শনিবার , ২০ জুন ২০২৬
হোমআজকের শীর্ষ সংবাদরাজশাহীতে সর্বোচ্চ শিশু বলাৎকার
ছয় মাসে দেশে অন্তত ৪৩ শিশু নির্যাতনের শিকার

রাজশাহীতে সর্বোচ্চ শিশু বলাৎকার

favicon
স্টাফ রিপোর্টার :
রাজশাহীতে সর্বোচ্চ শিশু বলাৎকার

সারা দেশে গত ছয় মাসে অন্তত ৪৩ শিশু বলাৎকারের শিকার হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে সর্বোচ্চ নয়টি ঘটেছে রাজশাহী বিভাগে, যা দেশের অন্যান্য বিভাগের তুলনায় সবচেয়ে বেশি। গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র উঠে এসেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, লোকলজ্জা, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ও বিচারহীনতার কারণে অনেক ঘটনাই প্রকাশ্যে আসে না। ফলে প্রকৃত ভুক্তভোগীর সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে।

তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী বিভাগের জয়পুরহাট, নাটোর, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ ও রাজশাহী সদর এলাকায় নয়টি শিশু বলাৎকারের শিকার হয়েছে। বিভাগভিত্তিক হিসেবে এরপর রয়েছে ঢাকা বিভাগ, যেখানে আটটি ঘটনা ঘটেছে। চট্টগ্রাম বিভাগে ছয়টি, খুলনা, রংপুর ও বরিশাল বিভাগে পাঁচটি করে, ময়মনসিংহ বিভাগে তিনটি এবং সিলেট বিভাগে দুটি ঘটনা ঘটেছে। জেলাভিত্তিক তালিকায় ঢাকা, কুড়িগ্রাম, কুমিল্লা, নাটোর ও রাজশাহী সদর সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে।

ছয় মাসে সংঘটিত ৪৩টি ঘটনার মধ্যে ২৬টি ঘটেছে বিভিন্ন মাদ্রাসায়। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব ঘটনায় অভিযুক্তদের মধ্যে ২৬ জনই মাদ্রাসার শিক্ষক অথবা মসজিদের ইমাম। অর্থাৎ মোট ঘটনার প্রায় ৬০ শতাংশ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এসব ঘটনায় ভুক্তভোগী শিশুদের বয়স ছিল তিন থেকে ১৫ বছরের মধ্যে। এছাড়া পাঁচটি ঘটনায় পরিবারের সদস্য বা নিকট আত্মীয় অভিযুক্ত হয়েছেন এবং বাকি ১২টি ঘটনায় অভিযুক্ত ছিলেন অপরিচিত ব্যক্তি।

এসব ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত একটি রাজধানীর বনশ্রীর ‘আলোকিত কুরআন ইন্টারন্যাশনাল হিফজ মাদ্রাসা’র। সেখানে বলাৎকারের শিকার হয় ১০ বছরের শিশু আব্দুল্লাহ। হাফেজ বানানোর স্বপ্ন নিয়ে পরিবার তাকে ওই মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়েছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, নির্যাতনের পর লজ্জা ও মানসিক আঘাত সহ্য করতে না পেরে সে গলায় গামছা পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে। পরে মাদ্রাসার বাথরুম থেকে তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সুরতহাল প্রতিবেদনে তার পায়ুপথে আঘাত ও জখমের চিহ্ন পাওয়া যায়।

আইনি পদক্ষেপের চিত্রও উদ্বেগজনক। ৪৩টি ঘটনার মধ্যে ছয়টিতে কোনো মামলাই হয়নি। সব ঘটনা মিলিয়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন মাত্র ২৯ জন। অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্তরা গ্রেপ্তার হলেও পরবর্তীতে আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে জামিনে বেরিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শিশুদের ওপর এমন নৃশংস নির্যাতনের সামাজিক ও মানসিক প্রভাব নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ফাতেমা রেজিনা ইকবাল বলেন, বর্তমানে মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন স্থানে শিশুদের ওপর বলাৎকার ও ধর্ষণের ঘটনা অত্যন্ত জঘন্য ও উদ্বেগজনক। অভিভাবকরা নিরাপদ পরিবেশের আশায় সন্তানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা হোস্টেলে পাঠান। কিন্তু সেখানে এমন ঘটনা ঘটলে শুধু একটি শিশু নয়, পুরো সমাজের বিশ্বাসের ভিত্তিই নষ্ট হয়ে যায়। তার মতে, যারা এ ধরনের অপরাধ করে তারা মানসিকভাবে বিকৃত এবং সমাজের জন্য ভয়ংকর।

তিনি আরও বলেন, বলাৎকারের শিকার শিশুরা শুধু শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও ভয়াবহ ট্রমার মধ্যে দিয়ে যায়। তাদের আত্মবিশ্বাস নষ্ট হয়ে যায়, অন্য মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে এবং সারাজীবন ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। এই মানসিক ক্ষত অনেক সময় ভবিষ্যৎ জীবনেও গভীর প্রভাব ফেলে। এমনকি কেউ কেউ স্বাভাবিক পারিবারিক বা দাম্পত্য জীবন গড়তেও সমস্যার মুখোমুখি হয়। কিছু ক্ষেত্রে শৈশবের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তাদের আচরণেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করতে কঠোরভাবে আইন বাস্তবায়ন, দ্রুত বিচার এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সন্তানদের নিরাপত্তার বিষয়ে আরও সচেতন হতে হবে। শুধু কোনো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করিয়ে নিশ্চিন্ত থাকলে চলবে না; সন্তানের সার্বিক অবস্থার খোঁজখবর রাখতে হবে এবং সন্দেহজনক কোনো ঘটনা ঘটলে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের মতে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ করা এবং শিশু সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমেই এ ধরনের ভয়াবহ অপরাধ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

রাজশাহীতে সর্বোচ্চ শিশু বলাৎকার
ছয় মাসে দেশে অন্তত ৪৩ শিশু নির্যাতনের শিকার
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
১৯ জুন ২০২৬
দৈনিক উপচার
 শনিবার , ২০ জুন ২০২৬
হোমআজকের শীর্ষ সংবাদরাজশাহীতে সর্বোচ্চ শিশু বলাৎকার
ছয় মাসে দেশে অন্তত ৪৩ শিশু নির্যাতনের শিকার

রাজশাহীতে সর্বোচ্চ শিশু বলাৎকার

favicon
স্টাফ রিপোর্টার :
রাজশাহীতে সর্বোচ্চ শিশু বলাৎকার

সারা দেশে গত ছয় মাসে অন্তত ৪৩ শিশু বলাৎকারের শিকার হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে সর্বোচ্চ নয়টি ঘটেছে রাজশাহী বিভাগে, যা দেশের অন্যান্য বিভাগের তুলনায় সবচেয়ে বেশি। গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র উঠে এসেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, লোকলজ্জা, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ও বিচারহীনতার কারণে অনেক ঘটনাই প্রকাশ্যে আসে না। ফলে প্রকৃত ভুক্তভোগীর সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে।

তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী বিভাগের জয়পুরহাট, নাটোর, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ ও রাজশাহী সদর এলাকায় নয়টি শিশু বলাৎকারের শিকার হয়েছে। বিভাগভিত্তিক হিসেবে এরপর রয়েছে ঢাকা বিভাগ, যেখানে আটটি ঘটনা ঘটেছে। চট্টগ্রাম বিভাগে ছয়টি, খুলনা, রংপুর ও বরিশাল বিভাগে পাঁচটি করে, ময়মনসিংহ বিভাগে তিনটি এবং সিলেট বিভাগে দুটি ঘটনা ঘটেছে। জেলাভিত্তিক তালিকায় ঢাকা, কুড়িগ্রাম, কুমিল্লা, নাটোর ও রাজশাহী সদর সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে।

