ইউসুফপুর কৃষি উচ্চ বিদ্যালয়ে ইমদাদ সাম্রাজ্য: নিয়োগ জালিয়াতি ও জমি বিক্রির অভিযোগ
রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ইউসুফপুর কৃষি উচ্চ বিদ্যালয়ে বিভিন্ন পদে নিয়োগে চরম স্বজনপ্রীতি, অবৈধভাবে জমি ও গাছ বিক্রি এবং প্রতিষ্ঠানের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক ও আওয়ামী লীগ নেতা ইমদাদুল ইসলামের বিরুদ্ধে দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পুরো প্রতিষ্ঠানে পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ ও একনায়কতন্ত্র কায়েম করার অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের সদস্যরা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০৮ সালে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদানের পর থেকে ২০২৫ সালে অবসরে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটিতে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করেন ইমদাদুল ইসলাম। তিনি চারঘাট উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি এবং আওয়ামী লীগের রাজশাহী জেলা কমিটির শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সরকারদলীয় রাজনৈতিক পরিচয়কে ব্যবহার করে তিনি বিদ্যালয়ের প্রায় আটটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিজের রক্তসম্পর্কীয় ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের নিয়োগ দেন।
বিদ্যালয়ের নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২১ এপ্রিল নিরাপত্তাকর্মী পদে মনোয়ার হোসেন, আয়া পদে দিপ্তী ঘোষ এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মী পদে সাকিব হাসানকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে মনোয়ার ও সাকিব সাবেক প্রধান শিক্ষকের আপন ভাতিজা এবং দিপ্তী ঘোষ তাঁর শাশুড়ির সহপাঠী। এর আগে ২০২১ সালের ১৫ এপ্রিল কম্পিউটার ল্যাব অপারেটর পদে আরেক ভাতিজা তরিকুল ইসলাম তুহিনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এছাড়াও ল্যাব সহকারী পদে ভাগনে শওকত আলী টিংকু, সমপদে সৎ বোন মিরা খাতুন এবং অফিস সহকারী পদে জামাতার ভাই রহিতকে চাকরি দেওয়া হয়।
একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত তাঁর শ্যালক আফরোজ হোসেনের সনদ ও জন্মতারিখ নিয়েও জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে জমা পড়া লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, আফরোজ ১৯৯৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ল্যাব সহকারী থাকাকালে নথিতে জন্মতারিখ উল্লেখ ছিল ১৯৭২ সালের ২ জুলাই। পরবর্তীতে ২০১২ সালে লাইব্রেরিয়ান পদে পদোন্নতি নেওয়ার সময় তিনি ১৯৭০ সালের ১৭ জানুয়ারি জন্মতারিখ উল্লেখ সংবলিত সনদপত্র জমা দেন। অভিযুক্ত আফরোজ হোসেন এটিকে কারিগরি ত্রুটি ও পরবর্তীতে সংশোধন করা হয়েছে বলে দাবি করলেও বিষয়টি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে।
শুধু নিয়োগ দুর্নীতিই নয়, ২০২৩ সালে বিদ্যালয়ের প্রায় সাড়ে পাঁচ শতক জমি ব্যক্তিগত স্বার্থে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যালয়ের সম্পত্তি হস্তান্তরের আইনি সুযোগ না থাকলেও তৎকালীন উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান কাজী মাহমুদুল হাসান মামুনের কাছে তা হস্তান্তর করা হয়। রেজিস্ট্রি দলিলে জমির মূল্য মাত্র তিন লাখ টাকা দেখানো হলেও স্থানীয় বাজার অনুযায়ী এর প্রকৃত মূল্য ১০ লাখ টাকারও বেশি। এই জমি হস্তান্তরের সঙ্গে তৎকালীন বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি আনোয়ার হোসেন ও সাবেক প্রধান শিক্ষক জড়িত থেকে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের মূল্যবান গাছ ও পুরাতন অবকাঠামোর সামগ্রী নিয়মবহির্ভূতভাবে বিক্রির অর্থও কোষাগারে জমা পড়েনি।
বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ৯০ বছর বয়সী আফাজ মন্ডল ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে ইমদাদুল ইসলাম প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যত দলীয় কার্যালয়ে পরিণত করেছিলেন। প্রতিবাদ করলেই হামলা ও মামলার ভয় দেখানো হতো। তাঁর আমলে বিদ্যালয়ের জমি, গাছ বিক্রি ও নিয়োগ বাণিজ্যের সঠিক তদন্ত হলে কোটি কোটি টাকার আর্থিক কেলেঙ্কারি উন্মোচিত হবে।
বিদ্যালয়ের সাবেক অফিস সহায়ক আব্দুল হালিমের হিসাব বিবরণী অনুযায়ী, প্রায় ছয়শত শিক্ষার্থীর এই প্রতিষ্ঠানে ২০০৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের সেশন ফি বাবদ সংগৃহীত এক কোটি ৬০ লাখ টাকা, ভর্তি ফি থেকে প্রাপ্ত ৪৪ লাখ টাকা, হাট ইজারা থেকে আট লাখ টাকা, কেন্দ্র ফি বাবদ ২২ লাখ টাকা এবং সরকারি অনুদানের ১২ লাখ টাকাসহ বিভিন্ন খাতের অর্থ যথাযথ নিয়মে ব্যয় করা হয়নি। এছাড়া বিভিন্ন পদে অবৈধ নিয়োগের মাধ্যমে প্রায় এক কোটি ৯০ লাখ টাকা বাণিজ্য করার অভিযোগও তোলা হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যালয়ের বর্তমান প্রধান শিক্ষক মো. শাহাবুদ্দিন জমি বিক্রির বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, পূর্ববর্তী প্রধান শিক্ষক অবসরে যাওয়ার পূর্বে যাবতীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করে রেখে গেছেন। ফলে আনুষ্ঠানিক অডিট ছাড়া আর্থিক গরমিল সুনির্দিষ্টভাবে নিরূপণ করা সম্ভব নয়। তিনি আত্মীয়দের নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। বিদ্যালয়ের গভর্নিং বডির সভাপতি আল-মামুন জানান, নথিপত্র পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে অভিযুক্ত সাবেক প্রধান শিক্ষক ইমদাদুল ইসলাম আত্মগোপনে থাকায় এবং তাঁর ব্যবহৃত মুঠোফোনে সংযোগ না পাওয়ায় এ বিষয়ে তাঁর সরাসরি বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহল ও অভিভাবকরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন।