এআই মানবতার বিরুদ্ধে নয়, কাজে লাগাতে হবে
বিশ্বমঞ্চে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রত্যয় নিয়ে ১৯৪৫ সালে যাত্রা শুরু করলেও আট দশক পর এসে জাতিসংঘের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মাঝে দৃশ্যমান ব্যবধান তৈরি হয়েছে। ফলে সংস্থাটির ওপর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কমে যাওয়া আস্থা পুনরুদ্ধার করাই এক বছরের মেয়াদের প্রধান অগ্রাধিকার বলে ঘোষণা দিয়েছেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বর্তমান সভাপতি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক আয়োজন ‘হাই-লেভেল উইক’ বা উচ্চপর্যায়ের সাধারণ অধিবেশন শুরুর প্রাক্কালে জাতিসংঘের নিজস্ব সংবাদমাধ্যম ‘ইউএন নিউজ’কে দেওয়া এক বিশেষ ও খোলামেলা সাক্ষাৎকারে তিনি এই অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
ড. খলিলুর রহমান স্মরণ করিয়ে দেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ সংঘাতের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে ইয়াল্টা সম্মেলন ও পরবর্তী সময়ে সান ফ্রান্সিসকোতে বিপুল করতালির মধ্য দিয়ে সদস্য রাষ্ট্রগুলো যে গভীর আস্থা নিয়ে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা করেছিল, তার কল্যাণেই বিশ্ব বড় ধরনের সর্বাত্মক যুদ্ধ এড়াতে পেরেছে। পাশাপাশি ঔপনিবেশিক শাসন থেকে বহু দেশের মুক্তি ও বৈশ্বিক উন্নয়ন কাঠামো বিনির্মাণে সংস্থাটি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। তবে একই সঙ্গে অনেক আঞ্চলিক সংঘাত থামাতে না পারা এবং নিরাপত্তা পরিষদের কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে না পারার ব্যর্থতা আন্তর্জাতিক পরিসরে এক ধরনের গভীর হতাশা তৈরি করেছে। এছাড়া শান্তিরক্ষা ও উন্নয়নের পাশাপাশি মানবাধিকার খাতে জাতিসংঘের মোট বাজেটের মাত্র চার শতাংশ বরাদ্দের বিষয়টিও তিনি সামনে আনেন। এই তিন স্তম্ভের কার্যকারিতা বাড়িয়েই বিশ্ববাসীর হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে তিনি দৃঢ় মত প্রকাশ করেন।
সমালোচকদের দৃষ্টিতে সাধারণ পরিষদ কেবলই একটি ‘কথার মঞ্চ’ এবং এর প্রস্তাবগুলোর কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই—এমন মন্তব্যের জোরালো জবাব দেন সভাপতি। তিনি স্পষ্ট করেন, সাধারণ পরিষদ অকার্যকর হলে বিশ্বের শত শত রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান একসঙ্গে একই ছাদের নিচে আসতেন না। এটি এমন এক অনন্য প্ল্যাটফর্ম, যা আনুষ্ঠানিক কূটনীতির বাইরেও নেতাদের জন্য খোলামেলা ও নিরাপদ পরিবেশে পারস্পরিক সংকট সমাধানের পথ তৈরি করে দেয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ ও বৈশ্বিক আচরণবিধি নির্ধারণে সাধারণ পরিষদের নৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব অনস্বীকার্য।
বর্তমান যুগের নতুন সংকট প্রসঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-কে মানবতার জন্য এক ঐতিহাসিক পরীক্ষা হিসেবে অভিহিত করেন ড. খলিলুর রহমান। প্রযুক্তির অগ্রগতিকে কোনোভাবেই স্তব্ধ করা উচিত নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এআই যাতে কেবল মানবকল্যাণেই ব্যবহৃত হয় এবং মানবতার জন্য ধ্বংসের কারণ না হয়ে দাঁড়ায়, সে জন্য রাষ্ট্র, প্রযুক্তি নির্মাতা ও ব্যবহারকারী-সকল পক্ষকে নিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট ও সুরক্ষিত নীতিমালার সীমারেখা এখনই চূড়ান্ত করতে হবে।
রোহিঙ্গা সংকটের ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা থেকে ড. খলিলুর রহমান উল্লেখ করেন, বলপ্রয়োগ বা সহিংসতা কখনো কোনো সংকটের স্থায়ী সমাধান দিতে পারে না; বরং তা সংকটকে আরও গভীর করে তোলে। কেবল আন্তরিক আলোচনা, পারস্পরিক সমঝোতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছাই টেকসই শান্তি বয়ে আনতে পারে। সভাপতির মেয়াদ শেষে নিজের মূল্যায়ন সম্পর্কে তিনি বলেন, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে জাতিসংঘের প্রয়োজনীয় সংস্কার, আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় পর্যায়ে গৃহীত সিদ্ধান্তের দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সামান্য অগ্রগতি আনতে পারলেও নিজের দায়িত্ব সফল হয়েছে বলে মনে করবেন তিনি।