ছয় মাসে সংঘটিত ৪৩টি ঘটনার মধ্যে ২৬টি ঘটেছে বিভিন্ন মাদ্রাসায়। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব ঘটনায় অভিযুক্তদের মধ্যে ২৬ জনই মাদ্রাসার শিক্ষক অথবা মসজিদের ইমাম। অর্থাৎ মোট ঘটনার প্রায় ৬০ শতাংশ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এসব ঘটনায় ভুক্তভোগী শিশুদের বয়স ছিল তিন থেকে ১৫ বছরের মধ্যে। এছাড়া পাঁচটি ঘটনায় পরিবারের সদস্য বা নিকট আত্মীয় অভিযুক্ত হয়েছেন এবং বাকি ১২টি ঘটনায় অভিযুক্ত ছিলেন অপরিচিত ব্যক্তি।

এসব ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত একটি রাজধানীর বনশ্রীর ‘আলোকিত কুরআন ইন্টারন্যাশনাল হিফজ মাদ্রাসা’র। সেখানে বলাৎকারের শিকার হয় ১০ বছরের শিশু আব্দুল্লাহ। হাফেজ বানানোর স্বপ্ন নিয়ে পরিবার তাকে ওই মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়েছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, নির্যাতনের পর লজ্জা ও মানসিক আঘাত সহ্য করতে না পেরে সে গলায় গামছা পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে। পরে মাদ্রাসার বাথরুম থেকে তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সুরতহাল প্রতিবেদনে তার পায়ুপথে আঘাত ও জখমের চিহ্ন পাওয়া যায়।

আইনি পদক্ষেপের চিত্রও উদ্বেগজনক। ৪৩টি ঘটনার মধ্যে ছয়টিতে কোনো মামলাই হয়নি। সব ঘটনা মিলিয়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন মাত্র ২৯ জন। অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্তরা গ্রেপ্তার হলেও পরবর্তীতে আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে জামিনে বেরিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শিশুদের ওপর এমন নৃশংস নির্যাতনের সামাজিক ও মানসিক প্রভাব নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ফাতেমা রেজিনা ইকবাল বলেন, বর্তমানে মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন স্থানে শিশুদের ওপর বলাৎকার ও ধর্ষণের ঘটনা অত্যন্ত জঘন্য ও উদ্বেগজনক। অভিভাবকরা নিরাপদ পরিবেশের আশায় সন্তানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা হোস্টেলে পাঠান। কিন্তু সেখানে এমন ঘটনা ঘটলে শুধু একটি শিশু নয়, পুরো সমাজের বিশ্বাসের ভিত্তিই নষ্ট হয়ে যায়। তার মতে, যারা এ ধরনের অপরাধ করে তারা মানসিকভাবে বিকৃত এবং সমাজের জন্য ভয়ংকর।

তিনি আরও বলেন, বলাৎকারের শিকার শিশুরা শুধু শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও ভয়াবহ ট্রমার মধ্যে দিয়ে যায়। তাদের আত্মবিশ্বাস নষ্ট হয়ে যায়, অন্য মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে এবং সারাজীবন ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। এই মানসিক ক্ষত অনেক সময় ভবিষ্যৎ জীবনেও গভীর প্রভাব ফেলে। এমনকি কেউ কেউ স্বাভাবিক পারিবারিক বা দাম্পত্য জীবন গড়তেও সমস্যার মুখোমুখি হয়। কিছু ক্ষেত্রে শৈশবের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তাদের আচরণেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করতে কঠোরভাবে আইন বাস্তবায়ন, দ্রুত বিচার এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সন্তানদের নিরাপত্তার বিষয়ে আরও সচেতন হতে হবে। শুধু কোনো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করিয়ে নিশ্চিন্ত থাকলে চলবে না; সন্তানের সার্বিক অবস্থার খোঁজখবর রাখতে হবে এবং সন্দেহজনক কোনো ঘটনা ঘটলে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের মতে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ করা এবং শিশু সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমেই এ ধরনের ভয়াবহ অপরাধ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

রাজশাহীতে সর্বোচ্চ শিশু বলাৎকার
ছয় মাসে দেশে অন্তত ৪৩ শিশু নির্যাতনের শিকার
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
dailyupochar.com
১৯ জুন ২০২৬