বৃহস্পতিবার , ০৮ অক্টোবর ২০২৬
হোম › সম্পাদকীয় › মাওলানা ভাসানী কখনো অসাম্প্রদায়িক ছিলেন না
তিনি ছিলেন ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী ও জাতীয়তাবাদী নেতা

মাওলানা ভাসানী কখনো অসাম্প্রদায়িক ছিলেন না

favicon
ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ সেলিম :
মাওলানা ভাসানী কখনো অসাম্প্রদায়িক ছিলেন না
মজলুম জননেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী।

মজলুম জননেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নানা ধরনের মূল্যায়ন রয়েছে। তাঁকে কখনো শুধু বামপন্থী নেতা, কখনো কৃষক-শ্রমিকের নেতা, আবার কখনো ‘অসাম্প্রদায়িক’ রাজনীতির প্রবক্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু তাঁর জীবন, বক্তব্য, ধর্মীয় চেতনা এবং রাজনৈতিক দর্শন গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে-মাওলানা ভাসানী কখনো তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে অস্বীকার করেননি এবং নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ বা অসাম্প্রদায়িক পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করার কোনো প্রয়োজনও অনুভব করেননি। তিনি ছিলেন একজন গভীরভাবে ধর্মবিশ্বাসী মুসলমান, ইসলামী মূল্যবোধে আস্থাশীল আলেম এবং একই সঙ্গে নিপীড়িত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার একজন জাতীয়তাবাদী নেতা।

তাঁর বহুল আলোচিত বক্তব্য-“আগে আমি মুসলমান, তারপর বাঙালি”-তাঁর আত্মপরিচয়ের অগ্রাধিকার সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দেয়। অর্থাৎ তাঁর বাঙালি জাতীয়তাবোধ তাঁর ইসলামী পরিচয়কে অতিক্রম করেনি; বরং ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে তাঁর জাতীয়তাবাদী ও গণমুখী রাজনীতি পাশাপাশি বিকশিত হয়েছে। তাই মাওলানা ভাসানীকে ‘অসাম্প্রদায়িক’ শব্দের প্রচলিত অর্থে চিহ্নিত করা তাঁর নিজস্ব বিশ্বাস ও রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তবে এর অর্থ এই নয় যে তিনি অন্য ধর্মের মানুষের অধিকার অস্বীকার করতেন। বরং তাঁর চিন্তায় ইসলামী ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা, শোষণমুক্তি এবং সকল মানুষের ন্যায্য অধিকারের সমন্বয় ছিল। তাঁর ‘হুকুমতে রব্বানিয়া’ দর্শন এই চিন্তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ।

‘আগে আমি মুসলমান, তারপর বাঙালি’:-

মাওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক ও আত্মপরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তাঁর বহুল উদ্ধৃত বক্তব্য-“আগে আমি মুসলমান, তারপর বাঙালি।”

এই বক্তব্যের মধ্যেই তাঁর আত্মপরিচয়ের অগ্রাধিকার স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি তাঁর মুসলিম পরিচয়কে কখনো অস্বীকার করেননি কিংবা রাজনৈতিক সুবিধার জন্য আড়াল করেননি। তাঁর কাছে ইসলাম ছিল শুধু ব্যক্তিগত ধর্মীয় পরিচয়ের বিষয় নয়; বরং ন্যায়, সাম্য, মানবিকতা, শোষণবিরোধিতা ও মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধের একটি নৈতিক ভিত্তি।

তবে তাঁর মুসলিম পরিচয় অন্য ধর্মের মানুষের অধিকার অস্বীকার করার অর্থ বহন করত না। বরং তাঁর চিন্তায় ন্যায়বিচার ছিল সর্বজনীন। অর্থাৎ তিনি নিজে ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী থেকেও রাষ্ট্রের নাগরিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলেছেন।

‘হুকুমতে রব্বানিয়া’: ভাসানীর রাজনৈতিক দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়

