শুক্রবার , ০৯ অক্টোবর ২০২৬
হোম › সম্পাদকীয় › শ্রেণিকক্ষের বাইরে প্রতিবন্ধী শিশুরা
ভাঙতে হবে কাঠামোগত ও মানসিক দেয়াল

শ্রেণিকক্ষের বাইরে প্রতিবন্ধী শিশুরা

favicon
মো: নুরে ইসলাম মিলন:
শ্রেণিকক্ষের বাইরে প্রতিবন্ধী শিশুরা

প্রাথমিক শিক্ষায় সার্বিক অন্তর্ভুক্তি, শিক্ষার্থী ভর্তি বৃদ্ধি, লিঙ্গসমতা অর্জন এবং নিরক্ষরতা দূরীকরণে বাংলাদেশ বিগত এক দশকে দৃশ্যমান অগ্রগতি সাধন করেছে। কিন্তু এই পরিসংখ্যানগত সাফল্যের উজ্জ্বল আবরণের আড়ালে মাঠপর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অপ্রিয় সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির (পিইডিপি) আওতায় দেশে বহু দৃষ্টিনন্দন বহুতল ভবন এবং আধুনিক শ্রেণিকক্ষ গড়ে উঠলেও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের প্রবেশগম্যতা ও প্রয়োজন সেখানে চরমভাবে উপেক্ষিত। উন্নয়নের এই সামগ্রিক মানচিত্রে যেন শুরুতেই তাদের অদৃশ্য এক সীমারেখায় ব্র্যাকেটবন্দী করে রাখা হয়েছে। জাতীয় অগ্রগতির মাপকাঠি কেবল মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) কিংবা ভৌত অবকাঠামোর পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত রূপান্তর ও মর্যাদা নির্ধারিত হয় তার সবচেয়ে সংবেদনশীল ও পিছিয়ে পড়া শিশুটি সমান অধিকার নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারছে কি না, তার ওপর।

সংবিধানে শিক্ষার সার্বজনীন নিশ্চয়তা এবং জাতিসংঘের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার সনদে বাংলাদেশ স্বাক্ষরকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও রূঢ় বাস্তবতা হলো, ‘জাতীয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তি জরিপ ২০২১’ এবং ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী দেশে প্রতিবন্ধী শিশুদের অর্ধেকের বেশি এখনও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। এদের শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনার পথে মূলত দুটি বড় দেয়াল প্রকট হয়ে উঠেছে—একটি কাঠামোগত, অন্যটি মানসিক। অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এখনও হুইলচেয়ার চলাচলের উপযোগী প্রবেশগম্য র‍্যাম্প নেই, দৃষ্টি ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য নেই ব্রেইল পাঠ্যবই কিংবা ইশারা ভাষায় দক্ষ শিক্ষক। এর ওপর অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর ভিড়ে একজন শিক্ষকের পক্ষে বিশেষ শিশুর প্রতি প্রয়োজনীয় মনোযোগ দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। নীতিমালায় অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার কথা থাকলেও শিক্ষা বাজেটে সুনির্দিষ্ট বরাদ্দের অপ্রতুলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক তদারকির ঘাটতি এই কাঠামোগত সংকটকে দীর্ঘস্থায়ী রূপ দিয়েছে।

তবে ভৌত অবকাঠামোর চেয়েও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সমাজের মানসিক অচলায়তন। আমাদের সমাজে এখনও প্রতিবন্ধিতাকে স্বাভাবিক ভিন্নতা হিসেবে মেনে না নিয়ে করুণা বা অক্ষমতা হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি প্রবল। স্কুলের দ্বারপ্রান্ত থেকেও সেরিব্রাল পালসি বা অটিজমে আক্রান্ত শিশুকে ফিরিয়ে দেওয়ার মতো অমানবিক ঘটনা প্রমাণ করে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দরজাই শুধু বন্ধ নয়, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতেও তীব্র সংকীর্ণতা বাসা বেঁধেছে। শৈশবেই একটি শিশুর মনে ‘সমাজ তাকে চায় না’—এমন অপূরণীয় ক্ষত তৈরি হওয়া কোনো সংবেদনশীল ও গণতান্ত্রিক সমাজের পরিচয় হতে পারে না।

