১১ কোটি টাকার সড়ক সংস্কারে অনিয়মের অভিযোগ
রাজশাহীর তানোর উপজেলার কাশিম বাজার-বায়া বাজার সড়কের প্রায় সাড়ে ৭ কিলোমিটার সংস্কার কাজে অনিয়ম, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং ধীরগতির অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটির কাজ করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সৈকত এন্টারপ্রাইজ। স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত মান ও সিডিউল অনুযায়ী হচ্ছে না। ফলে সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সড়কটির বিভিন্ন অংশে এখনও কাজ চলমান থাকায় সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। কোথাও রাস্তা খুঁড়ে রাখা হয়েছে, কোথাও নির্মাণকাজের ধীরগতির কারণে যান চলাচলে সৃষ্টি হয়েছে ভোগান্তি। এলাকাবাসীর অভিযোগ, কাজ শুরু হওয়ার পর দীর্ঘ সময় পার হলেও এখনো প্রকল্পটি শেষ হয়নি। এতে প্রতিদিনই যাত্রী, শিক্ষার্থী, রোগী ও পরিবহন চালকদের ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কালীগঞ্জ হাট এলাকায় যে আরসিসি ঢালাই করা হয়েছে, তা সিডিউল অনুযায়ী হয়নি। এমনকি ছিটেফোঁটা বৃষ্টির মধ্যেও ঢালাইয়ের কাজ করা হয়েছে, যা নির্মাণনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে দাবি তাদের। এলাকাবাসীর ভাষ্য, এভাবে নির্মাণকাজ করলে রাস্তার স্থায়িত্ব নিয়ে শঙ্কা থেকেই যায়।
চান্দুড়িয়া এলাকার যুবক রবিউল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সড়কটির অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। সংস্কারকাজ শুরু হওয়ায় মানুষ আশাবাদী হয়েছিল। কিন্তু যেভাবে কাজ হচ্ছে, তাতে নির্মাণমান নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি সরেজমিন তদন্ত করে রাস্তার বেড, কার্পেটিং এবং বিটুমিনের মান পরীক্ষা করে, তাহলে প্রকৃত অবস্থা বেরিয়ে আসবে।
স্থানীয় শিক্ষক আলমগীর হোসেন বলেন, প্রকল্পের কাজে দীর্ঘসূত্রতা যেমন রয়েছে, তেমনি নির্মাণমান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। জনগণের করের টাকায় বাস্তবায়িত প্রকল্পে কোনো ধরনের গাফিলতির সুযোগ নেই। তিনি সিডিউল অনুযায়ী দ্রুত ও মানসম্মতভাবে কাজ শেষ করার দাবি জানান।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে সাড়ে সাত কিলোমিটার সড়ক সংস্কারের কাজ হলেও বাস্তবে যে কাজ করা হয়েছে, তাতে বরাদ্দ অর্থের যথাযথ প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। তাদের দাবি, রাস্তার বেড ও এজিংয়ে নতুন উপকরণের পরিবর্তে পুরোনো ইট-খোয়া এবং নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া কার্পেটিংয়ের পুরুত্ব এবং বিটুমিন ব্যবহারের পরিমাণ নিয়েও তাদের সন্দেহ রয়েছে। তারা বলছেন, স্বাধীন কারিগরি তদন্তের মাধ্যমে এসব বিষয় যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে।
এদিকে সংস্কারকাজের ধীরগতির কারণে প্রতিদিন শত শত মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। ধুলাবালি, কাঁচা অংশ ও চলাচলের অনুপযোগী অবস্থার কারণে শিক্ষার্থী, রোগী, ব্যবসায়ী ও পরিবহন চালকদের দুর্ভোগ বেড়েছে। তবে এলাকাবাসী আশা করছেন, কাজটি যদি নির্ধারিত মান বজায় রেখে দ্রুত শেষ করা হয়, তাহলে এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হবে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সৈকত এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী টিজার সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, এলজিইডির নির্ধারিত সিডিউল ও কারিগরি নির্দেশনা মেনেই শতভাগ সঠিকভাবে কাজ করা হচ্ছে। কাজ বিলম্বিত হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিক বাজারে নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য, একসময় বিটুমিনের দাম প্রতি টন ৭০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে এক লাখ সাত হাজার টাকায় পৌঁছেছিল। পাশাপাশি জ্বালানি সংকট ও পাথরের দাম বৃদ্ধির কারণেও কাজের গতি ব্যাহত হয়। বর্তমানে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় দ্রুত কাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে।
তানোর উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী নুরুন্নাহার বলেন, উপজেলায় চলমান প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্প নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। কোনো ধরনের অনিয়মের সুযোগ নেই এবং কাশিম বাজার-বায়া সড়কের কাজও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
রাজশাহী এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল ইসলাম বলেন, সড়কটির নির্মাণকাজ আধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে সম্পন্ন করা হচ্ছে। ফলে উপকরণের পরিমাণ বা মানে কারচুপির সুযোগ নেই। প্রকৌশলীরা নিয়মিত কাজ তদারকি করছেন এবং নির্ধারিত মান বজায় রেখেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি সবকিছু নিয়ম মেনেই হয়ে থাকে, তাহলে নির্মাণমান নিয়ে এত অভিযোগ কেন? তাদের দাবি, জনস্বার্থে একটি স্বাধীন কারিগরি কমিটি গঠন করে রাস্তার বেড, বিটুমিন, কার্পেটিংয়ের পুরুত্ব এবং ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রীর মান পরীক্ষা করা হোক। একই সঙ্গে প্রকল্পে বরাদ্দকৃত প্রায় ১১ কোটি টাকা যথাযথভাবে ব্যয় হয়েছে কি না, তাও তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র উদঘাটন হবে এবং জনগণের অর্থে নির্মিত সড়কটি দীর্ঘস্থায়ী ও মানসম্মতভাবে সম্পন্ন করা হবে।