তদন্ত সংস্থা বদলালেও দুই বছরে মেলেনি বিচার
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারের কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মাসুদ হত্যাকাণ্ডের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার তদন্তে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। দীর্ঘ এ সময়ে হত্যাকাণ্ডে জড়িত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থা। দফায় দফায় তদন্ত কর্মকর্তা ও সংস্থা পরিবর্তন হলেও জড়িতদের শনাক্ত বা আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি জানাতে পারেনি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও হতাশায় দিন কাটাচ্ছে নিহতের পরিবার।
২০২৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সদ্যোজাত কন্যাসন্তানের জন্য ওষুধ কিনতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বিনোদপুর বাজারে যান আবদুল্লাহ আল মাসুদ। সেখানে একদল লোক অতর্কিতভাবে তার ওপর নৃশংস হামলা চালায়। গুরুতর আহত ও রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে প্রথমে নগরের বোয়ালিয়া থানায় হস্তান্তর করা হয়। শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু ঘটে। নির্মম এই হত্যাকাণ্ডের চার দিন পর, ১১ সেপ্টেম্বর নিহতের বড় ভাই মো. বেহেস্তি বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে মতিহার থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে মামলাটির তদন্তভার থানা পুলিশ থেকে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) এবং সবশেষে পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
পিবিআই রাজশাহী জেলা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জুন মাসে মামলাটির দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে পিবিআই গ্রহণ করে। তবে তদন্ত শুরুর দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত কাউকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। ঘটনার সময় থানা ও হাসপাতাল প্রাঙ্গণে বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও পিবিআই কর্মকর্তারা বলছেন, কেবল ভিডিও দেখে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া কাউকে সরাসরি অভিযুক্ত করা সমীচীন নয়; এর জন্য দীর্ঘ ও নিখুঁত তদন্ত প্রয়োজন। অন্যদিকে তদন্ত প্রক্রিয়ার গোপনীয়তার স্বার্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করতে অপারগতা প্রকাশ করছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা।
এদিকে মামলার অগ্রগতি নিয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা ও নিহতের পরিবারের বক্তব্যে চরম বৈপরীত্য দেখা গেছে। তদন্তকারী পক্ষ থেকে বাদীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের চেষ্টার কথা উল্লেখ করা হলেও মাসুদের পরিবারের দাবি পুরোপুরি ভিন্ন। বর্তমানে একমাত্র কন্যাসন্তানকে নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জে অবস্থানরত মাসুদের স্ত্রী বিউটি আরা বেগম জানান, হত্যাকাণ্ডের পর তদন্ত সংশ্লিষ্টরা মাত্র দুইবার তাদের খোঁজ নিয়েছিলেন, যার সর্বশেষটি ছিল ২০২৫ সালে। এরপর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে মামলার হালনাগাদ কোনো তথ্যই তারা পাননি। কর্তৃপক্ষের এমন নিষ্ক্রিয়তায় ন্যায়বিচার প্রাপ্তির শেষ ভরসাটুকুও হারাতে বসেছেন বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
আবদুল্লাহ আল মাসুদ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সহসম্পাদক ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। এর আগে ২০১৪ সালের এপ্রিলে ক্যাম্পাসে সংঘটিত অপর এক রাজনৈতিক হামলায় তিনি গুরুতর আহত হয়ে গোড়ালির নিচ থেকে ডান পা হারান এবং একটি হাতের রগ কেটে ফেলা হয়। দীর্ঘদিন বেকারত্ব ও কৃত্রিম পায়ে দুঃসহ জীবনযাপনের পর ২০২২ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সুপারিশক্রমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারের স্টোর কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি লাভ করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সেখানেই নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। ২০১৪ সালের বিভীষিকা কাটিয়ে উঠে জীবন নতুন করে শুরু করতে চাইলেও ২০২৪ সালের নৃশংস গণপিটুনি শেষ পর্যন্ত তার জীবনের ইতি টানে। অপরাধীরা এখনও শনাক্ত না হওয়ায় নিহতের পরিবার ও সচেতন মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।