শনিবার , ১১ জুলাই ২০২৬
হোমরাজশাহীরাজশাহীর চারঘাটে কোটি টাকার ডিজিটাল ল্যাব অচল

রাজশাহীর চারঘাটে কোটি টাকার ডিজিটাল ল্যাব অচল

১৮ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিকল ল্যাপটপ, কোথাও ল্যাবে ক্লাস, কোথাও সরঞ্জাম বন্দি আলমারিতে
favicon
শাহিনুর রহমান সুজন (চারঘাট)রাজশাহী :
রাজশাহীর চারঘাটে কোটি টাকার ডিজিটাল ল্যাব অচল


ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থাপন করা হয়েছিল আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব। উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ করে গড়ে তোলা। কিন্তু রাজশাহীর চারঘাট উপজেলায় সেই স্বপ্ন এখন ধুলায় ঢাকা। সরকারি অর্থে স্থাপিত ১৮টি ডিজিটাল ল্যাবের অধিকাংশই অচল হয়ে পড়ে আছে। কোথাও বিকল ল্যাপটপের স্তূপ, কোথাও ল্যাব কক্ষেই চলছে নিয়মিত পাঠদান। আবার কোথাও সরকারি ল্যাপটপ বিদ্যালয়ে না রেখে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত হেফাজতে রাখার অভিযোগ উঠেছে।

সরেজমিনে উপজেলার ১৪টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও চারটি কলেজ ঘুরে দেখা গেছে, কোটি টাকার আইসিটি সরঞ্জামের বড় একটি অংশ বছরের পর বছর ব্যবহারহীন অবস্থায় পড়ে আছে। অধিকাংশ ল্যাপটপ বিকল, প্রজেক্টর ও প্রিন্টার অকেজো, নেই নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ কিংবা প্রশিক্ষিত ল্যাব সহকারী। ফলে হাতে-কলমে কম্পিউটার শিক্ষার পরিবর্তে শিক্ষার্থীরা শুধু পাঠ্যবইয়ের পাতায় আইসিটি বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকছে।

নন্দনগাছী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে ২০২১ সালে স্থাপিত ডিজিটাল ল্যাবের ১৭টি ল্যাপটপের মধ্যে ১৩টিই নষ্ট। ভেঙে গেছে বেশ কয়েকটি চেয়ারও। দীর্ঘদিন ধরে ল্যাবটি কার্যত বন্ধ। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রবিউল ইসলাম বলেন,কম্পিউটার বিষয়ে বই পড়ে পরীক্ষা দিই, কিন্তু কম্পিউটারে কাজ শেখার সুযোগ পাই না।

প্রধান শিক্ষক আসাদুজ্জামান আখন্দ বলেন,প্রতিটি ল্যাপটপের সরকারি মূল্য প্রায় ৭৫ হাজার টাকা ধরা হয়েছিল। কিন্তু নিম্নমানের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করায় অল্প সময়েই অধিকাংশ বিকল হয়ে যায়। বারবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জানিয়েও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা পাইনি।

রায়পুর উচ্চ বিদ্যালয়ের চিত্রও একই। সেখানে বরাদ্দ পাওয়া ১৭টি ল্যাপটপের মধ্যে ১৫টিই নষ্ট। দুটি প্রজেক্টর ও একটি প্রিন্টারও অকেজো হয়ে পড়ে আছে। প্রধান শিক্ষক সাজদার আলী বলেন, ল্যাব সহকারী না থাকায় যন্ত্রপাতির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি। ফলে শিক্ষার্থীরা ব্যবহারিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

একাধিক শিক্ষক জানান, সফটওয়্যার আপডেট, ভাইরাস প্রতিরোধ ও হার্ডওয়্যার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় ধীরে ধীরে অধিকাংশ যন্ত্রপাতিই অচল হয়ে গেছে।

রাওথা কলেজে গিয়ে দেখা যায়, শ্রেণিকক্ষ সংকটের কারণে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে ডিজিটাল ল্যাবটি সাধারণ শ্রেণিকক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ল্যাপটপ, স্ক্যানার, প্রিন্টারসহ অন্যান্য সরঞ্জাম আলমারিতে তুলে রাখা হয়েছে।

কলেজের অধ্যক্ষ নাদের আলী বলেন,শ্রেণিকক্ষের সংকটের কারণে আপাতত ল্যাব ব্যবহার করা যাচ্ছে না। শিক্ষার্থীদের ক্লাসও তো বন্ধ রাখা সম্ভব নয়।

এদিকে বনকিশোর উচ্চ বিদ্যালয় ও সরদহ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, সচল সরকারি ল্যাপটপ বিদ্যালয়ে না রেখে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত হেফাজতে রাখা হয়েছে। সরেজমিন পরিদর্শনের সময় ল্যাবে কয়েকটি ল্যাপটপ পাওয়া যায়নি।

তবে বনকিশোর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মঞ্জুর হোসেন বলেন,ল্যাপটপগুলো ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য নেওয়া হয়নি। মেরামতের জন্য বাইরে পাঠানো হয়েছে।

উপজেলা নাগরিক কমিটির সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন,অনেক প্রতিষ্ঠান শুধু ল্যাব সহকারী নিয়োগের সুযোগ তৈরির জন্য ল্যাব নিয়েছিল। পরে রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায় প্রকল্পটি অকার্যকর হয়ে পড়ে। কোথাও নিয়োগ বাণিজ্য, কোথাও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব সব মিলিয়ে সরকারের কোটি টাকার প্রকল্পের মূল লক্ষ্যই ব্যাহত হয়েছে।

উপজেলা মাধ্যমিক একাডেমিক সুপারভাইজার রাহেদুল ইসলাম বলেন,প্রতিষ্ঠানগুলো লিখিতভাবে অঙ্গীকার করেছিল যে ভবিষ্যতে যন্ত্রপাতি নষ্ট হলে নিজেদের অর্থায়নে মেরামত করবে। সেই অঙ্গীকার কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হবে।

উপজেলা আইসিটি কর্মকর্তা মাহফুজ আরিফিন জানান,উপজেলার ১৮টি ডিজিটাল ল্যাব পরিদর্শন করে নষ্ট যন্ত্রপাতির তালিকা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা পেলেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয়দের মতে, দ্রুত যন্ত্রপাতি মেরামত, দক্ষ ল্যাব সহকারী নিয়োগ এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা না হলে সরকারের কোটি টাকার এই প্রকল্প শুধু অব্যবহৃত সরঞ্জামের স্তূপ হয়েই থাকবে। আর তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার যে লক্ষ্য নিয়ে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবে অধরাই থেকে যাবে।

রাজশাহীর চারঘাটে কোটি টাকার ডিজিটাল ল্যাব অচল
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
১১ জুলাই ২০২৬
দৈনিক উপচার
 শনিবার , ১১ জুলাই ২০২৬
হোমরাজশাহীরাজশাহীর চারঘাটে কোটি টাকার ডিজিটাল ল্যাব অচল

রাজশাহীর চারঘাটে কোটি টাকার ডিজিটাল ল্যাব অচল

১৮ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিকল ল্যাপটপ, কোথাও ল্যাবে ক্লাস, কোথাও সরঞ্জাম বন্দি আলমারিতে
favicon
শাহিনুর রহমান সুজন (চারঘাট)রাজশাহী :
রাজশাহীর চারঘাটে কোটি টাকার ডিজিটাল ল্যাব অচল


ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থাপন করা হয়েছিল আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব। উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ করে গড়ে তোলা। কিন্তু রাজশাহীর চারঘাট উপজেলায় সেই স্বপ্ন এখন ধুলায় ঢাকা। সরকারি অর্থে স্থাপিত ১৮টি ডিজিটাল ল্যাবের অধিকাংশই অচল হয়ে পড়ে আছে। কোথাও বিকল ল্যাপটপের স্তূপ, কোথাও ল্যাব কক্ষেই চলছে নিয়মিত পাঠদান। আবার কোথাও সরকারি ল্যাপটপ বিদ্যালয়ে না রেখে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত হেফাজতে রাখার অভিযোগ উঠেছে।

সরেজমিনে উপজেলার ১৪টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও চারটি কলেজ ঘুরে দেখা গেছে, কোটি টাকার আইসিটি সরঞ্জামের বড় একটি অংশ বছরের পর বছর ব্যবহারহীন অবস্থায় পড়ে আছে। অধিকাংশ ল্যাপটপ বিকল, প্রজেক্টর ও প্রিন্টার অকেজো, নেই নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ কিংবা প্রশিক্ষিত ল্যাব সহকারী। ফলে হাতে-কলমে কম্পিউটার শিক্ষার পরিবর্তে শিক্ষার্থীরা শুধু পাঠ্যবইয়ের পাতায় আইসিটি বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকছে।

