শনিবার , ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হোমআজকের শীর্ষ সংবাদজরাজীর্ণ ছাদ আর ভারপ্রাপ্ত প্রধানের কাঁধে চারঘাটের প্রাথমিক শিক্ষা

জরাজীর্ণ ছাদ আর ভারপ্রাপ্ত প্রধানের কাঁধে চারঘাটের প্রাথমিক শিক্ষা

favicon
শাহিনুর সুজন,স্টাফ রিপোর্টার :
জরাজীর্ণ ছাদ আর ভারপ্রাপ্ত প্রধানের কাঁধে চারঘাটের প্রাথমিক শিক্ষা

প্রাথমিক শিক্ষাকে বলা হয় একটি শিশুর সামগ্রিক শিক্ষাজীবনের মজবুত ভিত্তি। তবে রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এখন চরম অনিশ্চয়তা ও বহুমুখী সংকট জেঁকে বসেছে। কোথাও ঝুঁকিপূর্ণ ও জরাজীর্ণ ভবনে চলছে দৈনন্দিন পাঠদান, কোথাও শ্রেণিকক্ষের তীব্র ঘাটতি, আবার কোথাও বছরের পর বছর স্থায়ী প্রধান শিক্ষক না থাকায় ভেঙে পড়ছে প্রাতিষ্ঠানিক চেইন অব কমান্ড। ফলে একদিকে যেমন কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে, অন্যদিকে ব্যাহত হচ্ছে সার্বিক শিক্ষা কার্যক্রম ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা।

উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চারঘাটে মোট ৭৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ২৬টি বিদ্যালয়ের ভবন দীর্ঘদিন আগেই আনুষ্ঠানিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি ৭৩টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৪৫টিতেই বর্তমানে কোনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই। নিয়মিত পদায়ন বা পদোন্নতি না থাকায় সহকারী শিক্ষকদের ওপর ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের অতিরিক্ত দায়িত্ব চাপিয়ে কোনোমতে দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক কাজ সচল রাখা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ২৬টি ভবন অপসারণ ও পুনর্নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন দপ্তরে তালিকা পাঠানো হলেও বাস্তবে তার কোনো কার্যকর সমাধান মেলেনি।

সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, উপজেলার শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নে পরিকল্পনার সুস্পষ্ট ঘাটতি রয়েছে। যেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম, সেখানে নতুন বহুতল ভবন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অথচ দুই শতাধিক শিক্ষার্থী থাকা বিদ্যালয়গুলোতে জরাজীর্ণ তিনটি কক্ষে গাদাগাদি করে ক্লাস নিতে হচ্ছে। চিহ্নিত ২৬টি ভবনের অধিকাংশকেই স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) পাঁচ থেকে দশ বছর আগে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করলেও কোনো বিকল্প অবকাঠামো তৈরি করা হয়নি।

১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হাবিবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একতলা ভবনটি ১৯৯৩ সালে নির্মিত হয় এবং ২০১৮ সালে এটি পরিত্যক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষিত হয়। বর্তমানে ২১৮ জন শিক্ষার্থীর জন্য সেখানে ব্যবহারযোগ্য শ্রেণিকক্ষ রয়েছে মাত্র তিনটি। আসবাবপত্রের চরম সংকটের কারণে ভাঙাচোরা মাত্র ১৭ সেট বেঞ্চে চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। অতীতে ক্লাস চলাকালীন ছাদের রডসহ ফ্যান ছিঁড়ে পড়ে শিক্ষিকা আহত হওয়ার নজিরও রয়েছে এখানে।

অনুরূপ চিত্র দেখা গেছে ধর্মহাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখানে দুই শতাধিক শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে মাত্র তিনটি কক্ষ। প্রায় এক দশক আগে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষিত ভবনটির ছাদে বিপজ্জনক ফাটল ধরেছে, মেঝেতে মাটি তুলে বাসা বেঁধেছে উইপোকা। আকস্মিক ছাদের ঢালাই ও পলেস্তারা খসে পড়ার শঙ্কায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রতিনিয়ত আতঙ্কের মধ্যে পাঠদান চালিয়ে যেতে হচ্ছে। একই ধরনের করুণ দশা খোর্দগোবিন্দপুর, ভাটপাড়া, ইউসুফপুর ও মেরামতপুরসহ তালিকাভুক্ত ২৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।

অবকাঠামোগত সংকটের সঙ্গে প্রশাসনিক নেতৃত্বহীনতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ৪৫টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকায় ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া সহকারী শিক্ষকরা নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত থাকছেন। এতে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা যেমন কঠিন হয়ে পড়ছে, তেমনি তদারকির অভাবে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি। ফলে প্রান্তিক ও নিম্নবিত্ত পরিবারের যেসব শিক্ষার্থী পুরোপুরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ওপর নির্ভরশীল, তাদের শিখন ঘাটতি ক্রমেই বাড়ছে। আর্থিক সামর্থ্যবান অভিভাবকরা বাধ্য হয়ে সন্তানদের বেসরকারি কিন্ডারগার্টেনে স্থানান্তর করায় সরকারি স্কুলগুলো ধীরে ধীরে শিক্ষার্থী হারাচ্ছে।

চারঘাট উপজেলা শিক্ষা কার্যালয় জানিয়েছে, মামলাসংক্রান্ত জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রধান শিক্ষকের পদগুলো এতদিন শূন্য ছিল, যা দ্রুত নিরসনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কাজ করছে। একইসঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং বরাদ্দ সাপেক্ষে দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

