সিট প্রলোভন ও গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে রাবিতে শিক্ষার্থীকে হেনস্তা
ছাত্রদলে অনুপ্রবেশ ও গুপ্তচরবৃত্তির সন্দেহে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শহীদ শামসুজ্জোহা হলে মোহাম্মদ আসিফ নামের এক শিক্ষার্থীকে রাতভর জেরা, হেনস্তা ও মারধরের অভিযোগ উঠেছে হল শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। সোমবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে হলের ভেতরে এ ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী আসিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর ভাষ্য অনুযায়ী, হলের বৈধ সিট না থাকায় এবং তীব্র পারিবারিক সংকটের কারণে তিনি সিটের জন্য দীর্ঘদিন হল প্রশাসনের দ্বারস্থ হচ্ছিলেন। একপর্যায়ে তাকে হল ছাত্রদলের সভাপতি মেহেদী হাসান ফুয়াদের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়। ছাত্রদলের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার শর্তে তাকে সিট দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলে তিনি তাতে সম্মত হন। সোমবার রাতে ফুয়াদের কক্ষে গেলে ছাত্রদলের একটি দলীয় গ্রুপে যুক্ত করার অজুহাতে তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনটি নেওয়া হয়। এরপর ফোনের মেসেজ ও কললিস্ট পরীক্ষা করে তাকে ‘শিবিরের স্পাই’ আখ্যা দেওয়া হয়। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করলেও তাকে টেনে গণরুমে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা দফায় দফায় তার ওপর শারীরিক নির্যাতন চালান। জোরপূর্বক তার মোবাইল দিয়ে ভিডিও ধারণ এবং লিখিত স্বীকারোক্তিসহ সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগও করেছেন ওই শিক্ষার্থী। বর্তমানে তিনি চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কে ভুগছেন জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষকদের কাছে জীবনের নিরাপত্তা এবং সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
তবে শারীরিক হেনস্তার অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন শহীদ শামসুজ্জোহা হল শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মেহেদী হাসান ফুয়াদ। তার দাবি, আসিফ গত তিন মাস ধরে অবৈধভাবে হলে অবস্থান করছিলেন। সিট বাতিলের পর তিনি নিজে থেকেই ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত হতে চান। কিন্তু দলীয় গ্রুপে যুক্ত করতে গিয়ে তার ফোনে হল শাখা শিবিরের সভাপতির সঙ্গে কথোপকথন পাওয়া যায়। ফুয়াদের অভিযোগ, আসিফ ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ তথ্য ও প্রশাসনের কথোপকথন রেকর্ড করে শিবিরের কাছে পাচারের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তাকে কোনো মারধর না করে প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহীও জানান, বিষয়টি জানার পর কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা যেন না ঘটে সেই নির্দেশ দিয়ে শিক্ষার্থীকে প্রাধ্যক্ষের হেফাজতে দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ঘটনাটির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগ, দোষীদের শাস্তি, ভুক্তভোগীর চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ চার দফা দাবিতে উপাচার্যের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ইসলামী ছাত্রশিবির। শাখা শিবিরের সাধারণ সম্পাদক হাফেজ মেহেদী হাসান জানান, ওই শিক্ষার্থীর সঙ্গে তাদের কোনো সাংগঠনিক সম্পর্ক নেই; সিটের প্রয়োজনে তিনি সবার সঙ্গেই যোগাযোগ করেছিলেন। এছাড়া ছাত্রশিবিরের ওয়েলফেয়ার ভবনে অসচ্ছল সাধারণ শিক্ষার্থীরা থাকে বিধায় সেখানে কারো থাকা মানেই শিবির করা নয়।
এ বিষয়ে শহীদ শামসুজ্জোহা হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক আল আমিন সরকার জানান, গভীর রাতে খবর পেয়ে তিনি হলে যান এবং পরিস্থিতি শান্ত করতে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বসেন। তখন ওই শিক্ষার্থী তার সামনে মারধরের কোনো কথা জানাননি। ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে শিক্ষার্থীর ফোনটি প্রাধ্যক্ষের কার্যালয়ে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মামুনুর রশীদ জানিয়েছেন, প্রশাসন শিক্ষার্থী ও প্রাধ্যক্ষ উভয়ের মাধ্যমেই পরিস্থিতির খোঁজখবর রাখছে। গভীর রাতের এ ঘটনায় প্রকৃত সত্য উদঘাটনে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য বিস্তারিত শুনে একটি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যথাযথ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।