নিয়মিত অপরাধ দমন বনাম রাজনৈতিক নাশকতা
হত্যা, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির মতো প্রথাগত অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি হঠাৎ গজিয়ে ওঠা রাজনৈতিক ঝটিকা মিছিল প্রতিরোধে নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে পুলিশ বাহিনী। বিশেষ করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের আকস্মিক রাজনৈতিক তৎপরতা দমন, আগাম গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং ব্যর্থতার ক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সরাসরি জবাবদিহিতার আওতায় আনার কঠোর নির্দেশনায় মাঠ পুলিশে এক ধরনের বাড়তি সতর্কতা ও তৎপরতা তৈরি হয়েছে। রাজধানীর গুলশানে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক একটি ঝটিকা মিছিলের ঘটনায় গোয়েন্দা ঘাটতির প্রশ্ন তুলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ডিসি ও ওসির প্রত্যাহারের পর এই বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে। এর মধ্যেই বাংলাদেশ পুলিশের উচ্চপর্যায়ে ডিআইজি ও অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি ও বড় ধরনের রদবদল আনা হয়েছে।
তবে মাঠপর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা এই পরিস্থিতিকে ‘চাপ’ হিসেবে মানতে নারাজ। তাদের দাবি, পেশাগত জীবনে এ ধরনের বহুমুখী প্রতিকূলতা নতুন কিছু নয়, বরং এটিকে পেশাগত নিয়মিত ‘চ্যালেঞ্জ’ হিসেবেই গ্রহণ করছেন তারা। তবে মাঠের বাস্তবতায় কিছু কাঠামোগত সংকট এখনো দৃশ্যমান। বিশেষ করে থানাগুলোতে জনবলের স্বল্পতা, ডিউটির বহুমুখিতা এবং ঝটিকা কর্মসূচির সুনির্দিষ্ট আগাম তথ্যের অভাব পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। একটি থানার মোট জনবলের বড় অংশই আদালতে হাজিরা, নাইট ডিউটি, বন্দি পরিবহন কিংবা প্রশাসনিক ছুটিতে নিয়োজিত থাকায় তাৎক্ষণিক কোনো জমায়েত ঠেকাতে পর্যাপ্ত ফোর্স পাওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। দুই-তিন জনের টহল দলের সামনে কয়েক ডজন লোক হঠাৎ এসে দুই-এক মিনিটের মধ্যে স্লোগান দিয়ে সটকে পড়লে শতভাগ প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এ ক্ষেত্রে অপরাধ সংঘটনের আগেই গোয়েন্দা নজরদারি জোরদারের ওপরই সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছেন কর্মকর্তারা। পাশাপাশি বিগত দীর্ঘ সময়ে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে থাকা ব্যক্তিদের মাধ্যমে তথ্য ফাঁসের আশঙ্কার বিষয়টিও অনেকে উড়িয়ে দিচ্ছেন না।
এদিকে ডিএমপির রমনা বিভাগের উপকমিশনার জাহিদুল ইসলাম এবং বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম তালুকদার স্পষ্ট করেছেন, পুলিশের চাকরিটাই আজীবন চ্যালেঞ্জিং এবং যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে বাহিনীর প্রতিটি সদস্য সর্বোচ্চ মনোবলে কাজ করে যাচ্ছে।
পরিস্থিতি পর্যালোচনার অংশ হিসেবে গত ১৪ সেপ্টেম্বর ডিএমপির মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। তিনি মাঠের কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ জবাবদিহিতা নিশ্চিতের নির্দেশ দিয়ে জানান, নিজ এলাকায় নিষিদ্ধ সংগঠনের যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত তৎপরতা রোধে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট অপরাধ বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) দায়ভার নিতে হবে। যেকোনো মূল্যে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ‘শূন্যতা’ দূর করতে সিটিটিসি, ডিবি ও থানা পুলিশকে সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আবাসিক হোটেলগুলোতে নজরদারি এবং রাজধানীর প্রবেশমুখে কঠোর ব্লক চেকের নির্দেশ দেন তিনি।
এদিকে এই সার্বিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি ও ডিআইজি পদমর্যাদার ১১ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে নতুন দায়িত্বে বদলি করা হয়েছে।
আইন ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ২০২৪ সালের আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে পুলিশের ওপর দিয়ে যে মানসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ধকল গেছে, তা কাটিয়ে ওঠার প্রক্রিয়ার মধ্যেই আইনশৃঙ্খলার পুরোনো চ্যালেঞ্জের সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক তৎপরতা সামাল দেওয়ার বাড়তি দায়িত্ব তৈরি হয়েছে। তবে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলমের মতে, পুলিশ বাহিনীর জন্য সংকট বা চাপ নতুন কোনো বিষয় নয়; বরং বাহিনী তার পেশাগত সক্ষমতা ও নিয়মিত নজরদারির মাধ্যমেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হবে।