মাওলানা ভাসানীর চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ‘হুকুমতে রব্বানিয়া’ বা রব্বানী দর্শন। এই ধারণার কেন্দ্রে রয়েছে কোরআনের ‘রবুবিয়াত’-অর্থাৎ আল্লাহর পালন ও প্রতিপালনের ধারণা।

আল্লাহ ‘রব্বুল আলামিন’-সমগ্র জগতের প্রতিপালক। মাওলানা ভাসানীর চিন্তায় এই রবুবিয়াতের একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল। তাঁর মতে, সৃষ্টিকর্তা যেমন কোনো জাতি, শ্রেণি বা সম্প্রদায়ের প্রতি বৈষম্য না করে সমগ্র সৃষ্টিকে পালন করেন, তেমনি মানুষের রাষ্ট্রব্যবস্থাও হওয়া উচিত ন্যায়, সাম্য ও কল্যাণভিত্তিক।

অর্থাৎ রাষ্ট্রের কাজ হবে জনগণের ওপর নিছক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা নয়; বরং জনগণের জীবন ও মৌলিক অধিকার রক্ষা করা।

রাষ্ট্র পরিচালনায় রবের বিধান ও ন্যায়নীতি:-

মাওলানা ভাসানীর বিশ্বাস ছিল-রবের হুকুম ও ন্যায়নীতির ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালিত হলে মানুষের মধ্যে অন্যায় বৈষম্য কমবে এবং সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে।

তাঁর চিন্তায় রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব ছিল মানুষের মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করা। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা যেন সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকে—এমন একটি কল্যাণমুখী সমাজব্যবস্থার প্রত্যাশা তাঁর রাজনৈতিক চিন্তায় প্রতিফলিত হয়েছে।

এই কারণে তাঁর ‘পালনবাদ’ কেবল ধর্মীয় দর্শন ছিল না; এর মধ্যে ছিল একটি সামাজিক দায়িত্বের ধারণাও। রাষ্ট্র ও সমাজকে মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করতে হবে—এটাই ছিল এর অন্যতম মূল শিক্ষা।

ধর্মীয় মূল্যবোধ, কিন্তু বৈষম্য নয়:-

মাওলানা ভাসানী ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী ছিলেন-এ কথা যেমন সত্য, তেমনি এটিও সত্য যে তিনি শোষণ, অন্যায় ও মানুষের ওপর মানুষের নিপীড়নের বিরোধিতা করেছেন।

তাঁর কাছে ইসলামের ন্যায়বিচারের শিক্ষা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ফলে কোনো মানুষ শুধু তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে অন্যায়ের শিকার হবে-এমন সমাজ তিনি কল্পনা করেননি।

তাঁর দর্শনকে তাই ‘ধর্মহীন অসাম্প্রদায়িকতা’ দিয়ে ব্যাখ্যা করার পরিবর্তে ধর্মীয় নৈতিকতা ও সর্বজনীন ন্যায়বিচারের সমন্বিত দর্শন হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিসঙ্গত।

সকল ধর্মের মানুষের ন্যায্য অধিকার:-

মাওলানা ভাসানী মুসলমান ছিলেন এবং ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাস করতেন। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি ছিল সর্বজনীন।

রব্বানী রাষ্ট্রব্যবস্থার ধারণায় একজন মুসলমান যেমন নিরাপত্তা, সম্মান ও ন্যায়বিচারের অধিকারী, তেমনি অন্য ধর্মাবলম্বী নাগরিকও তাঁর জীবন, সম্পদ, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষার অধিকারী।

অর্থাৎ নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসে অবিচল থাকা এবং অন্যের ন্যায্য অধিকার স্বীকার করা—এই দুটি বিষয় পরস্পরবিরোধী নয়। মাওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক চিন্তাকে বোঝার ক্ষেত্রে এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মানুষ ও জীবজন্তুর প্রতিও দায়িত্ব:-

