বাঘার চকরাজাপুরে প্রশংসিত আনসারদের মানবিক উদ্যোগ
পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার নদীবেষ্টিত দুর্গম চরাঞ্চলের জনজীবন। চরম খাদ্য সংকট, বিশুদ্ধ পানির অভাব ও পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাবের মুখে থাকা চকরাজাপুর ইউনিয়নের দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপির স্থানীয় নেতৃত্ব। শনিবার দিনব্যাপী ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল ও প্লাবিত বিভিন্ন এলাকায় নিজ অর্থায়নে সংগৃহীত জরুরি খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছে দিয়েছেন উপজেলা আনসার কোম্পানি কমান্ডার আব্দুস সাত্তার।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মৌসুমী বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলে চকরাজাপুর চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে বহু পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। গ্রামীণ রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং চুলা জ্বালানোর মতো শুকনা জায়গার অভাবে তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সকালে উপজেলা কোম্পানি কমান্ডার আব্দুস সাত্তারের নেতৃত্বে আনসার ও ভিডিপি সদস্যদের একটি মানবিক দল ইঞ্জিনচালিত নৌকাযোগে দুর্গম চরে পৌঁছায়। পরবর্তীতে নৌকা চলাচল অনুপযোগী স্থানে সদস্যরা নিজেরাই হাঁটু ও কোমরসমান পানিতে নেমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভুক্ত ও অসহায় বানভাসিদের হাতে খাদ্য সহায়তা তুলে দেন।
বিতরণকৃত জরুরি সহায়তা প্যাকেটের মধ্যে ছিল পুষ্টিকর শুকনো খাবার হিসেবে চিড়া, মুড়ি, আখের গুড়, ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতা প্রতিরোধে খাবার স্যালাইন, প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং পানিবাহিত রোগ থেকে সুরক্ষার লক্ষ্যে বোতলজাত বিশুদ্ধ খাবার পানি। পানির ভেতর দাঁড়িয়ে সরাসরি এই সহায়তা পেয়ে অনেক প্রবীণ ও গৃহহীন পরিবারের সদস্যরা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে সরাসরি অংশ নিয়ে মাঠপর্যায়ের সার্বিক সমন্বয় করেন উপজেলা আনসার ও ভিডিপি প্রশিক্ষক সোহেল রানা। এ সময় ইউনিয়ন আনসার প্লাটুন কমান্ডার সাইফুল ইসলাম এবং ভিডিপি সদস্য সোহাগ, শিমুল, সিয়াম, শুক চাঁদ, আব্দুস সালাম ও সেলিনা খাতুনসহ স্থানীয় সদস্যরা খাদ্যসামগ্রী বিলিবণ্টনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
ত্রাণ বিতরণের পাশাপাশি আনসার সদস্যরা দুর্গত পরিবারের সদস্যদের বর্তমান দুর্দশা ও সমস্যার কথা মনোযোগ সহকারে শোনেন। চরাঞ্চলের বাসিন্দারা জানান, বন্যার পানিতে তাঁদের গৃহপালিত পশু ও ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ব্যক্তিগত ও বিচ্ছিন্নভাবে পাওয়া সহায়তা তাৎক্ষণিক সংকট মেটাতে সাহায্য করলেও বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যার তুলনায় তা অত্যন্ত অপ্রতুল। পানি দ্রুত না নামলে খাদ্য ও স্বাস্থ্যঝুঁকি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে উল্লেখ করে দুর্গতরা অবিলম্বে চরাঞ্চলের প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত সরকারি চাল, অর্থ ও গো-খাদ্য বরাদ্দের দাবি জানান।
উপজেলা আনসার কোম্পানি কমান্ডার আব্দুস সাত্তার জানান, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী সর্বদা দেশ ও জনগণের নিরাপত্তা ও সেবায় অঙ্গীকারাবদ্ধ। উর্দিধারী দায়িত্বের বাইরেও একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে বিপন্ন প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ানো নৈতিক দায়িত্ব। চরাঞ্চলের মানুষের দুর্দশা দেখে তিনি ব্যক্তিগত সামর্থ্য অনুযায়ী এই সামান্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন এবং সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তি ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনকে পদ্মার চরের এই নিঃস্ব বানভাসিদের সহায়তায় দ্রুত এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। প্রতিকূল আবহাওয়া ও জলমগ্নতার ঝুঁকি উপেক্ষা করে প্রান্তিক পর্যায়ে আনসার সদস্যদের এমন নিবেদিতপ্রাণ মানবিক কার্যক্রম চরাঞ্চলের সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে।