৬১ লাখ টাকার হিসাব এবং জিএসের বক্তব্য ঘিরে নতুন আলোচনা
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) বিভিন্ন কর্মসূচির ব্যয় এবং বিল-ভাউচার জমা দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে ক্যাম্পাসে নতুন করে আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে। কোষাধ্যক্ষ কার্যালয়ের ব্যয়-সংক্রান্ত নথি প্রকাশের পর এই আলোচনার সূত্রপাত হয়। এর মধ্যেই সংবাদ প্রকাশের প্রতিক্রিয়ায় সাংবাদিকদের উদ্দেশে কুরুচিপূর্ণ ভাষা ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে রাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাউদ্দিন আম্মারের বিরুদ্ধে।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া পোস্ট এবং স্থানীয় গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকারে তিনি প্রকাশিত প্রতিবেদন নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানান। তাঁর বক্তব্যে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকের উদ্দেশে অবমাননাকর মন্তব্য করার অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয় একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আম্মার দাবি করেন, যে সাংবাদিক প্রতিবেদনটি করেছেন, তাঁকে কোষাধ্যক্ষ কার্যালয়ে নিয়ে গেলে সেখানে উত্তোলন করা অর্থের প্রকৃত তথ্য দেখা যাবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কোষাধ্যক্ষ কার্যালয়ের তথ্যের সঙ্গে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যের মিল নেই।
অন্য একটি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ভাউচার জমা না পড়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে রাকসুর অর্থ ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব কার্যবর্ষ শেষে এবং নিরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পরই স্পষ্ট হবে বলে তিনি দাবি করেন।
এর আগে একটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে শেয়ার করে সাংবাদিকদের উদ্দেশে আপত্তিকর মন্তব্য করেন আম্মার। পরবর্তী এক পোস্টে রাকসুর তহবিলের অর্থ নিয়ে বিভিন্ন নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন তিনি। একই সঙ্গে রাকসুর মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্টদের হিসাব জনসম্মure উপস্থাপন করা হবে বলেও জানান।
ব্যয়ের হিসাব ও বিল-ভাউচারের বর্তমান চিত্র:-
গণমাধ্যমে প্রকাশিত রাকসুর কোষাধ্যক্ষ কার্যালয়ের ব্যয়-সংক্রান্ত নথির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান কার্যবর্ষে ৪২টি কর্মসূচির জন্য রাকসুর তহবিল থেকে মোট ১ কোটি ২৯ লাখ ১৪ হাজার ৬৮৯ টাকা বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৬১ লাখ ৫০ হাজার ৪৬৮ টাকার বিল-ভাউচার এখনো জমা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নথি অনুযায়ী, রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মারের নামে সাত ধাপে মোট ২৩ লাখ ৮৮ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫ লাখ ৪৯ হাজার টাকার ব্যয়ের বিল-ভাউচার জমা দেওয়া হয়েছে। বাকি ১৮ লাখ ৩৯ হাজার টাকার ব্যয়ের ভাউচার জমা না পড়ায় ওই অর্থের ব্যয়সংক্রান্ত নথি এখনো অসম্পূর্ণ রয়েছে।
তবে কোনো অর্থের ভাউচার এখনো জমা না পড়া এবং সেই অর্থ আত্মসাৎ বা অনিয়ম হয়েছে-দুটি বিষয়কে একই অর্থে দেখার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট কর্মসূচি চলমান থাকলে বা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হিসাব দাখিল না হলে সাময়িকভাবে ভাউচার অনুপস্থিত থাকতে পারে। অর্থের প্রকৃত ব্যবহার ও কোনো আর্থিক অনিয়ম হয়েছে কি না, তা নির্ধারণে পূর্ণাঙ্গ হিসাব ও নিরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাকসুর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও আর্থিক পর্যালোচনা:-
প্রকাশিত প্রতিবেদন নিয়ে রাকসুর পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে একটি বিবৃতি পাঠানো হয়। সেখানে বলা হয়, দায়িত্ব গ্রহণের পর রাকসুর আর্থিক কার্যক্রম পর্যালোচনার জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। রাকসুর দাবি, ওই কমিটির পর্যালোচনায় তহবিলে প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ টাকার হিসাব পাওয়া যায়। এর মধ্যে প্রায় ২ কোটি টাকা ফিক্সড ডিপোজিট রিসিপ্টের (এফডিআর) মাধ্যমে সংরক্ষণ এবং অবশিষ্ট প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা বর্তমান কার্যবর্ষে শিক্ষার্থীদের কল্যাণমূলক বিভিন্ন কর্মসূচিতে ব্যয়ের সুযোগ রাখার বিষয়ে রাকসুর অধিবেশনে এজেন্ডা গৃহীত হয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, শিক্ষার্থী কল্যাণমূলক কার্যক্রমে ব্যয় করা অর্থের যথাযথ হিসাব কার্যবর্ষ শেষে সরকারি অডিটের আওতায় আসবে। রাকসুর দাবি, কার্যবর্ষ এখনো শেষ হয়নি এবং বিভিন্ন বিভাগের একাধিক কর্মসূচিও চলমান রয়েছে। ফলে পূর্ণাঙ্গ হিসাব-নিকাশ ও সরকারি নিরীক্ষা শেষ হওয়ার আগেই কিছু ক্ষেত্রে আংশিক তথ্যের ভিত্তিতে আর্থিক কার্যক্রম নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করা হচ্ছে।
স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ভবিষ্যতের প্রত্যাশা:-
রাকসুর তহবিলের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে বিল-ভাউচার একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি। কোনো কর্মসূচির জন্য অর্থ উত্তোলনের পর সেই অর্থ কোন খাতে, কত টাকা এবং কী উদ্দেশ্যে ব্যয় হয়েছে, তার প্রমাণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র সংরক্ষণ ও দাখিল করা প্রয়োজন। এ কারণে ৬১ লাখ ৫০ হাজার ৪৬৮ টাকার ভাউচার এখনো জমা না পড়ার তথ্যটি স্বাভাবিকভাবেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে জিএসের নামে উত্তোলন করা ২৩ লাখ টাকার মধ্যে বড় একটি অংশের ভাউচার না থাকার বিষয়টি আলাদা করে আলোচনায় এসেছে।
তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সংশ্লিষ্ট সব নথি, কর্মসূচির বাস্তবায়ন অবস্থা, অর্থ উত্তোলনের তারিখ, ব্যয়ের সময়সীমা এবং পরবর্তী সময়ে জমা দেওয়া ভাউচার যাচাই করা প্রয়োজন। সরকারি অডিট বা স্বাধীন আর্থিক পর্যালোচনার ফলাফল এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আর্থিক হিসাব নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি সংবাদ প্রকাশের প্রতিক্রিয়ায় রাকসু জিএসের বক্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ভাষা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। একজন নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের সঙ্গে দ্বিমত থাকলে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে প্রতিবাদ, সংশোধনী দাবি বা আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সব মিলিয়ে, রাকসুর বর্তমান কার্যবর্ষ শেষ হওয়ার পর আয়-ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব, সংশ্লিষ্ট বিল-ভাউচার এবং সরকারি অডিটের ফলাফল প্রকাশ করা হলে আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলোর অনেকটাই পরিষ্কার হতে পারে। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে মূল বিষয়টি হলো, রাকসুর তহবিল থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বিভিন্ন কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ ও উত্তোলন করা হলেও এর একটি অংশের বিল-ভাউচার এখনো নথিতে জমা হয়নি। ফলে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে না গিয়ে সংশ্লিষ্ট নথি, ভাউচার ও নিরীক্ষা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিষয়টি মূল্যায়ন করাই সবচেয়ে যুক্তিসংগত।