সোমবার , ২৯ জুন ২০২৬
হোমআজকের শীর্ষ সংবাদবিএমডিএর অবহেলায় ওঁরাও কৃষক পরিবারের স্বপ্নের মৃত্যু
ঋণের বোঝা, ভরসার মহিষ আর এক খোলা বোরহোল

বিএমডিএর অবহেলায় ওঁরাও কৃষক পরিবারের স্বপ্নের মৃত্যু

favicon
স্টাফ রিপোর্টার :
বিএমডিএর অবহেলায় ওঁরাও কৃষক পরিবারের স্বপ্নের মৃত্যু

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নের শাহানাপাড়া গ্রামে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) একটি পরিত্যক্ত ও অরক্ষিত বোরহোলে পড়ে মারা গেছে একটি মহিষ। তবে এটি শুধু একটি মহিষের মৃত্যু নয়-এটি একটি দরিদ্র ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পরিবারের জীবিকা, স্বপ্ন এবং বেঁচে থাকার লড়াইয়ে বড় এক আঘাত।

শনিবার (২৭ জুন) বিকেলে চার বছর বয়সী মহিষটি অসাবধানতাবশত প্রায় ৮০ ফুট গভীর বোরহোলে পড়ে যায়। খবর পেয়ে গোদাগাড়ী ফায়ার সার্ভিসের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান চালায়। কিন্তু সংকীর্ণ ও গভীর কূপ থেকে মহিষটিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। টর্চলাইটের আলোয় কূপের তলদেশে মহিষটিকে দেখা গেলেও কোনো নড়াচড়া না থাকায় ধারণা করা হচ্ছে, ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়েছে।

মহিষটির মালিক বিকাশ খা খা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ওঁরাও সম্প্রদায়ের একজন প্রান্তিক কৃষক। দেড় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে তিনি দুটি মহিষ কিনেছিলেন। মাসে ১৫ হাজার টাকা কিস্তি পরিশোধ করতে হয়। এই দুই মহিষ দিয়েই তিনি হালচাষ করে সংসার চালাতেন এবং ঋণ শোধের চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু দুটি মহিষের একটি হারিয়ে এখন পুরো পরিবার অনিশ্চয়তার মুখে।

বিকাশের মেয়ে মন্দিরা খা খা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “মহিষটা পড়ে যাওয়ার খবর শুনে বাবা দৌড়ে এসে ঘটনাস্থলে অজ্ঞান হয়ে যান। গ্রামের মানুষ পানি ঢেলে তাঁকে সুস্থ করেন। আমাদের বড় সংসার। বাবা মহিষ দিয়েই হালচাষ করে সংসার চালান। এখন সংসার কীভাবে চলবে, সেই চিন্তায় আমরা দিশেহারা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গত বছরের নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে কয়েকজন উদ্যোক্তা ওই স্থানে গভীর নলকূপ বসানোর উদ্যোগ নেন। খননকাজ শেষ হলেও পরে নানা জটিলতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয়নি। কিন্তু খনন করা প্রায় ৮০ ফুট গভীর ও প্রায় ৪ ফুট ব্যাসের বোরহোলটি আর কখনো বন্ধ করা হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে এটি খোলা অবস্থায় পড়ে থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছিল। সেই আশঙ্কাই এবার বাস্তবে পরিণত হলো।

এ ঘটনা নতুন নয়। গত বছরের ডিসেম্বরে রাজশাহীর তানোর উপজেলার কোয়েলহাট পূর্বপাড়া গ্রামে বিএমডিএর এমনই একটি পরিত্যক্ত বোরহোলে পড়ে প্রাণ হারায় দুই বছরের শিশু সাজিদ। প্রায় ১৬ ঘণ্টার উদ্ধার অভিযানের পর তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ওই মর্মান্তিক ঘটনার পর বিভাগীয় প্রশাসন রাজশাহী বিভাগের সব পরিত্যক্ত বোরহোল দ্রুত বন্ধ করার নির্দেশ দিলেও শাহানাপাড়ার এই কূপটি অরক্ষিতই থেকে যায়।

