কন্যাশিশুর নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিতে জিরো টলারেন্স নীতি কার্যকরের আহ্বান রাষ্ট্রপতির
বিদ্যালয়ে যাতায়াতের পথ থেকে শুরু করে শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ এবং ডিজিটাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সব পরিসরে কন্যাশিশুর পরিপূর্ণ নিরাপত্তা, সমান অধিকার ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিতের নির্দেশ দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। একই সঙ্গে নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি যেকোনো ধরনের সহিংসতা, ধর্ষণ ও যৌন হয়রানি রোধে জিরো টলারেন্স নীতির কঠোর ও আপসহীন বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ জোর দেন তিনি।
সোমবার আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস উপলক্ষে রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু একাডেমি মিলনায়তনে আয়োজিত এক বিশেষ আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং ন্যাশনাল গার্ল চাইল্ড অ্যাডভোকেসি ফোরামের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন।
রাষ্ট্রপতি তাঁর বক্তব্যে বলেন, নারী ও শিশুর প্রতি যেকোনো নির্যাতন ও অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত তদন্ত, নিরপেক্ষ বিচার এবং আইনের কঠোরতম প্রয়োগ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। কন্যাশিশুর সার্বিক কল্যাণে সমাজের প্রচলিত মনস্তত্ত্ব ও দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তনকে সবচেয়ে জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, কন্যাশিশুর জন্ম কোনো বোঝা নয়, বরং এটি একটি পরিবারের জন্য অফুরন্ত সম্ভাবনার সূচনা। কন্যাসন্তানের শিক্ষা কোনো অনুকম্পা নয়, এটি তার জন্মগত মৌলিক অধিকার; আর তার সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের পবিত্র দায়িত্ব। দুই কন্যাসন্তানের পিতা হিসেবে তিনি প্রতিটি কন্যাশিশুর মাঝে নিজের সন্তানদের মুখ দেখতে পান উল্লেখ করে বলেন, কন্যাশিশুর অধিকার ও সুরক্ষার বিষয়টি কেবল সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বই নয়, এটি গভীর আত্মিক মমতারও বিষয়।
শিক্ষা, চিকিৎসাসেবা, ক্রীড়াঙ্গন, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, গণমাধ্যম, ব্যবসা-বাণিজ্য ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসনসহ সর্বক্ষেত্রে বাংলাদেশের নারীদের অনন্য সাফল্যের প্রশংসা করেন রাষ্ট্রপতি। বিশেষ করে লাল-সবুজের নারী ফুটবল দলের আন্তর্জাতিক অর্জন এবং বাংলাদেশি নারী হিসেবে নিশাত মজুমদারের এভারেস্ট জয়ের গৌরবময় দৃষ্টান্ত তুলে ধরে তিনি বলেন, এই ধারাবাহিক সাফল্য সমগ্র জাতির জন্য গর্বের। অভিভাবকদের উদ্দেশে তিনি আহ্বান জানান, কন্যাসন্তানকে বোঝা না ভেবে তাদের অপার সম্ভাবনা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে এবং বিয়ের যৌতুক বা খরচের চিন্তার পরিবর্তে তাদের সুশিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনে কার্যকর বিনিয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবারে ছেলে ও মেয়েকে সমান মর্যাদা দেওয়ার পাশাপাশি ছেলেদের শৈশব থেকেই নারীদের সম্মান করার শিষ্টাচার শেখানোর পরামর্শ দেন তিনি।
ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রসঙ্গ টেনে রাষ্ট্রপতি স্মরণ করিয়ে দেন, পবিত্র ধর্মগ্রন্থে কন্যাসন্তানকে মহান সৃষ্টিকর্তার বিশেষ নেয়ামত হিসেবে ঘোষণা করা হলেও সমাজে প্রায়শই এই মর্যাদাকে অবমূল্যায়ন করা হয়। সব ধর্মের মৌলিক শিক্ষাই নারী ও কন্যার মর্যাদা সুরক্ষার নির্দেশ দেয়। এ বছরের প্রতিপাদ্য শিশু বিয়ে আর নয়, কন্যা করবে বিশ্বজয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাল্যবিয়ে নিছক একটি পারিবারিক ঘটনা নয়; এটি একটি মেয়ের দুরন্ত শৈশব কেড়ে নেয়, ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবন রুদ্ধ করে এবং তার সুপ্ত সম্ভাবনার নির্মম অপচয় ঘটায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় অকাল মাতৃত্ব, চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি, অর্থনৈতিক পরানির্ভরশীলতা ও আজীবন নির্যাতনের শিকার হওয়ার আশঙ্কা। এ কারণে তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিটি উপজেলায় কিশোরীবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা ও মানসিক পরামর্শ কেন্দ্র নিশ্চিত করার পাশাপাশি জরুরি হেল্পলাইন সেবাগুলোর ব্যাপক প্রচার জরুরি।
কন্যাশিশুদের আত্মবিশ্বাসী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, প্রতিকূলতার মুখে নতি স্বীকার না করে শিক্ষাকে মূল হাতিয়ার হিসেবে আঁকড়ে ধরতে হবে। যেকোনো নির্যাতন বা অন্যায়ের মুখোমুখি হলে শিক্ষক, বিশ্বস্ত অভিভাবক কিংবা আইনি সংস্থাকে নির্ভয়ে অবহিত করার পাশাপাশি নিজেদের শারীরিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে মার্শাল আর্টের মতো আত্মরক্ষামূলক কৌশল শেখার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
নারীশিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রযাত্রার ইতিহাস স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া অবৈতনিক নারীশিক্ষা ও বিশেষ শিক্ষা উপবৃত্তি প্রবর্তন করে দেশে নারী জাগরণে যুগান্তকারী মাইলফলক স্থাপন করেছিলেন। নারীর সামগ্রিক ক্ষমতায়ন ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক সদিচ্ছা অপরিহার্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এ লক্ষ্য অর্জনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন।
আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য প্রদান করেন প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্য সেলিমা রহমান। এ ছাড়া অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন দ্য হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর প্রশান্ত ত্রিপুরা, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. রওশন আরা বেগম এবং এনজিসিএএফের সহসভাপতি শাহীন আক্তার ডলি। এর আগে স্বাগত বক্তব্য রাখেন মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শায়লা শারমিন জামান। অনুষ্ঠানে কন্যাশিশুর সুরক্ষাবিষয়ক একটি তথ্যবহুল প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শিত হয় এবং দুই কন্যাশিশু তাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশা তুলে ধরে।