চিকিৎসাসংশ্লিষ্টদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা না থাকলে বিদেশমুখিতা কমবে না: প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান: অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও পারস্পরিক আস্থা না থাকলে বিদেশমুখিতা কমবে না
আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল লক্ষ্য কেবল অবকাঠামো ও প্রযুক্তির সম্প্রসারণ নয় বরং উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ, সুশাসন ও সময়োপযোগী নীতির সমন্বয়ের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় সহজলভ্য, সাশ্রয়ী এবং মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা। চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সম্মান না থাকলে যতই অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হোক না কেন, চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখিতা কোনোভাবেই বন্ধ করা সম্ভব হবে না। শনিবার (১৫ আগস্ট) রাজধানীর ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের ভবন-২ এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে লিখিত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উল্লেখ করেন যে, এই নতুন ভবন উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে দেশের আধুনিক ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়ায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জিত হলো। অনুষ্ঠানে তিনি স্মরণ করেন যে, ২০০৬ সালের ২৩ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া এই হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। সময়ের বিবর্তনে এবং ক্রমবর্ধমান চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে হাসপাতালটি আজ কলেবর ও সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে অনেক বড় রূপ লাভ করেছে। তিনি এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী এবং কর্মকর্তাদের আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।
স্নায়ুবিক বা নিউরোলজিক্যাল জটিলতা বিশ্বজুড়ে বর্তমানে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, স্ট্রোক, এপিলেপসি বা খিঁচুনি, পারকিনসন্স ডিজিজ, ডিমেনশিয়া এবং মেরুদণ্ডের জটিল বিভিন্ন রোগের উন্নত চিকিৎসার চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। নতুন ৫০০ শয্যার ভবনটি চালুর ফলে এই ধরনের রোগীদের চিকিৎসার সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। সর্বাধুনিক আইসিইউ, অপারেশন থিয়েটার, ডায়াগনস্টিক সুবিধা এবং বিশেষায়িত ওয়ার্ডসমৃদ্ধ এই ভবনটি কেবল রোগী ভর্তির ধারণক্ষমতাই বাড়াবে না, বরং চিকিৎসা গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও এক বিশাল দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। দেশের সাধারণ মানুষ যেন স্বল্প ব্যয়ে বিশ্বমানের নিউরোচিকিৎসা গ্রহণ করতে পারেন, সেই সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যেই ‘নিউরোসায়েন্স-২’ নির্মাণ করা হয়েছে।
শুধুমাত্র উন্নত প্রযুক্তি থাকলেই একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা পরিপূর্ণ হতে পারে না উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন যে, এর সঙ্গে চিকিৎসকদের মানবিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। প্রযুক্তি কেবল রোগ নির্ণয় করতে পারে, কিন্তু একজন রোগীর মানসিক ভয়, উদ্বেগ ও কষ্ট লাঘব করে তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের মানবিক আচরণের কোনো বিকল্প নেই। রোগীর প্রতি সহানুভূতিশীল মনোভাব, মনোযোগ দিয়ে রোগীর কথা শোনা এবং সম্মানজনক আচরণ চিকিৎসার মানকে বহুলাংশে বৃদ্ধি করে। তবে চিকিৎসার পরিবেশ ও সেবা নির্বিঘ্ন রাখার গুরুদায়িত্ব শুধু চিকিৎসকদের একা নয় বরং চিকিৎসক, রোগী এবং রোগীর উদ্বিগ্ন স্বজন—এই তিন পক্ষের মাঝেই পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও সহানুভূতির নিবিড় সম্পর্ক বজায় থাকা আবশ্যক।
স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে অভিহিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন যে, এটি কেবল নাগরিক অধিকারই নয়, বরং একটি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির মূল চাবিকাঠি। উন্নত চিকিৎসাসেবা যদি কেবল শহরের অভিজাত ও বিত্তবান মানুষের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তাকে কখনোই পূর্ণাঙ্গ আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা বলা যাবে না। প্রত্যন্ত অঞ্চল, দরিদ্র জনগোষ্ঠী এবং সমাজের প্রান্তিক মানুষের কাছেও সাশ্রয়ী ও মানসম্মত চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার নানামুখী কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
গ্রামাঞ্চলের একজন রোগীকে যেন সামান্য চিকিৎসার জন্য প্রচুর অর্থ ও সময় ব্যয় করে রাজধানীতে ছুটে আসতে না হয়, সে জন্য সরকার ই-হেলথ কার্ডের মাধ্যমে একটি আধুনিক রেফারেল ব্যবস্থা চালুর পাশাপাশি চিকিৎসাসুবিধা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে পূর্ণাঙ্গ প্রাইমারি হেলথ কেয়ার ইউনিট প্রতিষ্ঠার কাজ চলছে। পাশাপাশি বর্তমান সরকারের মেয়াদকালেই পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১৫১ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে উন্নীত করা হচ্ছে।
শিশুদের সুস্বাস্থ্য ও শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী জানান যে, একটি সুস্থ আগামী প্রজন্ম গড়ে তোলার লক্ষ্যেই বর্তমান সরকার নতুন শিক্ষা কারিকুলাম প্রণয়ন করছে। শিশুস্বাস্থ্যের উন্নয়নেও বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে, যার অংশ হিসেবে খুলনা, বরিশাল, রংপুর ও রাজশাহী বিভাগ এবং কুমিল্লা জেলায় একটি করে ২০০ শয্যাবিশিষ্ট বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। আগামী অক্টোবর মাসের মধ্যেই একযোগে এই পাঁচটি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল চালুর বিষয়ে সরকার সম্পূর্ণ আশাবাদী।
জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ বরাদ্দ প্রদানের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন যে, সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার কেবল কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা। সরকার দেশে এমন একটি টেকসই ও কার্যকর স্বাস্থ্যকাঠামো গড়ে তুলতে চায়, যেখানে দেশের নাগরিকেরা ঘরের ভেতরেই বিশ্বমানের সব ধরনের স্বাস্থ্যসেবা পেতে পারেন। স্বাস্থ্য খাতের সার্বিক উন্নয়নে সরকার সচেষ্ট থাকলেও চিকিৎসক, গবেষক, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিক ভূমিকার ওপরই এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করছে। অর্থাভাবে দেশের কোনো মানুষ যেন কখনো চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত না হয় এবং কোনো নাগরিককে যেন উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী হতে না হয়, সে লক্ষ্যে একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র বিনির্মাণে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর।