স্থানীয় নির্বাচন: কঠিন সমীকরণে ক্ষমতাসীনরা
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে দেশজুড়ে ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সম্ভাব্য রোডম্যাপ ঘোষণার পর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে নির্বাচনী আবহ তৈরি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহর ঘোষিত রূপরেখা অনুযায়ী, আগামী ১২ নভেম্বর থেকে শুরু হয়ে সাতটি ধাপে এই ভোটগ্রহণ চলবে আগামী বছরের ২৭ মে পর্যন্ত। তবে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর পক্ষ থেকে এ নিয়ে আপত্তি ওঠার পাশাপাশি পুরো রাজনৈতিক মহলে হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। ইউপি নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ এবং সিটি করপোরেশন নির্বাচনগুলোও পর্যায়ক্রমে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, দলীয় প্রতীকবিহীন এই স্থানীয় সরকার নির্বাচন ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা হতে যাচ্ছে।
জাতীয় নির্বাচনের পর ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যস্ত সময় পার করছে বিএনপি। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনী প্রস্তুতিতে দৃশ্যত অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে বিরোধী দলগুলো। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর তরুণদের উদ্যোগে গঠিত নতুন রাজনৈতিক শক্তি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ইতিমধ্যে সারাদেশে জোর গণসংযোগ ও প্রার্থী চূড়ান্ত করার কাজ শুরু করেছে। অন্যদিকে, সরকারের দায়িত্বে থাকা বিএনপি স্থানীয় নির্বাচনের কৌশল ও প্রার্থী সমর্থনে এখনো প্রকাশ্যে নীরব ভূমিকা পালন করছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এবারের নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকলেও দল সমর্থিত একক প্রার্থী নির্ধারণ করাই বিএনপির জন্য সবচেয়ে জটিল বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। তৃণমূলের প্রতিটি ইউনিয়নেই গড়ে সাত থেকে পনেরো জন পর্যন্ত দলীয় সমর্থনপ্রত্যাশী নেতা আগেভাগেই প্রচারণায় নেমে পড়েছেন। কেন্দ্রীয় কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা আসার আগেই মাঠপর্যায়ে তাদের জনসংযোগ ও ব্যানার-ফেস্টুন জানান দিচ্ছে অভ্যন্তরীণ তীব্র প্রতিযোগিতার। ফলে বিদ্রোহী প্রার্থীদের সামাল দেওয়া, সংঘাত এড়ানো এবং একক প্রার্থীর পক্ষে সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখা বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের জন্য বড় এক সাংগঠনিক সংকট তৈরি করতে পারে।
এর পাশাপাশি দেশজুড়ে বিদ্যমান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সারের প্রাপ্যতা এবং লাগামহীন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে বিএনপি সরকারকে ক্রমাগত চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। রাজপথের পাশাপাশি সংসদেও এসব ইস্যুতে সক্রিয় রয়েছে জামায়াত ও এনসিপি। দল দুটি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও জনস্বার্থের নানা দাবিতে লংমার্চসহ ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করছে। প্রখ্যাত রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রফেসর ড. দিলারা চৌধুরীর মতে, নির্বাচনী ময়দানে বিরোধী দলগুলোকে মোকাবিলার আগে বিএনপির জন্য নিজেদের ঘরের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব সামলানোই প্রধান চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক চাপ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং চাঁদাবাজির মতো বিতর্কিত ইস্যুগুলো ভোটারদের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে, যা ভোটে বিএনপির সমর্থকদের জন্য বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।
