নওগাঁয় পরকীয়ার বলি গৃহবধূ মেরিনা
নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলায় পরকীয়া প্রেমের সম্পর্কের জেরে মেরিনা বেগম (৪৫) নামের এক নারীকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর মরদেহ পুড়িয়ে ফেলার রোমহর্ষক ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ। মামলা দায়েরের মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যে এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী সাবেক এক ইউপি সদস্যসহ দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—ধামইরহাট উপজেলার মড়লই গ্রামের মৃত সামসুদ্দীনের ছেলে ও সাবেক ইউপি সদস্য বাবুল হোসেন (৪৯) এবং একই এলাকার মোজাম্মেল হকের ছেলে তারেক রহমান (২১)।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নিহত মেরিনা বেগমের স্বামী ও একমাত্র ছেলে জীবিকার তাগিদে সুদূর কুমিল্লায় অবস্থান করতেন। পরিবারের এই অনুপস্থিতির সুযোগে স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য বাবুল হোসেনের সঙ্গে মেরিনার পরকীয়া প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্কটি গভীর হলেও তা জটিল আকার ধারণ করে। মেরিনা ওই সাবেক মেম্বারকে বিয়ের জন্য প্রবল চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, বিয়ে না করলে বাবুলের বাড়িতে গিয়ে অবস্থান করবেন অথবা আত্মহত্যার পথ বেছে নেবেন। এই পরিস্থিতিতে সামাজিক ও পারিবারিক বিপাকে পড়ে বাবুল ওই নারীকে স্থায়ীভাবে সরিয়ে দেওয়ার এক ভয়ংকর পরিকল্পনা করেন।
পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী, গত ১৬ আগস্ট মেরিনাকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে কৌশলে বাড়ি থেকে ডেকে আনা হয়। সাহাপুর বাজার থেকে আসামিরা তাকে আগ্রাদ্বিগুন বাজারে নিয়ে যান। সেখানে পৌঁছানোর পর মূল পরিকল্পনাকারী বাবুল পেট্রোল কেনেন। পরে রাত ১০টার দিকে স্থানীয় অর্জুনপুর এলাকার একটি নির্জন আমবাগানের ভেতরে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সহযোগী তারেকের কোমরের বেল্ট খুলে মেরিনার গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে তার নিশ্চিত মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের পর অপরাধের সমস্ত আলামত ও পরিচয় পুরোপুরি মুছে ফেলতে নিহতের মরদেহে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পাশবিক এই হত্যাকাণ্ডের পর ভিকটিমের সঙ্গে থাকা নগদ টাকা আসামিরা নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নেন। পরবর্তীতে প্রধান আসামি বাবুল ছাড়া হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া অন্যান্য সহযোগীরা প্রত্যেকে আড়াই হাজার টাকা করে ভাগ পান বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে গত ১৮ আগস্ট সন্ধ্যায় ভালকাডাঙ্গা এলাকার একটি আমবাগান থেকে ওই নারীর আগুনে পোড়া মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। কাকতালীয়ভাবে একই সময়ে নিহতের ছেলে কাউসার আলী তার মাকে নিখোঁজ উল্লেখ করে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে আসেন। পুলিশ তাকে দ্রুত ঘটনাস্থলে নিয়ে গেলে তিনি সেখানে পড়ে থাকা পোড়া লাশ ও প্রসাধনী দেখে সেটি তার মা মেরিনা বেগমের বলে শনাক্ত করেন।
তথ্যপ্রযুক্তির আধুনিক সহায়তা এবং স্থানীয় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ মধ্যরাতের পর বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। পত্নীতলা সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবং ধামইরহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) নেতৃত্বে টানা ৬ থেকে ৭ ঘণ্টার সাঁড়াশি অভিযানে প্রথমে সাবেক মেম্বার বাবুলকে এবং পরবর্তীতে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তারেককে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেছেন। এ সময় তাদের দেখানো মতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বেল্ট ও জুতার ব্যাগ উদ্ধার করা হয়।
এ বিষয়ে নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম জানান, ক্লুলেস এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের রহস্য স্বল্প সময়ের মধ্যেই উদঘাটন করতে সক্ষম হয়েছে জেলা পুলিশ। ঘটনায় সরাসরি জড়িত দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বাকি সহযোগীদের গ্রেফতারেও জোরালো অভিযান অব্যাহত রয়েছে। নওগাঁ জেলায় যেকোনো ধরনের অপরাধ দমনে পুলিশ সর্বদা কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।