স্থানীয়দের দাবি, যদি সেই নির্দেশ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হতো, তাহলে আজ একটি নিরীহ প্রাণের মৃত্যু হতো না এবং একটি দরিদ্র পরিবারের জীবিকা ধ্বংস হয়ে যেত না।

এ বিষয়ে গভীর নলকূপ প্রকল্পের অন্যতম উদ্যোক্তা বাশির উদ্দিন বাবু বলেন, জমির মালিক প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা না দেওয়ায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয়নি। ভবিষ্যতে নলকূপ স্থাপনের আশা থেকেই বোরহোলটি বন্ধ করা হয়নি। মহিষের মৃত্যুর ঘটনায় তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করে ক্ষতিপূরণের বিষয়ে একটি সমাধানের চেষ্টা করা হবে।

এদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা বিএমডিএ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে শুধু ক্ষতিপূরণ নয়, জেলার সব পরিত্যক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ বোরহোল দ্রুত স্থায়ীভাবে বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের ভাষায়, "আজ মহিষ মারা গেছে, কাল হয়তো আবার কোনো শিশুর প্রাণ যাবে। আর কোনো পরিবার যেন এমন কান্না বয়ে বেড়াতে না হয়।"

এই ঘটনাটি আবারও প্রশ্ন তুলেছে—দুর্ঘটনার পর নির্দেশনা জারি হলেও যদি তা বাস্তবায়ন না হয়, তবে সেই দায় কার? একটি খোলা বোরহোলের অবহেলা কি আর কত প্রাণ, কত স্বপ্ন কেড়ে নেবে?

বিএমডিএর অবহেলায় ওঁরাও কৃষক পরিবারের স্বপ্নের মৃত্যু
ঋণের বোঝা, ভরসার মহিষ আর এক খোলা বোরহোল
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
২৮ জুন ২০২৬
দৈনিক উপচার
 সোমবার , ২৯ জুন ২০২৬
হোমআজকের শীর্ষ সংবাদবিএমডিএর অবহেলায় ওঁরাও কৃষক পরিবারের স্বপ্নের মৃত্যু
ঋণের বোঝা, ভরসার মহিষ আর এক খোলা বোরহোল

বিএমডিএর অবহেলায় ওঁরাও কৃষক পরিবারের স্বপ্নের মৃত্যু

favicon
স্টাফ রিপোর্টার :
বিএমডিএর অবহেলায় ওঁরাও কৃষক পরিবারের স্বপ্নের মৃত্যু

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নের শাহানাপাড়া গ্রামে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) একটি পরিত্যক্ত ও অরক্ষিত বোরহোলে পড়ে মারা গেছে একটি মহিষ। তবে এটি শুধু একটি মহিষের মৃত্যু নয়-এটি একটি দরিদ্র ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পরিবারের জীবিকা, স্বপ্ন এবং বেঁচে থাকার লড়াইয়ে বড় এক আঘাত।

শনিবার (২৭ জুন) বিকেলে চার বছর বয়সী মহিষটি অসাবধানতাবশত প্রায় ৮০ ফুট গভীর বোরহোলে পড়ে যায়। খবর পেয়ে গোদাগাড়ী ফায়ার সার্ভিসের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান চালায়। কিন্তু সংকীর্ণ ও গভীর কূপ থেকে মহিষটিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। টর্চলাইটের আলোয় কূপের তলদেশে মহিষটিকে দেখা গেলেও কোনো নড়াচড়া না থাকায় ধারণা করা হচ্ছে, ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়েছে।

মহিষটির মালিক বিকাশ খা খা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ওঁরাও সম্প্রদায়ের একজন প্রান্তিক কৃষক। দেড় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে তিনি দুটি মহিষ কিনেছিলেন। মাসে ১৫ হাজার টাকা কিস্তি পরিশোধ করতে হয়। এই দুই মহিষ দিয়েই তিনি হালচাষ করে সংসার চালাতেন এবং ঋণ শোধের চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু দুটি মহিষের একটি হারিয়ে এখন পুরো পরিবার অনিশ্চয়তার মুখে।