ভাসানীর রব্বানী দর্শনের আরেকটি মানবিক দিক হলো সৃষ্টির প্রতি দায়িত্ববোধ। তাঁর চিন্তার আলোকে রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিকতা শুধু মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; আল্লাহর সৃষ্ট জীবজন্তু ও প্রকৃতির প্রতিও মানুষের দায়িত্ব রয়েছে।

যে সমাজে দুর্বল মানুষ, দরিদ্র মানুষ কিংবা অসহায় প্রাণীও অন্যায় নির্যাতনের শিকার হয়, সেই সমাজকে প্রকৃত অর্থে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ বলা যায় না।

এখানেই ভাসানীর ধর্মীয় মূল্যবোধ ও মানবিক দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ দেখা যায়।

জাতীয়তাবাদী ভাসানী:-

মাওলানা ভাসানী ছিলেন একজন শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী নেতা। তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে ছিল জনগণের অধিকার, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং সাধারণ মানুষের মুক্তি।

তিনি বিদেশি আধিপত্য ও শোষণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর রাজনীতিতে দেশের স্বার্থ, জনগণের স্বার্থ এবং নিপীড়িত মানুষের স্বার্থ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তাঁর জাতীয়তাবাদ কোনো সংকীর্ণ জাতিগত বিদ্বেষের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল না; বরং জনগণের অধিকার ও আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল।

১৯৭৪ সালের ‘হুকুমতে রব্বানিয়া সমিতি’:-

মাওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক চিন্তার সাংগঠনিক প্রকাশ হিসেবে ১৯৭৪ সালের ৮ এপ্রিল টাঙ্গাইলের সন্তোষে ‘হুকুমতে রব্বানিয়া সমিতি’ গঠনের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

এ উদ্যোগের মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর ধর্মীয় ও সামাজিক দর্শনকে একটি সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। এর কেন্দ্রে ছিল ন্যায়ভিত্তিক, শোষণমুক্ত ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা।

এখানে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মধ্যে যে সম্পর্ক তিনি স্থাপন করেছিলেন, তা তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।

আজকের প্রেক্ষাপটে ভাসানীর দর্শন:-

বর্তমান সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য, দুর্নীতি, শোষণ, বেকারত্ব, দ্রব্যমূল্যের চাপ এবং সামাজিক অবিচারের মতো নানা সমস্যা রয়েছে। এই বাস্তবতায় মাওলানা ভাসানীর চিন্তা নতুন করে আলোচনার দাবি রাখে।

তিনি আমাদের সামনে এমন একটি প্রশ্ন রেখে গেছেন—রাষ্ট্রের ক্ষমতা কার জন্য? রাষ্ট্রের সম্পদ কার জন্য? রাজনীতি কি কেবল ক্ষমতা অর্জনের উপায়, নাকি মানুষের কল্যাণের মাধ্যম?

‘হুকুমতে রব্বানিয়া’র দর্শন থেকে অন্তত একটি শিক্ষা স্পষ্ট-রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও সম্পদ জনগণের কল্যাণে ব্যবহার করতে হবে এবং সমাজে ন্যায় ও সাম্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে হবে।

উপসংহার:-

মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে ‘অসাম্প্রদায়িক’ পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ করা তাঁর প্রকৃত আত্মপরিচয় ও রাজনৈতিক দর্শনকে অসম্পূর্ণভাবে উপস্থাপন করে। তিনি নিজেকে প্রথমত মুসলমান হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন, ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাস করেছেন এবং তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে আল্লাহর রবুবিয়াত, ন্যায় ও মানবিক দায়িত্বকে ধারণ করেছেন। তাঁর নিজের ভাষায়—“আগে আমি মুসলমান, তারপর বাঙালি।” সুতরাং তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তিকে ধর্মনিরপেক্ষ বা ধর্মবিচ্ছিন্ন কোনো কাঠামোয় ব্যাখ্যা করার পরিবর্তে তাঁর নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাসের আলোকে মূল্যায়ন করাই অধিক সংগত।

