স্কুলগেট অবরোধ ও সহিংসতা
ফ্রান্সের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের বাজেট সংকট, তীব্র শিক্ষকস্বল্পতা এবং জরাজীর্ণ অবকাঠামোর প্রতিবাদে দেশজুড়ে ব্যাপক আন্দোলনে নেমেছে লাখ লাখ হাইস্কুল শিক্ষার্থী। সেপ্টেম্বরের শেষ দিক থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনের অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীরা দেশটির শত শত হাইস্কুল (স্থানীয় ভাষায় ‘লিসে’) এর প্রবেশপথ অবরুদ্ধ করে বিক্ষোভ অব্যাহত রেখেছে। রাজধানী প্যারিসসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শহরে এই বিক্ষোভ সংঘাতপূর্ণ রূপ নেওয়ায় শত শত শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ এ পর্যন্ত কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী ও বহিরাগতকে আটক করেছে।
পনেরো থেকে আঠারো বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের এই ক্ষোভের মূল কেন্দ্রে রয়েছে পাঠদানের চরম সংকট ও নাজুক পরিবেশ।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় শিক্ষকের অভাবে নিয়মিত ক্লাস বন্ধ থাকছে এবং পদ শূন্য থাকলেও বিকল্প কোনো শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না। গ্রীষ্মের তীব্র তাপপ্রবাহের সময় শ্রেণিকক্ষে অসহনীয় পরিবেশ তৈরি হলেও কোনো ধরনের আধুনিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই। এর পাশাপাশি স্কুলে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধকরণ এবং সকাল থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত একটানা দীর্ঘ সময়সূচি নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন শিক্ষার্থীরা। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সন্ধ্যার পর বাসায় ফিরে স্বস্তিতে বিশ্রাম কিংবা গৃহকাজের সুযোগ মেলে না বলেও তাদের অভিযোগ।
আন্দোলনের আরেকটি অন্যতম কারণ হলো উচ্চশিক্ষায় আসন বণ্টনের কেন্দ্রীয় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘পার্কুরসাপ’। ফ্রান্সে প্রায় আশি শতাংশ শিক্ষার্থী মাধ্যমিকের ‘বাকালোরেয়া’ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও এই প্ল্যাটফর্মের অস্বচ্ছ নিয়মের কারণে পছন্দের বিষয়ে ভর্তি হতে ব্যর্থ হচ্ছেন অনেকেই। ফলে প্রতিযোগিতামূলক কোর্সগুলোতে সুযোগ না পেয়ে ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় ভুগছেন বিপুলসংখ্যক তরুণ।
উন্নত দেশগুলোর জোট ওইসিডি-র সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা গেছে, উচ্চ মাধ্যমিকে প্রতি শিক্ষার্থীর পেছনে ফরাসি সরকার ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড় ব্যয়ের চেয়ে বেশি অর্থ বরাদ্দ দিলেও মাঠপর্যায়ে অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনার সংকট প্রকট। দীর্ঘ দুপুরের বিরতি ও জটিল সময়সূচির কারণে শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন ক্লান্তি অনেক দিনের পুরোনো চিত্র হলেও বর্তমান বিস্ফোরণের কারণ আরও গভীর।
পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরঁ নুনিয়েজ উল্লেখ করেছেন, আন্দোলনের বিস্তৃতি ও সহিংসতার মাত্রা বর্তমানে অস্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফরাসি আইনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অবরুদ্ধ করা অবৈধ হলেও আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপের ঝুঁকি নিয়েই মাঠে রয়েছে শিক্ষার্থীরা।
প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ঁ লেকর্নু জানিয়েছেন, নিরাপত্তা বাহিনীকে শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হওয়ার কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি, কেবল সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখতে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্সে ক্ষমতা পরিবর্তনের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য রাজপথের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। ১৯৮৬ সালের শিক্ষা সংস্কার কিংবা ২০০৬ সালের বিতর্কিত শ্রম আইন প্রত্যাহারের মতো ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তগুলো ফরাসি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখেই বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিল তৎকালীন সরকারগুলো। সম্প্রতি বিএফএমটিভির এক জরিপে দেখা গেছে, ফ্রান্সের প্রায় বাহাত্তর শতাংশ মানুষ শিক্ষার্থীদের দাবিকে যৌক্তিক মনে করেন এবং পঞ্চান্ন শতাংশ নাগরিক সরাসরি এই আন্দোলনের পক্ষে মত দিয়েছেন। ফলে শিক্ষক সমিতি, শীর্ষ শ্রমিক ইউনিয়ন এবং বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রত্যক্ষ সমর্থনে দিন দিন ফরাসি শিক্ষার্থীদের এই রাজপথের লড়াই নতুন মাত্রা পাচ্ছে।