মাঠের বাস্তবতায় জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি বেশ পরিকল্পিতভাবেই এগোচ্ছে। সম্পূর্ণ নির্দলীয়ভাবে ভোট হলেও এই দল দুটি পরোক্ষভাবে একক প্রার্থী বাছাইয়ে অনেক দূর এগিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী ১২টি সিটি করপোরেশনের সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীদের তালিকা অনেকটাই চূড়ান্ত করেছে, যেখানে তরুণ নেতৃত্বকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তাদের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ডাকসুর সাবেক ভিপি সাদিক কায়েম, ঢাকা উত্তরে সেলিম উদ্দিন, চট্টগ্রাম সিটিতে শামসুজ্জামান হেলালী, গাজীপুরে হাফিজুর রহমান, নারায়ণগঞ্জে আবদুল জব্বার এবং রংপুরে এ টি এম আজম খানকে তারা দলীয়ভাবে সবুজ সংকেত দিয়েছে। দলটির নারী কর্মীরাও তৃণমূল পর্যায়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকারকে তারা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন এবং ইউনিয়ন থেকে সিটি করপোরেশন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে সর্বজনগ্রহণযোগ্য প্রার্থীদের দলীয়ভাবে সমর্থন দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে, তরুণদের দল এনসিপি জাতীয় নির্বাচনে সমমনাদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ থাকলেও স্থানীয় সরকারে একক শক্তিতে লড়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দলটি ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে মুখ্য সমন্বয়ক নাসীর উদ্দিন পাটওয়ারী এবং ঢাকা উত্তর সিটিতে মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়ার নাম মেয়র প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে। এর বাইরে সারাদেশে আরও শতাধিক পৌরসভা ও উপজেলায় একক প্রার্থীর নাম প্রকাশ করেছে তারা। দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষারের ভাষ্যমতে, এই নির্বাচনের মাধ্যমে তারা তৃণমূল পর্যায়ে দলের শেকড় মজবুত করতে চান।
প্রতিদ্বন্দ্বীদের এই ব্যাপক তৎপরতার বিপরীতে বিএনপি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ দেশের কোথাও এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রার্থীর নাম বা বার্তা দেয়নি। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটিতে বর্তমানে সরকারের নিয়োগকৃত দুই দলীয় প্রশাসক দায়িত্ব পালন করছেন এবং তারা নিজেদের উদ্যোগে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তবে তাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির নানা অভিযোগ নিয়ে সাধারণ ভোটার ও রাজনৈতিক মহলে কানাঘুষা চলছে। ঢাকা দক্ষিণে স্থায়ী কমিটির সিনিয়র নেতা মির্জা আব্বাস ও বর্তমান প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের যেমন নিজস্ব প্রভাব রয়েছে, তেমনি সেখানে একটি বিশাল আঞ্চলিক ভোটার ভিত্তি রয়েছে, যাদের সমর্থন পেতে দলের শীর্ষ স্তরের সমন্বয় প্রয়োজন। অন্যদিকে উত্তর সিটির বর্তমান প্রশাসক বিগত জাতীয় নির্বাচনে পরাজিত হওয়ায় ভোটারদের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে খোদ বিএনপির ভেতরেই প্রশ্ন উঠছে। ঢাকার বাইরেও তৃণমূলের পদপ্রত্যাশীরা দলের অনুমোদন ছাড়াই পোস্টার ও বিলবোর্ড লাগিয়ে বিভ্রান্তি বাড়াচ্ছেন।
সার্বিক পরিস্থিতিতে দলের ইমেজ ধরে রাখতে বিএনপি শীর্ষ নেতৃত্বও নড়েচড়ে বসেছে। দলটির নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো জানাচ্ছে, প্রতীক না থাকার সুযোগ নিয়ে ক্লিন ইমেজের ও স্থানীয়ভাবে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের স্বতন্ত্রভাবে সমর্থন দেওয়ার ছক কষছে দলটি। বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জেলা ও মহানগরের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক মতবিনিময়কালে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন যেন স্থানীয় পর্যায়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একক প্রার্থীর পেছনে দল ঐক্যবদ্ধ থাকে। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানিয়েছেন, স্থানীয় নির্বাচন সম্পূর্ণ নির্দলীয় হওয়ায় কেন্দ্র থেকে আনুষ্ঠানিক দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে না; তবে স্থানীয়ভাবে যিনি সততা ও জনপ্রিয়তায় এগিয়ে থাকবেন, তাকে সমর্থন দিয়ে বিজয়ী করার বার্তা তৃণমূলে দেওয়া হয়েছে। মূলত একক প্রার্থী নিশ্চিত করা, বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকানো এবং নির্বাচনী পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখা—এই ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জ পার হতে পারলেই স্থানীয় সরকারের পরীক্ষায় বিএনপি নিজেদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক শক্তির প্রমাণ দিতে সক্ষম হবে।