অবশ্য এই সীমাবদ্ধতার বিপরীতে আশার আলোও রয়েছে। সাভারের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রিসোর্স রুম চালুর পর বিশেষ শিশুদের উপস্থিতি লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একইভাবে ব্র্যাক ও সিডিডির তৃণমূলভিত্তিক উদ্যোগগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, প্রাতিষ্ঠানিক সদিচ্ছা, কার্যকর প্রশিক্ষণ ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে এই শিশুরাও মূলধারার শিক্ষায় সফলভাবে নিজেদের মেধার বিকাশ ঘটাতে পারে।

অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা কোনো করুণা বা দান নয়, এটি প্রতিটি শিশুর অবিচ্ছেদ্য সাংবিধানিক অধিকার। এই অধিকার নিশ্চিত করতে হলে প্রতিটি প্রাথমিক শিক্ষককে অন্তর্ভুক্তিমূলক পাঠদানে বাধ্যতামূলক ও প্রায়োগিক প্রশিক্ষণ দেওয়া এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে নতুন ভবন নির্মাণে শতভাগ প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করা, পুরোনো স্কুলগুলো দ্রুত সংস্কার করা, শিক্ষা বাজেটে সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ বাড়ানো এবং স্থানীয় পর্যায়ে সঠিক তথ্যভান্ডার তৈরি করা জরুরি। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে বদলাতে হবে সমাজের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি; বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু সমাজের বোঝা নয়, তারা রাষ্ট্রের অপার সম্ভাবনাময় সম্পদ। ইট-পাথরের বাহ্যিক চাকচিক্য তখনই অর্থবহ হবে, যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রবেশদ্বার ও সমাজের মানসিক দেয়াল ভেঙে তা দেশের প্রতিটি শিশুর জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত হবে। অন্যথায় ‘সবার জন্য শিক্ষা’ স্লোগানটি কেবল আনুষ্ঠানিক ফাঁকা বুলিতেই পর্যবসিত থেকে যাবে।

লেখক:

মো: নুরে ইসলাম মিলন
যুগ্ম-সম্পাদক
দৈনিক উপচার।

শ্রেণিকক্ষের বাইরে প্রতিবন্ধী শিশুরা
ভাঙতে হবে কাঠামোগত ও মানসিক দেয়াল
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
০৮ অক্টোবর ২০২৬
দৈনিক উপচার
 শুক্রবার , ০৯ অক্টোবর ২০২৬
হোম › সম্পাদকীয় › শ্রেণিকক্ষের বাইরে প্রতিবন্ধী শিশুরা
ভাঙতে হবে কাঠামোগত ও মানসিক দেয়াল

শ্রেণিকক্ষের বাইরে প্রতিবন্ধী শিশুরা

favicon
মো: নুরে ইসলাম মিলন:
শ্রেণিকক্ষের বাইরে প্রতিবন্ধী শিশুরা

প্রাথমিক শিক্ষায় সার্বিক অন্তর্ভুক্তি, শিক্ষার্থী ভর্তি বৃদ্ধি, লিঙ্গসমতা অর্জন এবং নিরক্ষরতা দূরীকরণে বাংলাদেশ বিগত এক দশকে দৃশ্যমান অগ্রগতি সাধন করেছে। কিন্তু এই পরিসংখ্যানগত সাফল্যের উজ্জ্বল আবরণের আড়ালে মাঠপর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অপ্রিয় সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির (পিইডিপি) আওতায় দেশে বহু দৃষ্টিনন্দন বহুতল ভবন এবং আধুনিক শ্রেণিকক্ষ গড়ে উঠলেও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের প্রবেশগম্যতা ও প্রয়োজন সেখানে চরমভাবে উপেক্ষিত। উন্নয়নের এই সামগ্রিক মানচিত্রে যেন শুরুতেই তাদের অদৃশ্য এক সীমারেখায় ব্র্যাকেটবন্দী করে রাখা হয়েছে। জাতীয় অগ্রগতির মাপকাঠি কেবল মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) কিংবা ভৌত অবকাঠামোর পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত রূপান্তর ও মর্যাদা নির্ধারিত হয় তার সবচেয়ে সংবেদনশীল ও পিছিয়ে পড়া শিশুটি সমান অধিকার নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারছে কি না, তার ওপর।

