, সিঁড়িঘর এমনকি টয়লেটের প্রবেশমুখ পর্যন্ত গাদাগাদি করে রোগীরা শয্যা পাততে বাধ্য হন। এই উপচে পড়া ভিড়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপর্যাপ্ত ও অনিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম।
নির্দিষ্ট কিছু ওয়ার্ডের পরিস্থিতি রীতিমতো উদ্বেগের সৃষ্টি করে। হাসপাতালের শিশু ও নবজাতক ওয়ার্ডে যেখানে সংক্রমণমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা সবচেয়ে জরুরি, সেখানেও অপর্যাপ্ত আলো-বাতাস, স্যাঁতসেঁতে মেঝের তীব্র গন্ধ এবং উন্মুক্ত ডাস্টবিন শিশুদের জন্য নিউমোনিয়া কিংবা সেপসিসের মতো মারাত্মক সেকেন্ডারি ইনফেকশনের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। একইভাবে অর্থোপেডিক ও সার্জারি ওয়ার্ডগুলোতে অপারেশনের পরবর্তী ক্ষতের ড্রেসিং এবং শয্যার পরিচ্ছন্নতায় যে জীবাণুমুক্ত পরিবেশ প্রয়োজন, তার বড়ই অভাব। ফলে অপারেশনের ক্ষত দ্রুত শুকানোর বদলে হাসপাতালে অবস্থানকালীন জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে। জরুরি বিভাগেও রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে রক্তমাখা তুলা, ব্যবহৃত সিরিঞ্জ ও গজ সময়মতো অপসারণ না করায় সেখানে পৌঁছানো মাত্রই রোগী ও স্বজনদের সংক্রামক ব্যাধির ঝুঁকিতে পড়তে হয়।
হাসপাতালের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ত্রুটি এখন এক উন্মুক্ত জনস্বাস্থ্য হুমকিতে রূপ নিয়েছে। হাসপাতাল থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ সংক্রামক কঠিন ও তরল জৈব-বর্জ্য উৎপাদিত হলেও তার একটি বড় অংশ বৈজ্ঞানিক উপায়ে পৃথক ও শোধন করা হয় না। প্লাস্টিক স্যালাইনের বোতল, সূঁচ, ব্লেড এবং অঙ্গচ্ছেদের অংশবিশেষ যথাযথভাবে ধ্বংস না করে যত্রতত্র ফেলে রাখায় হাসপাতালকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং সাধারণ পথচারীরা পর্যন্ত মারাত্মক হেপাটাইটিস কিংবা টিটেনাসের ঝুঁকিতে পড়ছেন। একই সঙ্গে সংক্রামক তরল বর্জ্য কোনো শোধন প্রক্রিয়া ছাড়াই সরাসরি স্থানীয় ড্রেনেজ ব্যবস্থার সঙ্গে মিশে পুরো শহরের পরিবেশ ও ভূগর্ভস্থ পানিদূষণের কারণ হচ্ছে।
পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি চিকিৎসাসেবার আধুনিক অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও সমানভাবে হতাশাজনক। বিশেষ করে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) শয্যাস্বল্পতা প্রতিদিন অগণিত রোগীর জীবনকে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে। পুরো উত্তরাঞ্চলের জন্য বরাদ্দকৃত আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর সুবিধা চাহিদার তুলনায় নগণ্য। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা রোগীদের স্বজনেরা যখন আইসিইউর একটি বেডের জন্য আহাজারি করেন, তখন অনেক ক্ষেত্রেই বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত অর্থ গুনে বেসরকারি ক্লিনিকে যেতে হয়, যা সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের বাইরে। আবার চালু থাকা আইসিইউ বা সিসিইউর অনেক দামি যন্ত্রপাতির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায় সময়ে সময়ে গুরুতর সংকটের সৃষ্টি হয়।
একটি আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন কিংবা ওষুধের কার্যকারিতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অপরিহার্য হলো সংক্রমণমুক্ত পরিবেশ। শুধু নতুন ভবন নির্মাণ বা প্রশাসনিক আশ্বাসে এই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের সংকট কাটবে না। হাসপাতালের জন্য প্রয়োজন কঠোর অভ্যন্তরীণ তদারকি, নিয়মিত জীবাণুনাশক স্প্রে নিশ্চিতকরণ, চিকিৎসা বর্জ্য পৃথকীকরণে আধুনিক ইনসিনারেটর ও ইটিপি পুরোদমে কার্যকর করা এবং চাহিদানুযায়ী আইসিইউ শয্যার সংখ্যা বাড়ানো। রামেক হাসপাতালকে রোগ ছড়ানোর কারখানার বদলে সত্যিকারের রোগমুক্তির আশ্রয়স্থল হিসেবে ফিরিয়ে আনতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসনের এখনই সময়োপযোগী ও আপসহীন পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।