একই সঙ্গে তিনি ছিলেন একজন দৃঢ়চেতা জাতীয়তাবাদী ও মজলুম মানুষের নেতা। তাঁর জাতীয়তাবাদ ছিল জনগণের অধিকার, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং শোষণমুক্তির আকাঙ্ক্ষায় প্রোথিত। তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাস তাঁকে অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করেছে; আর তাঁর জাতীয়তাবাদ তাঁকে দেশের সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এগিয়ে নিয়েছে।

তাই মাওলানা ভাসানীর যথার্থ পরিচয় খুঁজতে হলে তাঁকে ‘অসাম্প্রদায়িক’ কিংবা ‘সাম্প্রদায়িক’-এই সরল দ্বৈততার মধ্যে আটকে না রেখে বলতে হয়: তিনি ছিলেন ধর্মীয় মূল্যবোধে দৃঢ়, ইসলামী ন্যায়নীতিতে বিশ্বাসী, জাতীয়তাবাদী এবং একই সঙ্গে সব মানুষের ন্যায্য অধিকারের পক্ষে সোচ্চার একজন মজলুম জননেতা।

তাঁর ‘হুকুমতে রব্বানিয়া’ দর্শন এই পরিচয়েরই রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রকাশ-যেখানে রবের বিধান, ন্যায়বিচার, সাম্য, সৃষ্টির প্রতি দায়িত্ব এবং শোষিত মানুষের অধিকার একসূত্রে গাঁথা। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের মূল শিক্ষা ছিল-ধর্মীয় বিশ্বাসকে বিসর্জন দিয়ে নয়, বরং ন্যায় ও মানবিকতার আলোকে সেই মূল্যবোধকে সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনে প্রয়োগ করেই শোষণমুক্ত ও কল্যাণভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

লেখক ও গবেষক

 ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ সেলিম

প্রকাশক ও সম্পাদক, দৈনিক উপচার।

মাওলানা ভাসানী কখনো অসাম্প্রদায়িক ছিলেন না
তিনি ছিলেন ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী ও জাতীয়তাবাদী নেতা
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
০৭ অক্টোবর ২০২৬
দৈনিক উপচার
 বৃহস্পতিবার , ০৮ অক্টোবর ২০২৬
হোম › সম্পাদকীয় › মাওলানা ভাসানী কখনো অসাম্প্রদায়িক ছিলেন না
তিনি ছিলেন ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী ও জাতীয়তাবাদী নেতা

মাওলানা ভাসানী কখনো অসাম্প্রদায়িক ছিলেন না

favicon
ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ সেলিম :
মাওলানা ভাসানী কখনো অসাম্প্রদায়িক ছিলেন না
মজলুম জননেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী।

মজলুম জননেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নানা ধরনের মূল্যায়ন রয়েছে। তাঁকে কখনো শুধু বামপন্থী নেতা, কখনো কৃষক-শ্রমিকের নেতা, আবার কখনো ‘অসাম্প্রদায়িক’ রাজনীতির প্রবক্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু তাঁর জীবন, বক্তব্য, ধর্মীয় চেতনা এবং রাজনৈতিক দর্শন গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে-মাওলানা ভাসানী কখনো তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে অস্বীকার করেননি এবং নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ বা অসাম্প্রদায়িক পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করার কোনো প্রয়োজনও অনুভব করেননি। তিনি ছিলেন একজন গভীরভাবে ধর্মবিশ্বাসী মুসলমান, ইসলামী মূল্যবোধে আস্থাশীল আলেম এবং একই সঙ্গে নিপীড়িত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার একজন জাতীয়তাবাদী নেতা।