সংবিধানে শিক্ষার সার্বজনীন নিশ্চয়তা এবং জাতিসংঘের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার সনদে বাংলাদেশ স্বাক্ষরকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও রূঢ় বাস্তবতা হলো, ‘জাতীয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তি জরিপ ২০২১’ এবং ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী দেশে প্রতিবন্ধী শিশুদের অর্ধেকের বেশি এখনও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। এদের শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনার পথে মূলত দুটি বড় দেয়াল প্রকট হয়ে উঠেছে—একটি কাঠামোগত, অন্যটি মানসিক। অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এখনও হুইলচেয়ার চলাচলের উপযোগী প্রবেশগম্য র‍্যাম্প নেই, দৃষ্টি ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য নেই ব্রেইল পাঠ্যবই কিংবা ইশারা ভাষায় দক্ষ শিক্ষক। এর ওপর অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর ভিড়ে একজন শিক্ষকের পক্ষে বিশেষ শিশুর প্রতি প্রয়োজনীয় মনোযোগ দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। নীতিমালায় অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার কথা থাকলেও শিক্ষা বাজেটে সুনির্দিষ্ট বরাদ্দের অপ্রতুলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক তদারকির ঘাটতি এই কাঠামোগত সংকটকে দীর্ঘস্থায়ী রূপ দিয়েছে।

তবে ভৌত অবকাঠামোর চেয়েও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সমাজের মানসিক অচলায়তন। আমাদের সমাজে এখনও প্রতিবন্ধিতাকে স্বাভাবিক ভিন্নতা হিসেবে মেনে না নিয়ে করুণা বা অক্ষমতা হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি প্রবল। স্কুলের দ্বারপ্রান্ত থেকেও সেরিব্রাল পালসি বা অটিজমে আক্রান্ত শিশুকে ফিরিয়ে দেওয়ার মতো অমানবিক ঘটনা প্রমাণ করে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দরজাই শুধু বন্ধ নয়, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতেও তীব্র সংকীর্ণতা বাসা বেঁধেছে। শৈশবেই একটি শিশুর মনে ‘সমাজ তাকে চায় না’—এমন অপূরণীয় ক্ষত তৈরি হওয়া কোনো সংবেদনশীল ও গণতান্ত্রিক সমাজের পরিচয় হতে পারে না।

অবশ্য এই সীমাবদ্ধতার বিপরীতে আশার আলোও রয়েছে। সাভারের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রিসোর্স রুম চালুর পর বিশেষ শিশুদের উপস্থিতি লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একইভাবে ব্র্যাক ও সিডিডির তৃণমূলভিত্তিক উদ্যোগগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, প্রাতিষ্ঠানিক সদিচ্ছা, কার্যকর প্রশিক্ষণ ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে এই শিশুরাও মূলধারার শিক্ষায় সফলভাবে নিজেদের মেধার বিকাশ ঘটাতে পারে।

অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা কোনো করুণা বা দান নয়, এটি প্রতিটি শিশুর অবিচ্ছেদ্য সাংবিধানিক অধিকার। এই অধিকার নিশ্চিত করতে হলে প্রতিটি প্রাথমিক শিক্ষককে অন্তর্ভুক্তিমূলক পাঠদানে বাধ্যতামূলক ও প্রায়োগিক প্রশিক্ষণ দেওয়া এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে নতুন ভবন নির্মাণে শতভাগ প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করা, পুরোনো স্কুলগুলো দ্রুত সংস্কার করা, শিক্ষা বাজেটে সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ বাড়ানো এবং স্থানীয় পর্যায়ে সঠিক তথ্যভান্ডার তৈরি করা জরুরি। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে বদলাতে হবে সমাজের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি; বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু সমাজের বোঝা নয়, তারা রাষ্ট্রের অপার সম্ভাবনাময় সম্পদ। ইট-পাথরের বাহ্যিক চাকচিক্য তখনই অর্থবহ হবে, যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রবেশদ্বার ও সমাজের মানসিক দেয়াল ভেঙে তা দেশের প্রতিটি শিশুর জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত হবে। অন্যথায় ‘সবার জন্য শিক্ষা’ স্লোগানটি কেবল আনুষ্ঠানিক ফাঁকা বুলিতেই পর্যবসিত থেকে যাবে।

লেখক:

মো: নুরে ইসলাম মিলন
যুগ্ম-সম্পাদক
দৈনিক উপচার।

শ্রেণিকক্ষের বাইরে প্রতিবন্ধী শিশুরা
ভাঙতে হবে কাঠামোগত ও মানসিক দেয়াল
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
০৮ অক্টোবর ২০২৬