নন্দনগাছী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে ২০২১ সালে স্থাপিত ডিজিটাল ল্যাবের ১৭টি ল্যাপটপের মধ্যে ১৩টিই নষ্ট। ভেঙে গেছে বেশ কয়েকটি চেয়ারও। দীর্ঘদিন ধরে ল্যাবটি কার্যত বন্ধ। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রবিউল ইসলাম বলেন,কম্পিউটার বিষয়ে বই পড়ে পরীক্ষা দিই, কিন্তু কম্পিউটারে কাজ শেখার সুযোগ পাই না।

প্রধান শিক্ষক আসাদুজ্জামান আখন্দ বলেন,প্রতিটি ল্যাপটপের সরকারি মূল্য প্রায় ৭৫ হাজার টাকা ধরা হয়েছিল। কিন্তু নিম্নমানের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করায় অল্প সময়েই অধিকাংশ বিকল হয়ে যায়। বারবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জানিয়েও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা পাইনি।

রায়পুর উচ্চ বিদ্যালয়ের চিত্রও একই। সেখানে বরাদ্দ পাওয়া ১৭টি ল্যাপটপের মধ্যে ১৫টিই নষ্ট। দুটি প্রজেক্টর ও একটি প্রিন্টারও অকেজো হয়ে পড়ে আছে। প্রধান শিক্ষক সাজদার আলী বলেন, ল্যাব সহকারী না থাকায় যন্ত্রপাতির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি। ফলে শিক্ষার্থীরা ব্যবহারিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

একাধিক শিক্ষক জানান, সফটওয়্যার আপডেট, ভাইরাস প্রতিরোধ ও হার্ডওয়্যার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় ধীরে ধীরে অধিকাংশ যন্ত্রপাতিই অচল হয়ে গেছে।

রাওথা কলেজে গিয়ে দেখা যায়, শ্রেণিকক্ষ সংকটের কারণে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে ডিজিটাল ল্যাবটি সাধারণ শ্রেণিকক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ল্যাপটপ, স্ক্যানার, প্রিন্টারসহ অন্যান্য সরঞ্জাম আলমারিতে তুলে রাখা হয়েছে।

কলেজের অধ্যক্ষ নাদের আলী বলেন,শ্রেণিকক্ষের সংকটের কারণে আপাতত ল্যাব ব্যবহার করা যাচ্ছে না। শিক্ষার্থীদের ক্লাসও তো বন্ধ রাখা সম্ভব নয়।

এদিকে বনকিশোর উচ্চ বিদ্যালয় ও সরদহ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, সচল সরকারি ল্যাপটপ বিদ্যালয়ে না রেখে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত হেফাজতে রাখা হয়েছে। সরেজমিন পরিদর্শনের সময় ল্যাবে কয়েকটি ল্যাপটপ পাওয়া যায়নি।

তবে বনকিশোর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মঞ্জুর হোসেন বলেন,ল্যাপটপগুলো ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য নেওয়া হয়নি। মেরামতের জন্য বাইরে পাঠানো হয়েছে।

উপজেলা নাগরিক কমিটির সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন,অনেক প্রতিষ্ঠান শুধু ল্যাব সহকারী নিয়োগের সুযোগ তৈরির জন্য ল্যাব নিয়েছিল। পরে রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায় প্রকল্পটি অকার্যকর হয়ে পড়ে। কোথাও নিয়োগ বাণিজ্য, কোথাও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব সব মিলিয়ে সরকারের কোটি টাকার প্রকল্পের মূল লক্ষ্যই ব্যাহত হয়েছে।

উপজেলা মাধ্যমিক একাডেমিক সুপারভাইজার রাহেদুল ইসলাম বলেন,প্রতিষ্ঠানগুলো লিখিতভাবে অঙ্গীকার করেছিল যে ভবিষ্যতে যন্ত্রপাতি নষ্ট হলে নিজেদের অর্থায়নে মেরামত করবে। সেই অঙ্গীকার কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হবে।

উপজেলা আইসিটি কর্মকর্তা মাহফুজ আরিফিন জানান,উপজেলার ১৮টি ডিজিটাল ল্যাব পরিদর্শন করে নষ্ট যন্ত্রপাতির তালিকা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা পেলেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয়দের মতে, দ্রুত যন্ত্রপাতি মেরামত, দক্ষ ল্যাব সহকারী নিয়োগ এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা না হলে সরকারের কোটি টাকার এই প্রকল্প শুধু অব্যবহৃত সরঞ্জামের স্তূপ হয়েই থাকবে। আর তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার যে লক্ষ্য নিয়ে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবে অধরাই থেকে যাবে।

রাজশাহীর চারঘাটে কোটি টাকার ডিজিটাল ল্যাব অচল
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
১১ জুলাই ২০২৬