রকির মৃত্যুর ঘটনায় আতঙ্কে ছাত্রশূন্য রাজশাহী নার্সিং কলেজ হোস্টেল
চোর সন্দেহে এক যুবককে মারধরের পর মৃত্যুর ঘটনায় রাজশাহী নার্সিং কলেজের ছাত্রাবাস কার্যত ছাত্রশূন্য হয়ে পড়েছে। এ ঘটনায় তিন শিক্ষার্থী গ্রেপ্তারের পর আতঙ্কে অধিকাংশ শিক্ষার্থী হোস্টেল ছেড়ে নিজ নিজ বাড়িতে চলে গেছেন। এতে আসন্ন চূড়ান্ত পরীক্ষা ও ফরম পূরণ কার্যক্রম নিয়েও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
কলেজ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগামী ২২ ডিসেম্বর থেকে রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সব বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ইতোমধ্যে পরীক্ষার ফরম পূরণ কার্যক্রম শুরু হলেও আতঙ্কের কারণে অনেক শিক্ষার্থী কলেজে উপস্থিত হচ্ছেন না। ফলে ফরম পূরণেও বিঘ্ন ঘটছে।
রাজশাহী নার্সিং কলেজে প্রতি শিক্ষাবর্ষে ১০০ জন করে শিক্ষার্থী ভর্তি হন। এর মধ্যে প্রায় ১০ জন ছাত্র এবং বাকিরা ছাত্রী। কলেজ ক্যাম্পাসের হোস্টেলে প্রায় ৭৫০ জন শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা রয়েছে। ছেলেদের ইউনিটে সাধারণত প্রায় অর্ধশত শিক্ষার্থী অবস্থান করেন।
জানা যায়, গত ১৮ জুন সন্ধ্যায় কলেজের ছাত্রাবাসের তৃতীয় তলায় চোর সন্দেহে রাকিবুল হাসান রকি (৩২) নামে এক যুবককে আটক করেন কয়েকজন শিক্ষার্থী। পরে তাকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ছাত্ররাই রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত রাকিবুল হাসান রকি নগরীর হেতেমখাঁ কারিগরপাড়া এলাকার বাসিন্দা।
কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা পাবনা মানসিক হাসপাতাল পরিদর্শনে থাকায় হোস্টেলে উপস্থিত ছিলেন না। ওই সুযোগে রকি ছাত্রাবাসে প্রবেশ করেছিলেন বলে দাবি করা হয়। অন্য বর্ষের কয়েকজন শিক্ষার্থী তাকে আটক করে মারধর করেন। পরে তাকে হোস্টেলের বাইরে বের করে দেওয়া হলে কিছু দূরে গিয়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।
ঘটনার পর নিহতের বোন বাদী হয়ে রাজপাড়া থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে পুলিশ সোয়েব আক্তার শিমু, ফাহিম রেজা ববি ও আতিকুর রহমান নামে তিন শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করে। এরপর থেকেই অন্যান্য শিক্ষার্থীরা আতঙ্কে হোস্টেল ছেড়ে চলে যান।
কলেজ সূত্র জানায়, বর্তমানে শুধু পাবনা সফর থেকে ফেরা তৃতীয় বর্ষের কয়েকজন শিক্ষার্থী হোস্টেলে অবস্থান করছেন। অন্য সব বর্ষের ছাত্ররা হোস্টেল ছেড়ে চলে যাওয়ায় ছাত্রাবাস প্রায় ফাঁকা হয়ে গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, তাঁর ছেলেও ঘটনার পর বাড়ি ফিরে এসেছে। ছেলে দাবি করেছে, সে ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়। তারপরও একজন অভিভাবক হিসেবে তিনি উদ্বিগ্ন। রাজশাহী গিয়ে খোঁজ নিয়ে দেখেছেন, হোস্টেলে প্রায় কোনো শিক্ষার্থী নেই। তিনি বলেন, যারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত, শুধু তাদের বিরুদ্ধেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। নিরপরাধ শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, তা দূর না হলে তাদের পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।
এ বিষয়ে রাজপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, "আমরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তদন্ত করছি। কোনো নিরপরাধ শিক্ষার্থী যেন হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ যাচাই করেই তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কারও বিরুদ্ধে নিশ্চিত প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত তাকে গ্রেপ্তার করা হবে না।"
রাজশাহী নার্সিং কলেজের অধ্যক্ষ ফারজানা পারভিন সাথী বলেন, "ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। সামনে চূড়ান্ত পরীক্ষা, কিন্তু অধিকাংশ ছাত্র হোস্টেলে নেই। আমরা হোস্টেল বন্ধ ঘোষণা করিনি। শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা দূর করে স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে ভাবছি।"
কলেজ সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা ও একাডেমিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি নিরপরাধ শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরাজমান আতঙ্ক দূর করার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।