তাঁর বহুল আলোচিত বক্তব্য-“আগে আমি মুসলমান, তারপর বাঙালি”-তাঁর আত্মপরিচয়ের অগ্রাধিকার সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দেয়। অর্থাৎ তাঁর বাঙালি জাতীয়তাবোধ তাঁর ইসলামী পরিচয়কে অতিক্রম করেনি; বরং ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে তাঁর জাতীয়তাবাদী ও গণমুখী রাজনীতি পাশাপাশি বিকশিত হয়েছে। তাই মাওলানা ভাসানীকে ‘অসাম্প্রদায়িক’ শব্দের প্রচলিত অর্থে চিহ্নিত করা তাঁর নিজস্ব বিশ্বাস ও রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তবে এর অর্থ এই নয় যে তিনি অন্য ধর্মের মানুষের অধিকার অস্বীকার করতেন। বরং তাঁর চিন্তায় ইসলামী ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা, শোষণমুক্তি এবং সকল মানুষের ন্যায্য অধিকারের সমন্বয় ছিল। তাঁর ‘হুকুমতে রব্বানিয়া’ দর্শন এই চিন্তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ।

‘আগে আমি মুসলমান, তারপর বাঙালি’:-

মাওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক ও আত্মপরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তাঁর বহুল উদ্ধৃত বক্তব্য-“আগে আমি মুসলমান, তারপর বাঙালি।”

এই বক্তব্যের মধ্যেই তাঁর আত্মপরিচয়ের অগ্রাধিকার স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি তাঁর মুসলিম পরিচয়কে কখনো অস্বীকার করেননি কিংবা রাজনৈতিক সুবিধার জন্য আড়াল করেননি। তাঁর কাছে ইসলাম ছিল শুধু ব্যক্তিগত ধর্মীয় পরিচয়ের বিষয় নয়; বরং ন্যায়, সাম্য, মানবিকতা, শোষণবিরোধিতা ও মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধের একটি নৈতিক ভিত্তি।

তবে তাঁর মুসলিম পরিচয় অন্য ধর্মের মানুষের অধিকার অস্বীকার করার অর্থ বহন করত না। বরং তাঁর চিন্তায় ন্যায়বিচার ছিল সর্বজনীন। অর্থাৎ তিনি নিজে ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী থেকেও রাষ্ট্রের নাগরিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলেছেন।

‘হুকুমতে রব্বানিয়া’: ভাসানীর রাজনৈতিক দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়

মাওলানা ভাসানীর চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ‘হুকুমতে রব্বানিয়া’ বা রব্বানী দর্শন। এই ধারণার কেন্দ্রে রয়েছে কোরআনের ‘রবুবিয়াত’-অর্থাৎ আল্লাহর পালন ও প্রতিপালনের ধারণা।

আল্লাহ ‘রব্বুল আলামিন’-সমগ্র জগতের প্রতিপালক। মাওলানা ভাসানীর চিন্তায় এই রবুবিয়াতের একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল। তাঁর মতে, সৃষ্টিকর্তা যেমন কোনো জাতি, শ্রেণি বা সম্প্রদায়ের প্রতি বৈষম্য না করে সমগ্র সৃষ্টিকে পালন করেন, তেমনি মানুষের রাষ্ট্রব্যবস্থাও হওয়া উচিত ন্যায়, সাম্য ও কল্যাণভিত্তিক।

অর্থাৎ রাষ্ট্রের কাজ হবে জনগণের ওপর নিছক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা নয়; বরং জনগণের জীবন ও মৌলিক অধিকার রক্ষা করা।

রাষ্ট্র পরিচালনায় রবের বিধান ও ন্যায়নীতি:-

মাওলানা ভাসানীর বিশ্বাস ছিল-রবের হুকুম ও ন্যায়নীতির ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালিত হলে মানুষের মধ্যে অন্যায় বৈষম্য কমবে এবং সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে।

তাঁর চিন্তায় রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব ছিল মানুষের মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করা। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা যেন সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকে—এমন একটি কল্যাণমুখী সমাজব্যবস্থার প্রত্যাশা তাঁর রাজনৈতিক চিন্তায় প্রতিফলিত হয়েছে।

এই কারণে তাঁর ‘পালনবাদ’ কেবল ধর্মীয় দর্শন ছিল না; এর মধ্যে ছিল একটি সামাজিক দায়িত্বের ধারণাও। রাষ্ট্র ও সমাজকে মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করতে হবে—এটাই ছিল এর অন্যতম মূল শিক্ষা।