বিকাশের মেয়ে মন্দিরা খা খা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “মহিষটা পড়ে যাওয়ার খবর শুনে বাবা দৌড়ে এসে ঘটনাস্থলে অজ্ঞান হয়ে যান। গ্রামের মানুষ পানি ঢেলে তাঁকে সুস্থ করেন। আমাদের বড় সংসার। বাবা মহিষ দিয়েই হালচাষ করে সংসার চালান। এখন সংসার কীভাবে চলবে, সেই চিন্তায় আমরা দিশেহারা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গত বছরের নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে কয়েকজন উদ্যোক্তা ওই স্থানে গভীর নলকূপ বসানোর উদ্যোগ নেন। খননকাজ শেষ হলেও পরে নানা জটিলতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয়নি। কিন্তু খনন করা প্রায় ৮০ ফুট গভীর ও প্রায় ৪ ফুট ব্যাসের বোরহোলটি আর কখনো বন্ধ করা হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে এটি খোলা অবস্থায় পড়ে থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছিল। সেই আশঙ্কাই এবার বাস্তবে পরিণত হলো।

এ ঘটনা নতুন নয়। গত বছরের ডিসেম্বরে রাজশাহীর তানোর উপজেলার কোয়েলহাট পূর্বপাড়া গ্রামে বিএমডিএর এমনই একটি পরিত্যক্ত বোরহোলে পড়ে প্রাণ হারায় দুই বছরের শিশু সাজিদ। প্রায় ১৬ ঘণ্টার উদ্ধার অভিযানের পর তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ওই মর্মান্তিক ঘটনার পর বিভাগীয় প্রশাসন রাজশাহী বিভাগের সব পরিত্যক্ত বোরহোল দ্রুত বন্ধ করার নির্দেশ দিলেও শাহানাপাড়ার এই কূপটি অরক্ষিতই থেকে যায়।

স্থানীয়দের দাবি, যদি সেই নির্দেশ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হতো, তাহলে আজ একটি নিরীহ প্রাণের মৃত্যু হতো না এবং একটি দরিদ্র পরিবারের জীবিকা ধ্বংস হয়ে যেত না।

এ বিষয়ে গভীর নলকূপ প্রকল্পের অন্যতম উদ্যোক্তা বাশির উদ্দিন বাবু বলেন, জমির মালিক প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা না দেওয়ায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয়নি। ভবিষ্যতে নলকূপ স্থাপনের আশা থেকেই বোরহোলটি বন্ধ করা হয়নি। মহিষের মৃত্যুর ঘটনায় তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করে ক্ষতিপূরণের বিষয়ে একটি সমাধানের চেষ্টা করা হবে।

এদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা বিএমডিএ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে শুধু ক্ষতিপূরণ নয়, জেলার সব পরিত্যক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ বোরহোল দ্রুত স্থায়ীভাবে বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের ভাষায়, "আজ মহিষ মারা গেছে, কাল হয়তো আবার কোনো শিশুর প্রাণ যাবে। আর কোনো পরিবার যেন এমন কান্না বয়ে বেড়াতে না হয়।"

এই ঘটনাটি আবারও প্রশ্ন তুলেছে—দুর্ঘটনার পর নির্দেশনা জারি হলেও যদি তা বাস্তবায়ন না হয়, তবে সেই দায় কার? একটি খোলা বোরহোলের অবহেলা কি আর কত প্রাণ, কত স্বপ্ন কেড়ে নেবে?

বিএমডিএর অবহেলায় ওঁরাও কৃষক পরিবারের স্বপ্নের মৃত্যু
ঋণের বোঝা, ভরসার মহিষ আর এক খোলা বোরহোল
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
২৮ জুন ২০২৬