নওগাঁয় ৬ মাসে ২৫ খুন, বাড়ছে পারিবারিক সহিংসতা
সামাজিক অবক্ষয়, পারিবারিক কলহ, জমিজমা বিরোধ, দেনা-পাওনা, মাদকাসক্তি ও নৈতিক শিক্ষার ঘাটতির কারণে নওগাঁ জেলায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত মাত্র ছয় মাসে জেলাজুড়ে ২৫টি হত্যাকাণ্ড ও লাশ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় অনেক পরিবার হারিয়েছে তাদের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে। ফলে স্বজন হারানোর পাশাপাশি তারা পড়েছে চরম অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ভিনদেশি সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ, নিজস্ব সংস্কৃতির চর্চার অভাব, পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা, নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি, প্রযুক্তির অপব্যবহার, মাদকের বিস্তার এবং তরুণদের বেকারত্ব ও হতাশা সমাজে অপরাধপ্রবণতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। সামান্য বিষয় নিয়েও এখন আপনজনের হাতেই প্রাণ হারাতে হচ্ছে অনেককে।
গত ২৯ জুন মহাদেবপুর উপজেলার ছোট মহেশপুর গ্রামে বৃষ্টির পানি চলাচলকে কেন্দ্র করে ভাতিজার লাঠির আঘাতে নিহত হন চাচা আব্দুল জব্বার (৬৫)। এর একদিন আগে ২৮ জুন নওগাঁ সদরের একটি মাদ্রাসার পাশ থেকে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র আব্দুল্লাহ আল নিরব (১৪)-এর লাশ উদ্ধার করা হয়।
গত ১৭ জুন আত্রাই উপজেলার শাহাগোলা রেললাইনের পাশ থেকে নিখোঁজ শিক্ষক নেয়ামুল বাশির (৫৩)-এর লাশ উদ্ধার করা হয়। তার মৃত্যুতে পরিবারটি এখন চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে। ৮ জুন মান্দা উপজেলায় আম পাড়াকে কেন্দ্র করে মাদক ব্যবসায়ীদের হামলায় নিহত হন তৈয়বুর রহমান মোল্লা (৬৫)। একই উপজেলায় ৭ জুন জমিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে আব্দুল হামিদ (৬৫) নিহত হন। ৩ জুন সাপাহার উপজেলার পুনর্ভবা নদী থেকে নিখোঁজ মানসিক ভারসাম্যহীন কিশোর সিফাতের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
মে ও এপ্রিল মাসেও নওগাঁয় ঘটে বেশ কয়েকটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড। ৭ মে নওগাঁ সদরে বিয়ের মাত্র দেড় মাসের মাথায় যৌতুকের দাবিতে গৃহবধূ ফাল্গুনীকে শ্বাসরোধে হত্যার অভিযোগ ওঠে তার স্বামীর বিরুদ্ধে। ২০ এপ্রিল নিয়ামতপুর উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে একই পরিবারের স্বামী, স্ত্রী ও তাদের দুই শিশুসন্তানসহ চারজনকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় আপন স্বজনদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে।
১ এপ্রিল পোরশা উপজেলার শীতলি ডাঙ্গাপাড়া গ্রামে সামান্য ডিম ভাজাকে কেন্দ্র করে স্বামীর নির্যাতনে মারা যান মরজিনা খাতুন রূপসী (২৬)। তার মৃত্যুর পর ১ থেকে ১১ বছর বয়সী ছয় সন্তানকে নিয়ে পরিবারটি মানবেতর জীবনযাপন করছে।
মার্চ ও ফেব্রুয়ারি মাসেও হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতা থামেনি। ৬ মার্চ আত্রাই উপজেলার বলরামচক গ্রামে এক মাদকাসক্ত যুবক স্ত্রী ও আড়াই বছরের কন্যাসন্তানকে গলা কেটে হত্যার পর আত্মহত্যা করে। ৫ মার্চ মান্দার একটি মাদ্রাসায় চোর সন্দেহে রফিকুল ইসলাম (৪৫) নামের এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে।
এছাড়া ২৫ জানুয়ারি নওগাঁ সদরের বিল ভবানীপুর গ্রামে এক যুবতীর লাশ টয়লেটের সেপটিক ট্যাংক থেকে উদ্ধার করা হয়। ১৮ জানুয়ারি ধামইরহাটে গভীর রাতে ঘরে ঢুকে এক কলেজছাত্রীকে টিউবওয়েলের হাতল দিয়ে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
বদলগাছী মাইলস্টোন হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক আবু জর গিফারী বলেন, অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তরুণদের সম্পৃক্ততা দেখা যাচ্ছে। মাদকাসক্তি, সন্তানদের প্রতি পরিবারের উদাসীনতা এবং শাসনের অভাবে অনেক তরুণ হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। এ সংকট থেকে উত্তরণে পরিবারে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি এবং বিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
নওগাঁ জজকোর্টের আইনজীবী মো. মাহ্ফুজুর রহমান বলেন, সামাজিক অবক্ষয় রোধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব বাড়াতে হবে। মূল্যবোধের শিক্ষা ছাড়া সমাজে অপরাধ কমানো কঠিন বলে মনে করেন তিনি।
নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, অধিকাংশ হত্যাকাণ্ড পারিবারিক সহিংসতা থেকে ঘটছে। ভাই-ভাই বিরোধ, স্বামী-স্ত্রীর কলহ ও জমিজমা সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব থেকেই অনেক অপরাধের সূত্রপাত হচ্ছে। অপরাধীদের গ্রেফতারে পুলিশ কাজ করছে এবং মাদক, বাল্যবিয়ে ও সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
নওগাঁয় একের পর এক হত্যাকাণ্ড সমাজের পারিবারিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র তুলে ধরছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।