জরাজীর্ণ ছাদ আর ভারপ্রাপ্ত প্রধানের কাঁধে চারঘাটের প্রাথমিক শিক্ষা
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দৈনিক উপচার
 শনিবার , ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হোমআজকের শীর্ষ সংবাদজরাজীর্ণ ছাদ আর ভারপ্রাপ্ত প্রধানের কাঁধে চারঘাটের প্রাথমিক শিক্ষা

জরাজীর্ণ ছাদ আর ভারপ্রাপ্ত প্রধানের কাঁধে চারঘাটের প্রাথমিক শিক্ষা

favicon
শাহিনুর সুজন,স্টাফ রিপোর্টার :
জরাজীর্ণ ছাদ আর ভারপ্রাপ্ত প্রধানের কাঁধে চারঘাটের প্রাথমিক শিক্ষা

প্রাথমিক শিক্ষাকে বলা হয় একটি শিশুর সামগ্রিক শিক্ষাজীবনের মজবুত ভিত্তি। তবে রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এখন চরম অনিশ্চয়তা ও বহুমুখী সংকট জেঁকে বসেছে। কোথাও ঝুঁকিপূর্ণ ও জরাজীর্ণ ভবনে চলছে দৈনন্দিন পাঠদান, কোথাও শ্রেণিকক্ষের তীব্র ঘাটতি, আবার কোথাও বছরের পর বছর স্থায়ী প্রধান শিক্ষক না থাকায় ভেঙে পড়ছে প্রাতিষ্ঠানিক চেইন অব কমান্ড। ফলে একদিকে যেমন কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে, অন্যদিকে ব্যাহত হচ্ছে সার্বিক শিক্ষা কার্যক্রম ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা।

উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চারঘাটে মোট ৭৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ২৬টি বিদ্যালয়ের ভবন দীর্ঘদিন আগেই আনুষ্ঠানিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি ৭৩টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৪৫টিতেই বর্তমানে কোনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই। নিয়মিত পদায়ন বা পদোন্নতি না থাকায় সহকারী শিক্ষকদের ওপর ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের অতিরিক্ত দায়িত্ব চাপিয়ে কোনোমতে দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক কাজ সচল রাখা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ২৬টি ভবন অপসারণ ও পুনর্নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন দপ্তরে তালিকা পাঠানো হলেও বাস্তবে তার কোনো কার্যকর সমাধান মেলেনি।

সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, উপজেলার শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নে পরিকল্পনার সুস্পষ্ট ঘাটতি রয়েছে। যেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম, সেখানে নতুন বহুতল ভবন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অথচ দুই শতাধিক শিক্ষার্থী থাকা বিদ্যালয়গুলোতে জরাজীর্ণ তিনটি কক্ষে গাদাগাদি করে ক্লাস নিতে হচ্ছে। চিহ্নিত ২৬টি ভবনের অধিকাংশকেই স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) পাঁচ থেকে দশ বছর আগে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করলেও কোনো বিকল্প অবকাঠামো তৈরি করা হয়নি।

১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হাবিবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একতলা ভবনটি ১৯৯৩ সালে নির্মিত হয় এবং ২০১৮ সালে এটি পরিত্যক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষিত হয়। বর্তমানে ২১৮ জন শিক্ষার্থীর জন্য সেখানে ব্যবহারযোগ্য শ্রেণিকক্ষ রয়েছে মাত্র তিনটি। আসবাবপত্রের চরম সংকটের কারণে ভাঙাচোরা মাত্র ১৭ সেট বেঞ্চে চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। অতীতে ক্লাস চলাকালীন ছাদের রডসহ ফ্যান ছিঁড়ে পড়ে শিক্ষিকা আহত হওয়ার নজিরও রয়েছে এখানে।

অনুরূপ চিত্র দেখা গেছে ধর্মহাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখানে দুই শতাধিক শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে মাত্র তিনটি কক্ষ। প্রায় এক দশক আগে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষিত ভবনটির ছাদে বিপজ্জনক ফাটল ধরেছে, মেঝেতে মাটি তুলে বাসা বেঁধেছে উইপোকা। আকস্মিক ছাদের ঢালাই ও পলেস্তারা খসে পড়ার শঙ্কায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রতিনিয়ত আতঙ্কের মধ্যে পাঠদান চালিয়ে যেতে হচ্ছে। একই ধরনের করুণ দশা খোর্দগোবিন্দপুর, ভাটপাড়া, ইউসুফপুর ও মেরামতপুরসহ তালিকাভুক্ত ২৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।

অবকাঠামোগত সংকটের সঙ্গে প্রশাসনিক নেতৃত্বহীনতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ৪৫টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকায় ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া সহকারী শিক্ষকরা নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত থাকছেন। এতে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা যেমন কঠিন হয়ে পড়ছে, তেমনি তদারকির অভাবে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি। ফলে প্রান্তিক ও নিম্নবিত্ত পরিবারের যেসব শিক্ষার্থী পুরোপুরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ওপর নির্ভরশীল, তাদের শিখন ঘাটতি ক্রমেই বাড়ছে। আর্থিক সামর্থ্যবান অভিভাবকরা বাধ্য হয়ে সন্তানদের বেসরকারি কিন্ডারগার্টেনে স্থানান্তর করায় সরকারি স্কুলগুলো ধীরে ধীরে শিক্ষার্থী হারাচ্ছে।

চারঘাট উপজেলা শিক্ষা কার্যালয় জানিয়েছে, মামলাসংক্রান্ত জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রধান শিক্ষকের পদগুলো এতদিন শূন্য ছিল, যা দ্রুত নিরসনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কাজ করছে। একইসঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং বরাদ্দ সাপেক্ষে দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

জরাজীর্ণ ছাদ আর ভারপ্রাপ্ত প্রধানের কাঁধে চারঘাটের প্রাথমিক শিক্ষা
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