বাম্পার ফলনেও হাসি নেই চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমচাষিদের মুখে
দেশের আমের রাজধানীখ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জে এ বছর আমের বাম্পার ফলন হয়েছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলার বাগানগুলোতে গাছভর্তি আম দেখে মৌসুমের শুরুতে লাভের বড় স্বপ্ন দেখেছিলেন চাষিরা। কিন্তু মৌসুমের মাঝপথে এসে সেই স্বপ্ন অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। বাজারে আমের সরবরাহ বেড়ে যাওয়ার কারণে দাম কমে গেছে, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের বিতর্কিত ঢলন প্রথা এবং খাজনার বাড়তি চাপ চাষিদের সংকট আরও বাড়িয়ে তুলেছে। ফলে জেলার হাজার হাজার আমচাষির মধ্যে ক্ষোভ, হতাশা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সবচেয়ে বড় আমের বাজার কানসাটে এখন আমের মৌসুম পুরোদমে চলছে। বাজারের আশপাশের সড়কজুড়ে সারি সারি ট্রাক, ভ্যান ও পিকআপে করে আম আসছে। শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জ নয়, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও নওগাঁর সাপাহারসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকেও ব্যবসায়ীরা অধিক লাভের আশায় এখানে আম নিয়ে আসছেন। ফলে বাজারে আমের জোগান কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। কিন্তু সেই তুলনায় ক্রেতা ও পাইকারি চাহিদা না বাড়ায় দাম পড়ে গেছে অনেকটাই।
চাষিদের অভিযোগ, গত বছরের তুলনায় অনেক জাতের আমের দাম প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। উৎপাদন খরচ, শ্রমিক মজুরি, সেচ ও পরিচর্যার খরচ বাড়লেও বাজারে এসে তারা প্রত্যাশিত মূল্য পাচ্ছেন না। তার ওপর নতুন করে মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ঢলন প্রথা। এই প্রথায় প্রতি মণ ৪০ কেজি আমের মূল্য পরিশোধ করা হলেও বাস্তবে চাষিদের ৫০ থেকে ৬০ কেজি পর্যন্ত আম দিতে হয়। অর্থাৎ প্রতি মণে ১০ থেকে ২০ কেজি পর্যন্ত অতিরিক্ত আম দিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
সম্প্রতি রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় ঢলন প্রথা বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে কেজি দরে আম কেনাবেচার বিষয়েও আলোচনা হয়। তবে চাষিদের দাবি, কাগজে-কলমে সিদ্ধান্ত হলেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়ন হয়নি। রাজশাহীর বিভিন্ন বাজারে যেখানে তুলনামূলক কম অতিরিক্ত ওজন নেওয়া হচ্ছে, সেখানে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাজারগুলোতে এখনও ১০ থেকে ১৫ কেজি পর্যন্ত ঢলন নেওয়া হচ্ছে।
কানসাটের আমচাষি মশাল চাঁন বলেন, এ বছর আমের ফলন অত্যন্ত ভালো হয়েছে। কিন্তু বাজারে এসে তারা হতাশ হচ্ছেন। কয়েক বছর ধরে ঢলন প্রথা ও অন্যান্য সমস্যার কারণে কৃষকরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন। এই লোকসান দীর্ঘদিন বহন করা সম্ভব নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বাজারে আম বিক্রি করতে আসা অনেক চাষির ভাষ্য, ঢলন না দিলে অনেক ক্ষেত্রে তাদের আম কিনতে আগ্রহ দেখানো হয় না। ফলে বাধ্য হয়েই অতিরিক্ত আম দিতে হচ্ছে। তারা এটিকে এক ধরনের অঘোষিত চাপ হিসেবে দেখছেন।
শুধু ঢলন নয়, খাজনা নিয়েও ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ব্যবসায়ী ও চাষিদের অভিযোগ, এ বছর খাজনার হার আগের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একই আমের জন্য একাধিকবার খাজনা দিতে হচ্ছে। বাজারে প্রবেশের সময় একবার, আড়তে লেনদেনের সময় আরেকবার এবং কুরিয়ার সার্ভিসে পাঠানোর সময় আবারও খাজনা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
আম ব্যবসায়ী রায়হান আলী বলেন, বাজারটি আগের বছরের তুলনায় প্রায় এক কোটি টাকা কমে ইজারা দেওয়া হলেও খাজনার হার কমেনি, বরং বেড়েছে। এতে চাষি ও ব্যবসায়ী উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
অন্যদিকে আড়তদারদের দাবি ভিন্ন। তাদের মতে, ঢলন কোনো জোরপূর্বক ব্যবস্থা নয়; বরং দীর্ঘদিনের প্রচলিত ব্যবসায়িক রীতি। কানসাটের আড়তদার মেহেরুল ইসলাম বলেন, প্রায় এক দশক ধরে ওজন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা চলছে। বিভিন্ন সময়ে ৪০ কেজিতে মণ নির্ধারণ বা কেজি দরে কেনাবেচার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা কার্যকর হয়নি। তিনি মনে করেন, সারা দেশে সরকারিভাবে একক ওজননীতি চালু করা হলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব।
কানসাট আম আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক টিপু বলেন, চাষিদের সম্মতিতেই ঢলন পদ্ধতিতে আম কেনাবেচা হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, বাজারে খালি ক্যারেট আনলেও খাজনা দিতে হচ্ছে এবং একই পণ্যের ওপর একাধিকবার খাজনা আদায়ের ঘটনা ঘটছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কানসাট আম বাজারের ইজারাদার মো. আলমগীর জুয়েল। তিনি বলেন, বাজারে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ, আনসার ও স্বেচ্ছাসেবকসহ প্রায় ৫০ জন কাজ করছেন। সরকারি হার অনুযায়ী খাজনা আদায় করা হচ্ছে এবং অতিরিক্ত খাজনা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কেউ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করলে তা খতিয়ে দেখা হবে বলেও জানান তিনি।
শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাজহারুল ইসলাম জানান, বিভাগীয় কমিশনারের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঢলন প্রথা বিলুপ্ত করা হয়েছে। কোনো আড়তদার অতিরিক্ত আম নিলে বা জোরপূর্বক ঢলন আদায় করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একইভাবে অতিরিক্ত খাজনা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, অনুকূল আবহাওয়া ও ভালো পরিচর্যার কারণে এ বছর আমের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তবে বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহের ফলে দাম কমে গেছে। তারা মনে করেন, রপ্তানি বৃদ্ধি, আম প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের সম্প্রসারণ এবং নতুন বাজার সৃষ্টি করা গেলে কৃষকরা ন্যায্য মূল্য পাবেন এবং ভবিষ্যতে এমন সংকট অনেকটাই কমে আসবে।
বাম্পার ফলনের এই মৌসুমে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমবাগানগুলো যতটা সমৃদ্ধির বার্তা দিচ্ছে, বাজারের বাস্তবতা ততটাই উদ্বেগের। উৎপাদন ভালো হলেও ন্যায্য মূল্য না পেলে কৃষকের ঘরে সুখ ফিরবে না। তাই ঢলন প্রথার অবসান, স্বচ্ছ বাজার ব্যবস্থাপনা এবং কৃষকবান্ধব নীতি বাস্তবায়নের দাবি এখন জোরালো হয়ে উঠেছে আমের এই জনপদে।