ধর্মীয় মূল্যবোধ, কিন্তু বৈষম্য নয়:-

মাওলানা ভাসানী ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী ছিলেন-এ কথা যেমন সত্য, তেমনি এটিও সত্য যে তিনি শোষণ, অন্যায় ও মানুষের ওপর মানুষের নিপীড়নের বিরোধিতা করেছেন।

তাঁর কাছে ইসলামের ন্যায়বিচারের শিক্ষা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ফলে কোনো মানুষ শুধু তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে অন্যায়ের শিকার হবে-এমন সমাজ তিনি কল্পনা করেননি।

তাঁর দর্শনকে তাই ‘ধর্মহীন অসাম্প্রদায়িকতা’ দিয়ে ব্যাখ্যা করার পরিবর্তে ধর্মীয় নৈতিকতা ও সর্বজনীন ন্যায়বিচারের সমন্বিত দর্শন হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিসঙ্গত।

সকল ধর্মের মানুষের ন্যায্য অধিকার:-

মাওলানা ভাসানী মুসলমান ছিলেন এবং ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাস করতেন। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি ছিল সর্বজনীন।

রব্বানী রাষ্ট্রব্যবস্থার ধারণায় একজন মুসলমান যেমন নিরাপত্তা, সম্মান ও ন্যায়বিচারের অধিকারী, তেমনি অন্য ধর্মাবলম্বী নাগরিকও তাঁর জীবন, সম্পদ, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষার অধিকারী।

অর্থাৎ নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসে অবিচল থাকা এবং অন্যের ন্যায্য অধিকার স্বীকার করা—এই দুটি বিষয় পরস্পরবিরোধী নয়। মাওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক চিন্তাকে বোঝার ক্ষেত্রে এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মানুষ ও জীবজন্তুর প্রতিও দায়িত্ব:-

ভাসানীর রব্বানী দর্শনের আরেকটি মানবিক দিক হলো সৃষ্টির প্রতি দায়িত্ববোধ। তাঁর চিন্তার আলোকে রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিকতা শুধু মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; আল্লাহর সৃষ্ট জীবজন্তু ও প্রকৃতির প্রতিও মানুষের দায়িত্ব রয়েছে।

যে সমাজে দুর্বল মানুষ, দরিদ্র মানুষ কিংবা অসহায় প্রাণীও অন্যায় নির্যাতনের শিকার হয়, সেই সমাজকে প্রকৃত অর্থে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ বলা যায় না।

এখানেই ভাসানীর ধর্মীয় মূল্যবোধ ও মানবিক দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ দেখা যায়।

জাতীয়তাবাদী ভাসানী:-

মাওলানা ভাসানী ছিলেন একজন শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী নেতা। তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে ছিল জনগণের অধিকার, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং সাধারণ মানুষের মুক্তি।

তিনি বিদেশি আধিপত্য ও শোষণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর রাজনীতিতে দেশের স্বার্থ, জনগণের স্বার্থ এবং নিপীড়িত মানুষের স্বার্থ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তাঁর জাতীয়তাবাদ কোনো সংকীর্ণ জাতিগত বিদ্বেষের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল না; বরং জনগণের অধিকার ও আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল।

১৯৭৪ সালের ‘হুকুমতে রব্বানিয়া সমিতি’:-

মাওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক চিন্তার সাংগঠনিক প্রকাশ হিসেবে ১৯৭৪ সালের ৮ এপ্রিল টাঙ্গাইলের সন্তোষে ‘হুকুমতে রব্বানিয়া সমিতি’ গঠনের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

এ উদ্যোগের মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর ধর্মীয় ও সামাজিক দর্শনকে একটি সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। এর কেন্দ্রে ছিল ন্যায়ভিত্তিক, শোষণমুক্ত ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা।

এখানে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মধ্যে যে সম্পর্ক তিনি স্থাপন করেছিলেন, তা তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।

