অবুঝ শিশুর রক্তাক্ত ফ্রক ও আমাদের মৃত বিবেক
আজ কোনো পরিশীলিত ভাষায় শব্দ সাজানোর শক্তি আমাদের নেই। বুকটা ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে, আর কলম ধরতে গিয়ে আঙুলগুলো শিউরে উঠছে। প্রতিদিন সকালে যখন খবরের কাগজের পাতায় কিংবা স্ক্রিনের পর্দায় চোখ পড়ে, তখন চেনা চেনা অক্ষরগুলো যেন একেকটি ধারালো ছুরি হয়ে কলিজায় গিয়ে বিধে। আবার কোনো নিষ্পাপ শিশুর ক্ষতবিক্ষত নিথর দেহ, আবার কোনো অবুঝ দেবশিশুর শেষ আর্তনাদ মাটির নিচে চাপা পড়ে যাওয়ার সংবাদ। যে শিশুদের ঠোঁটে থাকার কথা ছিল অমলিন এক চিলতে হাসি, যাদের কচি হাতে থাকার কথা ছিল রঙিন খেলনা আর গল্পের বই—আজ জল্লাদের উল্লাসে তাদের রক্তাক্ত, নিথর দেহ আমাদের দেখতে হচ্ছে। আমরা আসলে কেমন সমাজে বাস করছি? এটা কি কোনো মানুষের দেশ, নাকি হিংস্র পশুদের অভয়ারণ্য?
একবার সব কোলাহল থামিয়ে, চোখ দুটো বন্ধ করে সেই ফুলটার কথা ভাবুন তো... যে হয়তো শেষ মুহূর্তে নরপশুদের হাত থেকে বাঁচার জন্য তার ছোট্ট দুটো হাত দিয়ে কতই না আকুতি করেছিল। অন্ধকার কোনো ঘরে বা নির্জন কোনো ঝোপের আড়ালে যখন দানবটা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তখন সে কতটা আতঙ্কিত হয়েছিল! তার সেই ছোট্ট বুকটা নিশ্চয়ই ভয়ে দুরুদুরু করে কাঁপছিল। সে হয়তো তার সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করে ডেকেছিল—"মা বাঁচাও! বাবা, আমাকে বাঁচাও!" কিন্তু কেউ যায়নি তার সাহায্যে। নিঃসঙ্গ, অসহায় সেই শিশুটির কান্না আর আকুতি বাতাসেই মিলিয়ে গেছে। রক্তে ভিজে গেছে তার পরনের ছোট্ট ফ্রকটা।
যে মা পরম মমতায়, হাজারো কষ্ট সহ্য করে আঁচলের ছায়ায় সন্তানকে বড় করছিলেন, সেই মায়ের কোল আজ আজীবনের জন্য শূন্য। যে বাবা দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি খাটেন শুধু সন্তানের মুখে এক মুঠো অন্ন আর একটুখানি হাসি ফোটানোর জন্য, সেই বাবা আজ মেয়ের লাশ কাঁধে নিয়ে পাথরের মতো নির্বাক দাঁড়িয়ে আছেন। একটা পশুর লালসার আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেল একটা আস্ত পরিবার, এক পৃথিবীর স্বপ্ন। একটি শিশুর লাশ যখন কবরে নামানো হয়, তখন কেবল একটি দেহই মাটি চাপা পড়ে না; বরং আমাদের তথাকথিত সভ্য সমাজ, আমাদের মনুষ্যত্ব আর পুরো রাষ্ট্রের বিবেক ধুলোয় মিশে যায়।
আমরা বড় বড় প্রগতি আর উন্নয়নের গল্প বলি, সভ্যতার অহংকার করি। অথচ আমাদের ঘরের সন্তানরা যখন ঘরের বাইরে, এমনকি ঘরের ভেতরেও নিরাপদ নয়, তখন আমাদের এই সভ্যতার মুখে চুনকালি পড়ে যায়। তার চেয়েও বড় লজ্জার, বড় বেদনার বিষয় হলো—অপরাধীরা কোনো না কোনো ফাঁকফোকর দিয়ে পার পেয়ে যায়, আর বিচারের আশায় পথ চেয়ে চেয়ে ভুক্তভোগী মা-বাবার চোখের জল শুকিয়ে অন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। এই তীব্র অন্যায়, এই পৈশাচিকতা আমরা দিনের পর দিন কীভাবে মুখ বুজে সহ্য করছি? আমরা কি এতটাই সংবেদনহীন, এতটাই মেরুদণ্ডহীন হয়ে গেছি?
আজ যদি আমরা কেবল 'দুঃখ প্রকাশ' করে আর সামাজিক মাধ্যমে একটা 'পোস্ট' দিয়ে দায়িত্ব শেষ মনে করি, তবে মনে রাখবেন, আগামীকালের শিকার হয়তো আপনার বা আমার ঘরের কোনো চেনা মুখ হবে। এই নীরবতা, এই নিষ্ক্রিয়তাও এক ধরণের অপরাধ। ধর্ষক ও খুনিদের কোনো জাত নেই, কোনো দল নেই, কোনো পরিচয় নেই। এরা মানুষ রূপী নরপিশাচ। এদের একমাত্র পাওনা—কঠোর ও দ্রুততম বিচার।
বিচার ব্যবস্থার কাছে আমাদের আকুল আবেদন, এই সব মামলার বিচার আর যেন আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে বছরের পর বছর ঝুলে না থাকে। বিচারের বাণী যেন আর নীরবে-নিভৃতে না কাঁদে। আমরা দেখতে চাই দ্রুততম সময়ে এই খুনিদের এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, যা দেখে আর কোনো পিশাচ যেন কোনো শিশুর দিকে কুদৃষ্টিতে তাকানোর সাহসও না পায়।
আসুন, আর নয়। আর একটা মায়ের কোলও যেন খালি না হয়। আর কোনো শিশুর নিথর দেহ যেন বাবার কাঁধে না ওঠে। এই সমাজকে পশুমুক্ত করতে হবে, আমাদের সন্তানদের জন্য একটা নিরাপদ পৃথিবী রেখে যেতে হবে। হে দেশের মানুষ, হে নীতিনির্ধারক, আমাদের ঘুমন্ত বিবেককে এবার অন্তত জাগিয়ে তুলুন! শিশুদের বাঁচতে দিন।