খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষকের স্বার্থে সার সিন্ডিকেট ভাঙতেই হবে
চলমান তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের বিরূপ প্রভাব যখন সাধারণ জনজীবন ও শিল্প খাতে চরম স্থবিরতা ডেকে এনেছে, ঠিক তখনই জাতীয় অর্থনীতির সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও প্রাণভোমরা কৃষিখাতে সারের সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে শস্যভাণ্ডারখ্যাত দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলসহ বিভিন্ন জেলায় রোপা আমন চাষের ভরা মৌসুমে সারের এই তীব্র হাহাকার সমগ্র কৃষি উৎপাদনকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডিলারদের গুদামের সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও কাঙ্ক্ষিত সার না পেয়ে প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা। কুড়িগ্রাম, রাজশাহী, লালমনিরহাট, মাগুরা ও শেরপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে কৃষকদের সড়ক অবরোধ কিংবা ডিলার পয়েন্টে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলার মতো ঘটনাও ঘটছে। যে কৃষক দিনরাত ঘাম ঝরিয়ে দেশের কোটি মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেন, তাঁদের উৎপাদিত ফসল রক্ষার এই মৌসুমে এমন অসহায় পরিস্থিতিতে পরা নিশ্চিতভাবেই এক অশনিসংকেত।
সরকারের পক্ষ থেকে বারবার আশ্বস্ত করা হচ্ছে যে দেশে সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং কোনো ধরনের প্রকৃত ঘাটতি নেই। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, গুদামে যদি পর্যাপ্ত সার মজুতই থাকে, তবে মাঠপর্যায়ে কৃষকের হাতে তা পৌঁছাতে কেন এমন অনিশ্চয়তা ও সংকট তৈরি হচ্ছে। সম্প্রতি গ্যাস সরবরাহের ঘাটতির কারণে সরকারি চারটি সার কারখানায় উৎপাদন আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রাখার খবর এলেও সার্বিক মজুতের যে হিসাব মিলছে, তাতে মাঠের এই হাহাকার স্বাভাবিক নয়। ফলে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে, একটি শক্তিশালী ও অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে, যার মূল উদ্দেশ্য চড়া দামে সার বিক্রি করে অতিরিক্ত মুনাফা হাতিয়ে নেওয়া। প্রান্তিক কৃষকদের খোলাবাজারে সার বিক্রির দাবিটিও সেই প্রেক্ষাপট থেকেই উঠে এসেছে, কারণ এর মাধ্যমে মধ্যস্বত্বভোগী ও ডিলারদের নিয়ন্ত্রিত একচেটিয়া সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া সম্ভব।
কৃষিখাত অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি ক্ষেত্র, যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেশের সার্বিক খাদ্যনিরাপত্তা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অনেক এলাকায় সেচকাজে এমনিতেই বিঘ্ন ঘটছে, তার ওপর সময়মতো সার প্রয়োগ করতে না পারলে চলতি মৌসুমে রোপা আমন উৎপাদনের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে। ধান উৎপাদনে সামান্যতম ঘাটতিও সামগ্রিক বাজারে চালের দাম বাড়িয়ে জাতীয় অর্থনীতিকে চরম অস্থির করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে স্পর্শকাতর এই খাতটিকে ব্যবহার করে কৃত্রিম সংকটের মাধ্যমে সরকারকে বেকায়দায় ফেলা কিংবা কৃষকদের রাজপথে নামিয়ে রাজনৈতিক ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের কোনো চক্রান্ত চলছে কিনা, সে বিষয়টিও কঠোর গোয়েন্দা নজরদারির আওতায় আনা জরুরি।
এই সংকট নিরসনে সরকারের গঠিত বিশেষ নজরদারি কমিটি এবং মাঠপর্যায়ের প্রশাসনকে কেবল আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। ডিলারদের কাছে কী পরিমাণ সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং তা সরকার নির্ধারিত মূল্যে প্রকৃত কৃষকদের কাছে পৌঁছাচ্ছে কিনা, তা শতভাগ স্বচ্ছতার সাথে নিশ্চিত করতে হবে। যেকোনো মূল্যে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী ডিলার, অসাধু ব্যবসায়ী ও তাদের মদদদাতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। দেশের অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার ভিত টিকিয়ে রাখতে কৃষককে বাঁচিয়ে রাখা অপরিহার্য, আর তাই সার নিয়ে যেকোনো চক্রান্তকে সমূলে উপড়ে ফেলে কৃষকের হাতে সময়মতো নিরবচ্ছিন্ন সার পৌঁছে দেওয়াই হোক এ মুহূর্তের সর্বোচ্চ জাতীয় অগ্রাধিকার।