আজকের প্রেক্ষাপটে ভাসানীর দর্শন:-

বর্তমান সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য, দুর্নীতি, শোষণ, বেকারত্ব, দ্রব্যমূল্যের চাপ এবং সামাজিক অবিচারের মতো নানা সমস্যা রয়েছে। এই বাস্তবতায় মাওলানা ভাসানীর চিন্তা নতুন করে আলোচনার দাবি রাখে।

তিনি আমাদের সামনে এমন একটি প্রশ্ন রেখে গেছেন—রাষ্ট্রের ক্ষমতা কার জন্য? রাষ্ট্রের সম্পদ কার জন্য? রাজনীতি কি কেবল ক্ষমতা অর্জনের উপায়, নাকি মানুষের কল্যাণের মাধ্যম?

‘হুকুমতে রব্বানিয়া’র দর্শন থেকে অন্তত একটি শিক্ষা স্পষ্ট-রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও সম্পদ জনগণের কল্যাণে ব্যবহার করতে হবে এবং সমাজে ন্যায় ও সাম্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে হবে।

উপসংহার:-

মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে ‘অসাম্প্রদায়িক’ পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ করা তাঁর প্রকৃত আত্মপরিচয় ও রাজনৈতিক দর্শনকে অসম্পূর্ণভাবে উপস্থাপন করে। তিনি নিজেকে প্রথমত মুসলমান হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন, ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাস করেছেন এবং তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে আল্লাহর রবুবিয়াত, ন্যায় ও মানবিক দায়িত্বকে ধারণ করেছেন। তাঁর নিজের ভাষায়—“আগে আমি মুসলমান, তারপর বাঙালি।” সুতরাং তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তিকে ধর্মনিরপেক্ষ বা ধর্মবিচ্ছিন্ন কোনো কাঠামোয় ব্যাখ্যা করার পরিবর্তে তাঁর নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাসের আলোকে মূল্যায়ন করাই অধিক সংগত।

একই সঙ্গে তিনি ছিলেন একজন দৃঢ়চেতা জাতীয়তাবাদী ও মজলুম মানুষের নেতা। তাঁর জাতীয়তাবাদ ছিল জনগণের অধিকার, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং শোষণমুক্তির আকাঙ্ক্ষায় প্রোথিত। তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাস তাঁকে অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করেছে; আর তাঁর জাতীয়তাবাদ তাঁকে দেশের সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এগিয়ে নিয়েছে।

তাই মাওলানা ভাসানীর যথার্থ পরিচয় খুঁজতে হলে তাঁকে ‘অসাম্প্রদায়িক’ কিংবা ‘সাম্প্রদায়িক’-এই সরল দ্বৈততার মধ্যে আটকে না রেখে বলতে হয়: তিনি ছিলেন ধর্মীয় মূল্যবোধে দৃঢ়, ইসলামী ন্যায়নীতিতে বিশ্বাসী, জাতীয়তাবাদী এবং একই সঙ্গে সব মানুষের ন্যায্য অধিকারের পক্ষে সোচ্চার একজন মজলুম জননেতা।

তাঁর ‘হুকুমতে রব্বানিয়া’ দর্শন এই পরিচয়েরই রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রকাশ-যেখানে রবের বিধান, ন্যায়বিচার, সাম্য, সৃষ্টির প্রতি দায়িত্ব এবং শোষিত মানুষের অধিকার একসূত্রে গাঁথা। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের মূল শিক্ষা ছিল-ধর্মীয় বিশ্বাসকে বিসর্জন দিয়ে নয়, বরং ন্যায় ও মানবিকতার আলোকে সেই মূল্যবোধকে সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনে প্রয়োগ করেই শোষণমুক্ত ও কল্যাণভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

লেখক ও গবেষক

 ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ সেলিম

প্রকাশক ও সম্পাদক, দৈনিক উপচার।

মাওলানা ভাসানী কখনো অসাম্প্রদায়িক ছিলেন না
তিনি ছিলেন ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী ও জাতীয়তাবাদী নেতা
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
০৭ অক্টোবর ২০২৬